অপরাধী পুলিশি জেরায় মুখ খুলছে না, বাকি অপরাধীদের নাম বলছে না। প্রথমে এক পুলিশ অফিসার প্রবল মারধর করলেন। তার পরে আর এক পুলিশ অফিসার গিয়ে পরামর্শ দিলেন, যা জানা আছে, তা বলে দিলে সাজা যাতে যতটা সম্ভব কম হয়, সেটা তিনি দেখবেন। সিনেমার পর্দায় এমন দৃশ্য সবাই দেখেছেন। এর নাম ‘গুড কপ, ব্যাড কপ’ বা ‘ভাল পুলিশ, খারাপ পুলিশ’ কৌশল।
রাজনীতিতেও এই ‘ভাল পুলিশ, খারাপ পুলিশ’-এর কৌশল নেওয়া হয়। ধরুন, সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। বা শাসক দল নিজের মতাদর্শ মেনে এমন কোনও কড়া নীতি নিতে চাইছে, যার বিরোধিতা হচ্ছে। তখন শাসক শিবিরের এক নেতা হুঁশিয়ারি দেবেন। পুলিশ নামিয়ে বলপ্রয়োগ করবেন। আন্দোলনকারীদের জেলে পুরবেন। তার পরে শাসক শিবিরেরই অন্য আর এক নেতা সহানুভূতি দেখিয়ে নরম কথা বলবেন। আলোচনার কথা বলবেন। ক্ষুব্ধ ভোটারদেরও বার্তা দেওয়া যাবে।
উদাহরণ? নিট-এর প্রশ্নফাঁস নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির ডাকে জেন জ়ি-র আন্দোলন। অমিত শাহর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন দিল্লি পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী তরুণ-তরুণীদের উপরে লাঠি, কাঁদানে গ্যাস, ছররা গুলি চালাল। ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা দায়ের করল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার পরে ইনস্টাগ্রামে তরুণদের মন জয়ের চেষ্টা শুরু করলেন। বললেন, যন্তর মন্তর থেকে তাঁকে ও তাঁর প্রয়াত মা’কে গালিগালাজ করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রধান মোহন ভাগবত বললেন, তরুণ প্রজন্মের উদ্বেগ ও অভিযোগ ন্যায্য। তাঁদের প্রশ্নের যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর দেওয়া প্রয়োজন। অথচ আন্দোলনের সময় আরএসএস-এরই মুখপত্র অর্গানাইজ়ার পত্রিকায় জেন জ়ি আন্দোলনকে ‘ভারত-বিরোধী’ ও ‘নৈরাজ্যবাদী পাগলামি’ বলে তকমা দেয়। এ দিকে আন্দোলনে গোটা দেশের তরুণদের ক্ষোভ প্রকাশ্যে চলে আসার পরে সরসঙ্ঘচালক ভাগবত বললেন, “তরুণ প্রজন্ম যদি প্রতিবাদ করে, তা হলেই তারা দেশদ্রোহী হয়ে যায় না।”
দুর্গাপুজোর সময় বিজেপি-আরএসএসের এই ‘ভাল পুলিশ, খারাপ পুলিশ’ কৌশলেরই এ বার সাক্ষী থাকলেন পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। এক দিকে বইয়ের স্টলে বুলডোজ়ার চলল। কিছু উন্মত্ত বইয়ের স্টল থেকে বই ছিনিয়ে রাস্তায় ফেলল। অন্য দিকে, খাস কলকাতায় চোরবাগানের পুজোয় ভিড়ের চাপে মানুষের মৃত্যু হল। দুই ঘটনাতেই বিজেপি-আরএসএসের ‘ভাল পুলিশ, খারাপ পুলিশ’ নীতি বেশ স্পষ্ট।
দুর্গাপুজোর মাস খানেক আগেই বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দুর্গাপুজোর উদ্যোক্তাদের বলেছিলেন, বামেরা বইয়ের স্টলে শারদোৎসবের জায়গায় দুর্গাপুজো না লিখলে স্টল করতে দেবেন না। রাজ্যের প্রশাসক কোন আইনে এই বার্তা দিতে পারেন, সে প্রশ্ন নাহয় থাক। তবে বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়। তাই মুখ্যমন্ত্রীর বার্তার পরেই কলকাতা শহরে ‘এবার পুজোয় বাম-বধ’ লেখা হোর্ডিং পড়েছে। পুজো শুরু হতে কলকাতা শহরে নানা জায়গায় ও জেলায় জেলায় বইয়ের স্টলে হামলা হয়েছে। বই রাস্তায় ফেলে, ছিঁড়ে নষ্ট করাটাই উৎসবে পরিণত হয়েছে।
