E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

কর্মদোষে লক্ষ্মী ত্যাজে তাহারে

মেয়েদের জন্য এমন কঠিন ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ তৈরি করলেন যিনি, সেই লক্ষ্মীঠাকুর নিজে কতখানি লক্ষ্মীমন্ত ছিলেন? নানা আখ্যান ঘেঁটে এ প্রশ্নের বিবিধ উত্তর মিলতে পারে।

সীমন্তিনী মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৪০

নারীর পরম গতি স্বামী ভিন্ন কেবা

ভুলেও না করে নারী পতি পদসেবা।

...উচ্চহাসি হাসিয়া যে নারী ঘোরে

গুরুজন দেখি ঘোমটা না টানে

...এয়োতির চিহ্ন সিঁদুর শাঁখা না দেয়

বাসি কাপড়ে যথা তথা বেড়ায়

ঠাকুর দেবতা আদি কভু না পূজে

সাধু সন্ন্যাসী দেখি হাসাহাসি করে

এমন নারী যে গৃহেতে বসতি রয়

লক্ষ্মী ত্যাজে তাহাকে জানিবে নিশ্চয়।

লক্ষ্মীর পাঁচালি’র এমন সব লাইন সহজেই বুঝিয়ে দেয় যে, মেয়েদের আরাধ্যা দেবীটি চঞ্চলা, তাদের সামান্য কর্তব্যচ্যূতিতেই চটে লাল হয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন বাড়ি ছেড়ে। অমনি শুরু হয় অনন্ত দুর্ভোগ— স্বামী শ্বশুর ধনমান সব হারিয়ে পথে বসেন। তাই ঘরের মেয়েদের কড়া নিয়মে চলতে হয়। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে সংসারের সব কাজ শেষ করেও বাড়ির বৌদের ‘সময় অপচো’ করা চলে না। আশাপূর্ণা দেবীর সুবর্ণলতা উপন্যাসে মুক্তকেশী যেমন মনে করেন, বাড়ির বৌ কড়ি-ঘুঁটি নিয়ে বাঘবন্দি খেলতে বসলে মা লক্ষ্মী ‘চার হাত তুলে ধেই ধেই করে বেরিয়ে যাবেন’ বাড়ি ছেড়ে। রবি ঠাকুরও দেখিয়েছেন, ‘যে যা বলে সবার কথা মেনে, নামিয়ে চক্ষু মাথায় ঘোমটা টেনে’ শ্বশুরবাড়ির কাজের চাকায় পিষ্ট হয় ‘লক্ষ্মী সতী, ভালমানুষ অতি’ মেয়েটি। এই মডেল মেনে আজও সিরিয়ালের লক্ষ্মীমন্ত নায়িকা সিঁদুর শাঁখায় ভূষিতা হয়ে শ্বশুরবাড়ির শত অত্যাচার হাসিমুখে সয়।

মেয়েদের জন্য এমন কঠিন ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ তৈরি করলেন যিনি, সেই লক্ষ্মীঠাকুর নিজে কতখানি লক্ষ্মীমন্ত ছিলেন? নানা আখ্যান ঘেঁটে এ প্রশ্নের বিবিধ উত্তর মিলতে পারে। পঞ্চদশ শতকে বলরাম দাসের লেখা ‘লক্ষ্মীপুরাণ’ তেমনই এক আখ্যান। বলরাম দাস ওড়িয়া ভাষায় দলিত সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ।

তাঁর কাহিনিতে লক্ষ্মীদেবীর স্বামী জগন্নাথ, ভাশুর বলরাম। পুরীর মন্দিরে তাঁদের বসবাস। লক্ষ্মীপুজোর দিন লক্ষ্মীঠাকুর এক ব্রাহ্মণীর ছদ্মবেশ ধারণ করে নগর ঘুরে দেখতে বেরোলেন। দেখলেন, বেশির ভাগ লোকেরই খেয়াল নেই যে, সে দিন তাঁর পুজোর দিন। যেচে গিয়ে ধনী পরিবারের এক গৃহিণীকে লক্ষ্মীপুজোর নিয়ম-নীতি বাতলে দিয়ে তিনি গেলেন নগরের প্রান্তে। দেখলেন, শ্রিয়া নামের এক চণ্ডালিনী তার কুঁড়েঘরে লক্ষ্মীপুজোর আয়োজন করেছে ভক্তিভরে। বুক ভরে ডাকছে তাঁকে। এত ক্ষণের অবহেলার পর এই স্তুতিতে ঠাকরুন আর স্থির থাকতে পারলেন না। শ্রিয়ার ঘরে ঢুকলেন, তাকে দেখা দিলেন এবং বর দিতে চাইলেন। লক্ষ্মীপুরাণে শ্রিয়া শুধু ভক্তিমতীই নয়, বুদ্ধিমতীও। এই অপ্রত্যাশিত সুযোগের সদ্ব্যবহার করে এক লক্ষ গরু, গয়না, বিপুল ধনরাশি, পাঁচ জন পুত্রসন্তান, মায় অমরত্ব পর্যন্ত চেয়ে ফেলে সে। লক্ষ্মী দেবী বলেন, “তথাস্তু। শেষেরটা ছাড়া সব পাবে।”

