এখন আমার বয়স ৯৬ পেরিয়েছে। দেশবিভাগের ঠিক আগে, ১৯৪৬ সালে দুৰ্গাপুজোর পর পর আমরা কলকাতায় চলে আসি। তাই পুজো এলেই আমার দেশের বাড়ি নোয়াখালির কথা মনে পড়ে। নোয়াখালির রামগঞ্জ থানার অন্তর্গত শ্রীরামপুর ছিল আমাদের গ্রাম।
গ্রামে ঘোষের বাড়ি, দত্তদের বাড়ি, সরকার বাড়ি, বণিক বাড়ি, মোল্লা বাড়ি এমন আরও অনেক বাড়ি ছিল। বাড়ি না বলে এলাকা বলাই ভাল। সবারই অনেক জায়গা-জমি, পুকুর তো ছিলই। অনেকগুলি করে পুকুর, মাছ হত প্রচুর। পাট, সুপারি, নারকেল উঠোনে স্তূপাকার করে রাখা থাকত। সুবিধামতো সে সব শুকিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হত। সুপারির বাগান এমন ছিল যে একটা গাছে উঠে সুপারির থোকা টেনে আলগা করে নীচে ফেলে, তার পর দুলে-দুলে অন্য গাছে যাওয়া যেত। কমলা (টক), লেবু (কাগজি), আম গাছও ছিল অনেক। কিছু আম সাইজে এমন বড় হত যে মাটিতে পড়লে বেশ শব্দ হত। আমরা দূর থেকে সেই শব্দ শুনে আম কুড়োতে ছুটে যেতাম। অনেক খাল আমাদের গ্রামের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে। এমনকি এক বাড়ি থেকে ২০-৩০ ফুট দূরের অন্য বাড়িতে যেতেও মাঝে-মাঝে সাঁকো পেরোতে হত। একটু লম্বা হলে ‘খাল’ আর ছোট হলে তাকে আমরা ‘গড়’ বলতাম।
সোনারপুর যেতে গেলে কয়েকটা সাঁকো পার হতে হত। তিন-চার মাইল দূর হবে। সপ্তাহে এক দিন সেখানে হাট বসত। চাল, ডাল, জামাকাপড়, চুড়ি, টিপ, কাঁচি, বটি, মাছ, আনাজ, হাঁড়ি, কড়াই আরও কত কিছু যে পাওয়া যেত। সকাল থেকে সন্ধ্যা বেচাকেনা চলত। চার দিকের গ্রাম থেকে সেখানে অনেক হাজার মানুষ আসত। অনেকে নৌকা নিয়ে বাজার করতে আসতেন।
আমাদের একান্নবর্তী পরিবারে সব মিলে প্রায় চল্লিশটি ঘর ছিল। মাঝে ফাঁকা উঠোন, অন্তত বারো-চোদ্দোটি। বংশপরম্পরায় পরিবারের লোকসংখ্যার বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ির সংখ্যাও বেড়ে যেত। পিছনে থাকত পুকুর। সেখানে বাসন মাজা, স্নান করা সব চলত। পুকুরের জলই আমরা খেতাম।
দেশের বাড়ির দুর্গাপুজো প্রায় কয়েকশো বছরের পুরনো। পুজোর সময় আমাদের আত্মীয়স্বজনেরা, যাঁরা জীবিকার জন্য কলকাতা, অসম, উত্তরবঙ্গ থাকতেন, তাঁরা বাড়িতে আসতেন। আমার বাবা স্বর্গত দ্বারকানাথ চক্রবর্তী নোয়াখালির বেগমগঞ্জ থানার লক্ষ্মীপুরে দেওয়ানি কোর্টের উকিল ছিলেন। আমরা চার-ভাই আর তিন-বোন সেখানে ছোটবেলায় লক্ষ্মীপুর হাই স্কুলে পড়াশোনা করি। পুজোর আগে আগে আমাদের মন আনন্দে আনচান করে উঠত, শ্রীরামপুরে যাব। পুজোর সময় আমরা যাব বলে বাবা নৌকা ভাড়া করতেন। লক্ষ্মীপুরের খাল থেকে একদম আমাদের শ্রীরামপুর বাড়ি অবধি। খালে জোয়ার-ভাটা হত। দু’তিন জন মাঝি নৌকা বাইতেন। ‘আল্লাবিসমিল্লা’র নাম নিয়ে তাঁরা নৌকা ছাড়তেন রাত প্রায় ৯-১০টায়। পরের দিন সকালে এসে শ্রীরামপুর বাড়ির সামনে নৌকা ভিড়ত। নৌকাতে সারা রাত হারিকেন জ্বলত। নৌকার পিছনের দিকে মাঝিরা রান্না করতেন। বেশ মজা করে ওঁরা পেঁয়াজ-আলুর ঝোল খেতেন। আমরা বাসা থেকে খেয়ে-দেয়ে নৌকায় উঠতাম। নৌকাতে পাটি বিছিয়ে তোশক-বালিশ নিয়ে শুয়ে পড়তাম।
