এখন থেকে মেঘালয়ের সরকারি অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী, উপমুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী বা অন্য কোনও ‘ভিআইপি’দের সংবর্ধনা দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই নিয়মের একমাত্র ব্যতিক্রম হবে যদি অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বা বিদেশি অতিথি উপস্থিত থাকেন। মাস দুয়েক আগে জারি হওয়া এই সরকারি বিজ্ঞপ্তি নিয়ে তেমন হইচই না হলেও, এর মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যটি ভিআইপি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করছে। এই নির্দেশে বলা হয়েছে, সমস্ত প্রশাসনিক দফতরের অনুষ্ঠানে এ বার থেকে দু’-তিন জন সাধারণ নাগরিক বা জনপ্রতিনিধিকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। মনে করলে তাঁরা দু’-এক মিনিট বলার সুযোগও পাবেন।
শহরের ব্যস্ত রাজপথে সাইরেন বাজিয়ে কনভয় ছুটে যাওয়া আজ দৈনন্দিন দৃশ্য। ভিআইপিদের চলাচলকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে অ্যাম্বুল্যান্সে মুমূর্ষু রোগীর দুর্ভোগ বা সাধারণ মানুষের ভোগান্তির খবর প্রায়ই ভেসে ওঠে। এই ভিআইপি-সংস্কৃতির শিকড় বস্তুত লুকিয়ে ব্রিটিশ আমলের ঔপনিবেশিক মানসিকতায়। ব্রিটিশ শাসকরা অভ্যর্থনা ও আতিথ্য থেকে শুরু করে গান স্যালুট বা সরকারি ভোজের আসরে আসনের ক্রম পর্যন্ত বেঁধে দিয়েছিলেন প্রোটোকলের কড়া বন্ধনে। স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমরা সেই মানসিকতা থেকে মুক্ত হতে পারিনি। স্বাধীনতার পরে দল ও মত নির্বিশেষে নেতাদের সরল জীবনযাপন ও ক্ষমতার আড়ম্বর বর্জনের দৃষ্টান্ত আজ ফিকে হয়ে, নেতাদের কাছে অগ্রাধিকার পেয়েছে ক্ষমতার প্রদর্শনী। গাড়ির ড্যাশবোর্ডে রাখা ব্যাজ ও উত্তরীয়ের স্তূপ আর অফিসের শো-কেসে সাজানো সংবর্ধনা-স্মারক— নেতাদের আত্মপ্রচারের অপরিহার্য অঙ্গ। এই সব স্মারকের মধ্যে দিয়েই কে কত বড় নেতা, কার কত প্রভাব— তা জাহির করার চেষ্টা।
এই ‘সংস্কৃতি’র প্রকোপ গভীর প্রভাব ফেলে বিভিন্ন স্তরের সরকারি কর্মচারীদের উপরেও। নেতা-মন্ত্রীদের প্রোটোকল সামলাতে গিয়ে অনেক সময় আমলা ও পুলিশ প্রশাসনকে তাঁদের মূল জনকল্যাণমূলক দায়িত্ব থেকে সরে আসতে হয়। কাগজের পাতায় প্রায়ই দেখা যায়, প্রভাবশালী নেতার কনভয় সামান্য আটকে যাওয়ার জেরে নিচুতলার কর্মীরা ভর্ৎসিত, কখনও নিলম্বিত হয়ে যান। এ সব ঘটনা সরকারি কর্মীদের মানসিক যন্ত্রণারও কারণ। অন্য দিকে দেখা যায়, এই আমলা ও সরকারি আধিকারিকরাও বহু ক্ষেত্রে নিজেদের স্তরে সমান ভাবে ভিআইপি-সংস্কৃতির চর্চায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। জেলা থেকে ব্লক স্তর পর্যন্ত প্রশাসনিক কর্তারা সাধারণ মানুষের থেকে অদৃশ্য দেওয়াল তুলে রাখেন। অফিসে ফাইল আটকে রাখা, দীর্ঘ অপেক্ষা করানো, পরিদর্শনের সময় দামি গাড়ির বহর ও তোষামোদের আয়োজন— এই সবই ব্রিটিশ আমলের ‘লাটসাহেব’ মানসিকতার আধুনিক প্রকাশ। সরকার বদলালেও প্রশাসনের এই ক্ষমতার অহঙ্কার শাসনব্যবস্থার মজ্জায় থেকে যায়।
