আজ পিরিয়ডের প্রথম দিন। জানতাম না শরীর কতটা কাজ করবে...।” গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে রুপোজয়ী জ্ঞানেশ্বরী যাদবের নিরীহ স্বীকারোক্তি। তাঁর কথায় বেআব্রু নির্মম সত্য। যার শরীর সে-ই জানে না, বিশেষ শারীরিক অবস্থায় পারা না-পারার ক্ষমতা! আমাদের প্রতিবেশ কোনও ক্রমে সফল নারী-অ্যাথলিটকে স্বীকার করলেও তাঁদের ঋতু বিষয়ে উদাসীন।
ভারতীয় গণপরিসরে ঋতু এখনও লজ্জার। আধুনিকারাও বলেন ‘শরীর খারাপ’ হয়েছে। আবার যাঁদের এই প্রক্রিয়াটি অনিয়মিত, তিনিও ব্রাত্য সমাজে। ঋতু-সচেতনতাও তাই সার্বিক চর্চায় আসে না। পঞ্চম জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা অনুসারে অনূর্ধ্ব ২৪-এর ৪৬% স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন না। কিছু জনজাতি গোষ্ঠীর মেয়েদের এখনও তুষ, ছাই সম্বল রক্তক্ষরণে। ঋতুচক্রের সূচনা অসংখ্য কিশোরীকে স্কুলছুট করে। প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থায় ঋতুপর্বে স্কুলে যায় না মেয়েরা। সঙ্গে সামাজিক পরিহাসের ভয়। শারীরিক ক্লান্তি তো আছেই। চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রেও প্রবণতা খানিকটা এক।
যেখানে কিশোরীদের ঋতু শুরু হলেই পড়াশোনা অনিশ্চিত, সেখানে মেয়েরা খেলবে! ঋতুস্রাব ভারতীয় নারী-ক্রীড়ার কঠিনতম চ্যালেঞ্জ। দেশের অধিকাংশ নারী-ক্রীড়া টিকে আছে আর্থ-সাংস্কৃতিক অনুন্নত মেয়েদের কল্যাণে। ঋতু-কেন্দ্রিক ধারাবাহিক সামাজিক আগ্রাসনে এই মেয়েদের মানসিক স্থিরতা সহজেই তছনছ হয়। নষ্ট হয় আত্মবিশ্বাস। ভেন্ডিং মেশিনের মতো আপৎকালীন বন্দোবস্ত নেই সাধারণ প্রশিক্ষণ শিবিরগুলোতে। দাগের আতঙ্ক, শৌচালয়, পোশাক পরিবর্তনের সমস্যায় স্বপ্ন ভাঙে। মেনস্ট্রুয়াল কাপ, ট্যাম্পন না প্যাড? ইভেন্ট-উপযোগী ‘পিরিয়ড প্রোডাক্ট’ নির্বাচন অধিকাংশেরই অজানা। মেনস্ট্রুয়াল ডিস্ক, পিরিয়ড সুইমওয়্যার-এর মতো আধুনিক সামগ্রী সাঁতারুকে স্বস্তি দেয়, জলদূষণও আটকায়। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে উতরে যাওয়া যায় সামাজিক বিপত্তিগুলোকে।
কিন্তু নারীত্বের শরীরী বিশেষত্বকে অগ্রাহ্যের উপায় নেই। ঋতুচক্রের তিনটি ভিন্ন দশায় দেহের অনুভূতি, মনের প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ আলাদা। গোটা চক্রটিই নিয়ন্ত্রিত হরমোনের মাধ্যমে। ভীষণ অস্বস্তিদায়ক রজস্বলা অবস্থাটি। ‘আর্লি-ফলিকিউলার’ পর্ব। ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন তলানিতে পৌঁছয়। তাই কমে পেশির বিস্ফোরক শক্তি, সর্বোচ্চ শক্তিও। এমনিতেই অপুষ্টি অভাবী ঘরের অ্যাথলিটদের মস্ত বাধা, তার উপরে পিরিয়ডের আয়রন ঘাটতিতে অক্সিজেন পরিবহণ উল্লেখযোগ্য ভাবে ব্যাহত হয়। তাই দ্রুত ফুরোয় পেশি সহনশীলতা। জরায়ুর সঙ্কোচনে প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিনের ক্ষরণ আড়ষ্টতা বাড়ায় শরীর জুড়ে। অনুভূত হয় তীব্র