দুর্গাপুজোর কয়েক মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত। প্রতিমা গড়তেন সুরথদা, আমাদের বাড়ির পুজোমণ্ডপে এসে। মহালয়ার ধারণা আমাদের তখন হয়নি। পুজোর কয়েক দিন আগে মাটির মূর্তিতে রং লাগানো শুরু হত, আর তা দেখতে আমরা ছোট-বড় সবাই ভিড় করতাম দুর্গামণ্ডপে। প্রতিমায় প্রথম রং লাগানোর দিনটাই আমাদের কাছে অলিখিত উৎসবের শুরু।
পুজোর দিনগুলিতে অন্নভোগ হত। বাড়ির সবাই তিন-চার দিন বড়-উঠোনে আকাশের নীচে লাইন করে প্রসাদ খেতে বসত। ২০০-৩০০ জন প্রতি বেলা। কলাপাতায় খাওয়া। ভাত (বা খিচুড়ি), শুক্তো, তিতার মুগডাল, ডালনা, লাবড়া, কচুর তরকারি, চাটনি, পায়েস। রাতে মোহনভোগ ও ঘিয়ের লুচি। সন্ধ্যার বেশ খানিক পরে আরতি শুরু হত। বাড়ির বৌরা লালপেড়ে শাড়ি আর গয়না পরে দুর্গামণ্ডপের ভিতরে থাকত।
বিজয়া দশমীতে প্রতিমাকে বিসর্জন দেওয়ার আগে নারকেল খেলা হত। একটা গর্তে নারকেল রাখা হত। তার পর তার চার দিক জল দিয়ে জায়গাটা পিচ্ছিল করে দেওয়া হত। তার পর নারকেল কাড়াকাড়ি খেলা শুরু হত। দু’টি দল থাকত। বেশ অনেক ক্ষণ ধরে খেলা চলতে থাকত। যারা জিততো, তাদের পুরস্কৃত করা হত। আমিও তাতে যোগ দিতাম। তার পর ঢাক, ঢোল, কাঁসর বাজিয়ে দুর্গামাকে নিয়ে বড়পুকুরে বিসর্জন দেওয়া হত। আমরা জলে নেমে সাঁতার কাটতাম। তার পর সবাই স্নান সেরে এসে উঠোনে বসতাম। পুরোহিত এসে কুলো স্পর্শ করাতেন। আমরা বড়দের প্রণাম করতাম। এ ভাবেই আমাদের পুজো শেষ হত।
১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে রামগঞ্জ থানায় আমরা আশ্রয় নিই। হাজারে হাজারে মানুষ ওই সময় থানায় ছিল। কলকাতা থেকে সরকারি ত্রাণ এল। ইতিমধ্যে মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালিতে চলে আসেন। তিনি আমাদের বাড়িতেও গিয়েছিলেন। আমি নোয়াখালির সেই সোনারপুর বাজারের কাছে কাঞ্চনপুরে গান্ধীজির বক্তৃতা শুনেছিলাম। আস্তে আস্তে ভাগাভাগি হয়ে কেউ কলকাতা, কেউ অসম, কেউ হাবড়া, কেউ নদিয়া, যেখানে যার পরিচিত জন আছে, তাঁদের কাছে চলে গেলাম। আমরা এলাম চাঁদপুর-গোয়ালন্দ হয়ে কলকাতা। শূন্য থেকে শুরু হল নতুন জীবন।
সেই ‘দেশের বাড়ির পুজো’ এখন চলছে, কখনও নাকতলা, কখনও গড়িয়া, ফুলিয়া, বিরাটি, হাবড়া, হৃদয়পুর এবং আরও অন্য আত্মীয়দের বাড়িতে পালা করে। সন্ধ্যায় আরতির তালে তালে কখন যে চলে যাই আমার নোয়াখালির দেশের বাড়ির পুজোয়, তা নিজেও জানি না। দেখতে পাই আমার দেশ, আমার বাবা, মা, কাকা, কাকিমা, সুরথদাকে। মনে হয়, দিন গুনতে থাকি, আবার ফিরে পাব।