এর পরের অধ্যায় আরও সরেস। মুখ্যমন্ত্রী নিয়মিত ভাবে নানা কারণ দেখিয়ে বামেদের বইয়ের স্টল নিয়ে আপত্তি তুলে গিয়েছেন। এ-দিকে তাঁর সরকারের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বইয়ের স্টলে হামলাকে ‘গেরুয়া পরে গুন্ডামি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। বিজেপির কয়েকজন বিধায়কও এ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। আরএসএস-এর পূর্ব ক্ষেত্র প্রান্ত প্রচার প্রমুখ জিষ্ণু বসু বইয়ের স্টল ভাঙাকে ‘কাপুরুষতা’ বলেছেন। রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ‘আদি বিজেপি’ বা ভাল বিজেপির সঙ্গে নব্য বিজেপি বা খারাপ বিজেপির ফারাক টেনে বলেছেন, আগে সিপিএম, পরে তৃণমূল ঘুরে বিজেপিতে আসা লোকজন এ সব করে বিজেপিকে কলুষিত করছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, তৃণমূলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়েই তো রাজ্যের মানুষ সরিয়ে বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছিলেন। সেই ‘তৃণমূলের লোকজন’-এর জন্য বিজেপি দরজা খুলল কেন? প্রথমে শমীকই বলেছিলেন, তৃণমূলের কারও জন্য দরজা খোলা হবে না। কিন্তু তাঁর দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার লক্ষ্যে লোকসভার বিশ জন তৃণমূল সাংসদকে ডেকে এনডিএ-র শরিক করে নিয়েছেন। রাজ্যসভার চার জন তৃণমূল সাংসদকে দলে নিয়ে বিজেপির সাংসদ করে আবার রাজ্যসভায় পাঠিয়েছেন। শমীক কখনও বলেছেন, ভাল তৃণমূল বলে কিছু হয় না। আবার বলেছেন, যাঁরা চুরি করেছেন, তাঁদের জন্য বিজেপির দরজা বন্ধ থাকবে। অথচ চিট ফান্ড কেলেঙ্কারিতে জেলে কাটিয়ে আসা তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী সাক্ষাৎ করছেন।
সবটাই যে নরেন্দ্র মোদী সরকারকে সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাইয়ে দেওয়ার কৌশল, তা নয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও বিধানসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা চাইছেন, তা স্পষ্ট। তাই তিনি দাবি করেছেন, বিরোধী শিবিরের ৬৪ জন বিধায়ক নিয়ে তাঁর পক্ষে ২৭৫ জনের সমর্থন রয়েছে। খাতায়-কলমে যে বিরোধী শিবির থেকে তিনি ৬৪ জন বিধায়কের সমর্থন পাওয়ার কথা বলেছেন, তৃণমূলের সেই গোষ্ঠী এমনিতেই ‘বিজেপির বি টিম’ বলে অভিযুক্ত।
আসলে যে কোনও শাসক দলই সংসদ, বিধানসভা থেকে সমাজের সর্বস্তরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বিজেপি তার ব্যতিক্রম নয়। চোরবাগানের পুজোয় অব্যবস্থার পরে স্পষ্ট হয়েছে, বিজেপি দুর্গাপুজো কমিটিগুলির দখল নিয়েছে। অথচ রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বিজেপির ক্ষমতায় আসার পরে বলেছিলেন, দলের নেতারা যাতে পুজো কমিটির দখল না নেন। বাস্তবে ঠিক তার উল্টো হয়েছে। কারণ বিজেপি টের পেয়েছে, বঙ্গে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এর থেকে সহজ রাস্তা নেই। এখানেও ‘ভাল পুলিশ, খারাপ পুলিশ’ কৌশল।
আসলে বিজেপির কেন্দ্রীয় বা রাজ্য নেতৃত্বের এই ‘ভাল পুলিশ, খারাপ পুলিশ’ কৌশল উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। অটলবিহারী বাজপেয়ী-লালকৃষ্ণ আডবাণীর সময় থেকেই বিজেপি এই কৌশলে অভ্যস্ত। আডবাণী ছিলেন উগ্র হিন্দুত্বের মুখ। যাঁর রথযাত্রার পরিণতি হয়েছিল বাবরি মসজিদ ধ্বংস। অন্য দিকে, বাজপেয়ী ছিলেন নরম, উদারবাদী মুখ। তিনি মোদীকে রাজধর্ম স্মরণ করিয়েছিলেন। তিনি ১৩ দলের এনডিএ জোটের কাছে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গ্রহণযোগ্য ছিলেন। তবে আসলে তাঁকে ‘মুখোটা’ বা মুখোশ বলা হত।
কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকার গত ১২ বছর ক্ষমতায় রয়েছে। তার বিরুদ্ধে স্বাভাবিক নিয়মেই মানুষের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তরুণদের আন্দোলন হচ্ছে। বিরোধীরা সেই ক্ষোভকে হাতিয়ার করছে। তার মোকাবিলায় জাতীয় স্তরে বিজেপি-আরএসএস’কে ‘ভাল পুলিশ, খারাপ পুলিশ’ নীতি নিতে হতেই পারে। এই কৌশলের একটা কুফল হল, শাসক শিবিরের মধ্যেই সমন্বয়ের অভাব নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। ঠিক যেমন পশ্চিমবঙ্গে শাসক শিবিরে দল ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রশ্ন হল, মাত্র ছয় মাস আগে ক্ষমতায় এসেই বিজেপি সরকারকে ‘ভাল পুলিশ, খারাপ পুলিশ’ নীতি নিতে হচ্ছে কেন?
তার একটা কারণ অবশ্যই যে, প্রবল প্রত্যাশা জাগিয়ে ক্ষমতায় এলেও পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকার এখনও সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে। হয়তো সেই কারণেই দুর্গাপুজোর মণ্ডপের পাশে বামেদের বইয়ের স্টল নিয়ে বিতর্কে ভোটারদের ব্যস্ত রাখতে হচ্ছে। যাতে শিল্পনীতির কী হল, বিনিয়োগ কত এল, কর্মসংস্থান কবে থেকে হবে, ঘরছাড়া পরিযায়ী শ্রমিকরা কবে এই রাজ্যেই কাজ পাবেন, এ সব প্রশ্ন ধামাচাপা পড়ে থাকে।
আর একটি কারণ হল, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলেও দলের সাংগঠনিক ক্ষমতা বাস্তবের ময়দানে এখনও সব জায়গায় জমাট বাঁধেনি। তাই উপর নীচ সব তলায় তৃণমূল থেকে বেনোজল ঢুকলেও সাংগঠনিক ক্ষমতা বাড়াতে বিজেপি নেতাদের চোখ বুজে থাকতে হচ্ছে। মুখে তাঁরা ভাল তৃণমূল, খারাপ তৃণমূলের বাছবিচার করছেন। বাস্তবে তাঁরাও জানেন, এমন ছাঁকনি প্রয়োগ করা বাস্তবে অসম্ভব। তাই বিজেপির তৃণমূলীকরণ হলেও তাঁরা মেনে নিচ্ছেন।
বিজেপি নেতৃত্বের কাছে এখন আর কারা ‘ভাল তৃণমূল’, কারা ‘খারাপ তৃণমূল’ ভাবার সময় নেই। ‘ভাল পুলিশ, খারাপ পুলিশ’ নীতি নিয়ে চলতে গিয়ে তাঁদের সামনে এখন প্রশ্ন, কারা ‘ভাল বিজেপি’, আর কারা ‘খারাপ বিজেপি’!