অথবা ঘ্যানঘেনে ভোঁতা ব্যথা। ঘন ঘন ‘কোর মাসল’-এ খিঁচুনি। আর ‘ডিসমেনোরিয়া’। মানে গা-গুলানো, মাথাভার, সংজ্ঞাহীন হওয়ার মতো অসহায় পেটব্যথা। ‘লুটিয়াল’ পর্বের শেষ পর্যায়টি অসহ্যতর। মানে ঋতু শুরুর আগের কয়েকটা দিন। রিল্যাক্সিন হরমোন নিঃসরণ লিগামেন্টের কোলাজেন গঠনকে শিথিল করলে অস্থিসন্ধির স্টেবিলিটি নষ্ট হয়। তাতেই কয়েক গুণ বাড়ে আঘাতের ঝুঁকি। বিশেষত ‘এসিএল টিয়ার’। ‘গতীয় ভারসাম্যহীনতা’র দোসর ‘মুড সুইং’। দেহতাপ বাড়ে। তরলের বৃদ্ধিতে শরীর রসস্থ হয়। স্তনে ব্যথা হয়।
হয়তো সবাই সবটা অনুভব করে না। তবে ঋতুকাল অবসাদের। গবেষণা বলছে— এত নেতিময়তায়ও এই সময় উন্নত হয় মেয়েদের রিয়্যাকশন টাইম, রিয়্যাকশন এবিলিটি, পারসেপশন, কাইনেসথেটিক ক্ষমতা। আরও বহু ইতিবাচক আবেগী পরিবর্তন। মোদ্দা কথা মানসিক শক্তি সর্বোচ্চ ২৫% বাড়ে। এই পর্বে সেরাটা বার করতে ধৈর্য ধরে বুঝতে হবে ‘খেলোয়াড়’দের। মানসিক শক্তি দিয়ে উৎসাহিত করতে হবে অপেক্ষাকৃত কাহিল শরীরকে। এ দায়িত্ব প্রশিক্ষকের, সহযোগীদেরও। প্রয়োজনে তাঁদেরও ঋতু-সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ নিতে হবে।
তবে ‘ওভিউলেশন’ পর্বটি প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণের জন্য চমৎকার। শরীর মন মেজাজ একত্রে আনুগত্য প্রকাশ করে। তাই ‘ট্রেনিং পিরিয়ডাইজ়েশন’-এর পরিকল্পনা এই সময়কালকে মাথায় রেখে নকশা করলে সুবিধা মিলবে। কিন্তু ছেলেদের থেকে পৃথক হলেও, এখনও এ দেশে ট্রেনিং-এর বিশেষীকরণ হল না। সব মেয়ের জন্যই একঘেয়ে রূপরেখা।
প্রশাসনের সঙ্কল্প— স্বাধীনতার শতবর্ষে ক্রীড়ায় প্রথম পাঁচে আসবে ভারত। কিন্তু তার জন্য সাধারণীকরণের প্রথা ভেঙে মেয়েদের ঋতু বিষয়টিকে মাথায় রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ইতিমধ্যেই ক্রীড়া-উন্নত দেশগুলিতে নানা অ্যাপ-এর মাধ্যমে ঋতু-উপযোগী দুর্দান্ত কাস্টমাইজ়ড প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা করছে। চেলসি এফসি-র অ্যাপটিতে ট্রেনিং শিডিউল, লোড-এর ভলিউম-ইনটেনসিটি-সেট-রিপিটেশন, রেস্ট-রিকভারি, মানসিক সহায়তা, খাদ্যতালিকা এমনকি বিনোদন প্রোগ্রামও করা হয়। আমেরিকায় রয়েছে প্রযুক্তি-নির্ভর বিশেষ গবেষক গোষ্ঠী। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড সচেষ্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে দৈহিক মানসিক সামাজিক অসুবিধা সমাধানের। বিদেশিরা ক্রীড়াসূচি পেলে ঋতুচক্রের ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা করে। আর আমাদের মেয়েরা প্রতিযোগিতার সময় ঋতু বন্ধে বিভিন্ন সস্তা ওষুধে নির্ভরশীল।
ঋতুর নেতিবাচক প্রভাব প্রশিক্ষণে থাকতেই পারে। এও ঠিক, কখনও অধিক, কখনও অনিয়মিত আবার কখনও অসময়েই বন্ধ হয় ঋতু। ক্রীড়ার ক্লান্তি, আঘাতের দেহবোধকে অতিক্রম করে এ বোধ অনেক সময় ব্যক্তিগত অভাববোধ তৈরি করতে পারে। তা যেন সঙ্কটে না পৌঁছয়, দেখা দরকার।