তবে এই সংস্কৃতির জন্য শুধু নেতারা বা আমলারা নন, সাধারণ মানুষের মানসিকতাও কম দায়ী নয়। সামান্য কারণেই আমরা নেতাদের মাথায় তুলে ধরি, যা প্রকারান্তরে ভিআইপি-সংস্কৃতিকেই ইন্ধন জোগায় আরও। জনগণের এই বেলাগাম প্রশংসা ক্ষমতায় থাকা মানুষদের মধ্যে অলীক অহঙ্কার তৈরি করে, যার ফলে তাঁরা সাধারণ মানুষের থেকে নিজেদের আলাদা এক উচ্চতায় দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন।
সব আমলা বা প্রশাসনিক কর্মকর্তা যে এই সংস্কৃতির স্রোতে ভেসে যান, তা নয়। যেমন, মহারাষ্ট্রের আপসহীন আইএএস অফিসার তুকারাম মুণ্ঢে। ভিআইপি-সংস্কৃতিকে প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করে তিনি একের পর এক সৎ ও জনমুখী পদক্ষেপ করেছেন। এমনকি ক্ষমতার প্রতীকী প্রদর্শন হিসেবে অফিসারদের চেয়ারের উপর সাদা তোয়ালে রাখার যে রেওয়াজ ছিল, নিজের ক্ষেত্রে সেটিও তুলে দিয়েছেন তিনি। এই সূত্রে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মুখ্যমন্ত্রিত্বকালে সরকারি অনুষ্ঠানে কিছু অনাবশ্যক খরচ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার কথাও মনে পড়তে পারে।
এই ফাঁদ থেকে মুক্তির উপায় লুকিয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষের হাতেই। জনগণের তরফে ক্ষমতার কেন্দ্রগুলির কাছে জবাবদিহিতার দাবি ক্রমশ জোরালো হওয়া দরকার। অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার নাগরিকরা নীরব দর্শকের মতো মেনে নিলেও, আজকের সজাগ সমাজ সেই দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে সরাসরি প্রশ্ন করতে শুরু করেছে। সমাজমাধ্যমের কল্যাণে এই ধরনের বাড়াবাড়ি মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ আজকাল উগরেও দিচ্ছেন নিজেদের ক্ষোভ। নেতাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বা ক্ষমতার প্রদর্শনকে মেনে না নিয়ে কৈফিয়ত তলবের এই ঝোঁক নেতার ক্ষমতার বর্মটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ডিজিটাল ক্ষোভের মুখে পড়ে এখন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দ্রুত ব্যাখ্যা বা সাফাই দিতে বাধ্য হতে হয়, যা অতীতে কল্পনাই করা যেত না।
রাতারাতি এই অভ্যাস বদলে ফেলা সম্ভব নয়। জনমতের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ এবং নাগরিক সমাজের সচেতনতা ধীরে হলেও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আত্মসমালোচনার জায়গায় দাঁড় করাতে বাধ্য করছে। মেঘালয়ের ছোট্ট প্রশাসনিক উদ্যোগ বা তুকারাম মুণ্ঢের ব্যক্তিগত পদক্ষেপ হয়তো সব জায়গায় তৎক্ষণাৎ কার্যকর করা কঠিন। তবে ক্ষমতার আসল পরিমাপ কি প্রোটোকল হওয়া উচিত, না কি সাধারণ মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা আস্থার সম্পর্কের নিরিখে— সেই প্রশ্ন কিন্তু জনমানসে উঠতে শুরু করেছে।