এ দিকে, বলরাম দেখতে পেলেন যে, তাঁর ভ্রাতৃবধূ এক চণ্ডালিনীর ঘরে ঢুকেছেন। এই নিয়ে তিনি কুরুক্ষেত্র বাধালেন। ভাইকে বললেন, তাঁর বৌ অনাচারী। নিচু জাতের লোকেদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে চানটুকু পর্যন্ত না করে মন্দিরে ঢুকে পড়ে। এ বৌকে বাড়ি (যা কিনা পুরীর মন্দির) থেকে বার করে দিতে হবে। ভাই গাঁইগুঁই করে বললেন, লক্ষ্মীর মতো বৌ কি আর পাব? তার চেয়ে বরং দেবতাদের মোটা অঙ্কের ফাইন দিয়ে একটা প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে নিই। এ সব কথা কানে না তুলে রীতিমতো ফিল্মি স্টাইলে বলরাম বললেন, “হয় বৌ নয় ভাই।... বৌ গেলে সহজেই বৌ পাওয়া যাবে, কিন্তু বড় ভাই আর মিলবে না।” দুই ভাই শলাপরামর্শ করে মন্দিরের দরজা আটকে লক্ষ্মীঠাকুরকে বললেন, “চণ্ডালিনীর ঘরে ঢুকেছ, তুমি অপবিত্র। এ মন্দিরে আর তোমার ঠাঁই হবে না।”

লক্ষ্মীঠাকুর কিন্তু মেয়েদের উপরে জারি করা তাঁর কোনও ফতোয়াই নিজে মানলেন না। দস্তুরমত তর্ক জুড়ে দিলেন স্বামীর সঙ্গে। এক কথায়, এক কাপড়ে, শ্বশুরবাড়ির দেওয়া সমস্ত গয়না খুলে রেখে পতিগৃহ ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। বিশ্বকর্মাকে দিয়ে নতুন বাড়ি বানিয়ে সেখানে উঠলেন। এবং এর পরে সিরিয়ালের কায়দায় জটিল সমস্ত ষড়যন্ত্র করে জগন্নাথ-বলরামের ‘লাইফ হেল’ করে দিলেন। এমন ব্যবস্থা করলেন যে, কোথাও তাঁদের দু’মুঠো অন্ন জুটল না। অবশেষে জাতিচ্যুতা লক্ষ্মীর কাছে ক্ষমা চেয়ে তাঁর হাতে অন্নগ্রহণ করে জাত খোয়ালেন দুই ভাই। স্বামী আর ভাশুরের সঙ্গে লড়াইয়ে জিতে লক্ষ্মীঠাকুর ওঁদের কাছ থেকে মুচলেকা নিলেন— খাওয়াদাওয়া নিয়ে ছোঁয়াছুঁয়ি আর চলবে না। ব্রাহ্মণ আর চণ্ডাল একে অপরের হাত থেকে খাবার খাবে। এত দিন পরে পেট পুরে খেয়ে যারপরনাই তৃপ্ত হয়ে বলরাম সমস্ত শর্ত মেনে নিয়ে বললেন, “পান আনিন্টেন্ডেড। ঘরের বৌ ঘরে না থাকলে সংসার লক্ষ্মীছাড়া হয়।” ঠাকরুন হৃষ্টচিত্তে পুনরায় মন্দিরে প্রবেশ করলেন।

অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে পাঁচশো বছর আগের টেক্স্ট ‘লক্ষ্মীপুরাণ’। কিন্তু সেখানেও ‘আপনি আচরি ধর্ম’ মেয়েদের শেখালেন না লক্ষ্মী। লক্ষ্মীপুরাণে রয়েছে অদ্ভুত সমস্ত নারীবিরোধী নিদান। পুজোর প্রসাদ পরিবারের বাইরের কাউকে দেওয়া যাবে না, বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েকেও নয়।

বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েদের সম্পর্কে ব্রাহ্মণ্যবাদী পিতৃতন্ত্রের অবস্থান অবশ্য চিরকালই গোলমেলে। ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’-এ দেখি রাগ করে বাপের বাড়ি যাবেন মনস্থ করেছেন পার্বতী। প্রিয় সখী জয়া তাঁকে বোঝাচ্ছেন, পতিগৃহ ছেড়ে যায় যে ‘লক্ষ্মীছাড়া’ মেয়ে, বাপের বাড়িতে তার জোটে কেবল অনাদর— “জননীর আশে যাবে পিতৃবাসে/ ভাজে দিবে সদা তাড়া/ বাপে না সম্ভাষে, মায়ে না জিজ্ঞাসে/ যদি দেখে লক্ষ্মীছাড়া।”

সুবর্ণলতা উপন্যাসে সংসারে খরচ বেশি হয়ে যাওয়ায় বাড়ির বৌদের বেশ কয়েক দিনের জন্য বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন শাশুড়ি মুক্তকেশী। বিয়ের পর থেকে এত কাল বিপদে উৎসবে কখনও সুবর্ণকে বাপের বাড়ি যেতে দেননি শাশুড়ি। আজ সংসারের ব্যয়ভার কমাতে হঠাৎ সেখানে গিয়ে উঠতে সঙ্কোচ হয় তার। সে যেতে অস্বীকার করে। এই কথা থেকে যে অশান্তি শুরু হয়, তারই জের টেনে চিরকালের মতো শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়িতে গিয়ে ওঠার সিদ্ধান্ত নেয় সুবর্ণ।

এত বছর পরে বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়ে হঠাৎ এসে বলে, “বাবা আমি এখানে থাকতে চাই।” কারণ জানতে চাইলে সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, “পরে বলছি।” যে মেয়েকে এক বার দেখার জন্য ছটফট করতেন বাবা, তাকে দেখে কি তিনি বলেন, “থাক মা, বলতে হবে না কারণ, তুই এসেছিস তাই ঢের”? অথবা কোনও কথা না বলে মেয়েকে কি কাছে টেনে নিয়ে তার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন? সুবর্ণলতা দেখে এর কোনওটাই করেন না তার বাবা। উল্টে তাঁর চোখে-মুখে ফুটে ওঠে ভয়, সংসারের এই বাড়তি বোঝা যে কতখানি লোকলজ্জার কারণ হতে পারে, সেই আশঙ্কা। আজও খবরের কাগজের পাতায় জ্বলজ্বল করে শ্বশুরবাড়িতে মেয়েদের মৃত্যর খবর। মেয়েকে ভালবেসে মেয়ের ভাল চেয়ে তাকে শ্বশুরবাড়ির লক্ষ্মী বৌ হয়ে সব মানিয়ে চলার শিক্ষা দেন মা বাবারা। সামাজিক পুঁজির চুড়োয় বসে লক্ষ্মীপুরাণের লক্ষ্মীঠাকুর সহজেই স্বামীর ঘর ছেড়ে বেরোতে পারলেও বাস্তবে বহু মেয়েই তা পারে না।

সত্যবতীর আগুন-মেয়ে সুবর্ণলতা বাপের বাড়িতে জলস্পর্শ করে না। খেয়ে যাওয়ার জন্য জোরাজুরি করলে বলে, “কী দরকার বাবা? দর্জিপাড়ার সেই গলিটাতে যদি আবার গিয়ে ঢুকতেই হয়, তাদের হাঁড়ির অন্ন খেতেই হয়, তবে আর এক বেলার জন্য জাত নষ্ট করি কেন।”

আমরা শিখেছি লিঙ্গ আর জাতপাতের রাজনীতি কী ভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে। পরিবারের অন্দরের প্রান্তিকতা আর পরিবারের বাইরের প্রান্তিকতার নানান জট ছাড়িয়ে দেখার দুরূহ কাজটি করে চলেছেন নারীবাদী সমাজতাত্ত্বিকেরা। সে সব তত্ত্বকথা বুঝিয়ে দিতে বহু যুগের ও-পার থেকে আশাপূর্ণা দেখিয়ে দেন, কখনও কখনও লিঙ্গপরিচয়টিকেই মেয়েরা চিনতে শেখে তাদের জাতিপরিচয় হিসাবে।

অর্থনীতি বিভাগ, বিশ্বভারতী

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Lakshmi Puja Lakshmi Devi Women Empowerment Women power Women

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy