E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

কোনটা স্বাধীনতা কোনটা মুক্তি

শুরু থেকে নেহরুর প্রতি কুকথা বলে তাঁকে অস্বীকার করে অসম্মান করে স্বাধীনতা আনা সম্ভব হয়েছে কি?

অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৫ অগস্ট ২০২৬ ০৭:২৬

দুটো শব্দ স্বাধীনতা আর মুক্তি প্রায় সমার্থক হলেও যে সম ভাব প্রকাশ করে তা নয়, বরং শেষেরটা মানসিক, এবং ক্ষেত্রবিশেষেমানবিক, বৈপরীত্য অর্থ জানায় যদিও একের ঘাড়ে অন্যটি চড়ে থাকে।

এনডিএ জমানার শুরুতেই ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কী এই স্বাধীনতা, কার থেকে স্বাধীনতা, কী জন্য এই স্বাধীনতা তা স্পষ্ট করে না বললেও নানা কার্যকারণ থেকে বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, এনডিএ-পূর্ব কংগ্রেস সরকারের থেকে বা কংগ্রেসের থেকে, আরও পরিষ্কার করে বললে, সর্বোপরি প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর ভাবনা-চিন্তা থেকে স্বাধীনতা।

শুরু থেকে নেহরুর প্রতি কুকথা বলে তাঁকে অস্বীকার করে অসম্মান করে স্বাধীনতা আনা সম্ভব হয়েছে কি? যে ভারতবর্ষের মাটিতে দাঁড়িয়ে, তার অর্থনৈতিক আন্তর্জাতিক সামাজিক শিক্ষা প্রযুক্তি স্বাস্থ্য বিবিধ উন্নয়নের উপর অবস্থান করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বাধীনতার বার্তা ঘোষণা করেন, তা নেহরুরই অবদান। ভারতবর্ষ স্বাধীনতা পেয়েছিল ইংরেজ শাসনের হাত থেকে। কিন্তু মুক্তি ঘটেছিল কি? রবীন্দ্রনাথের কথা অনুসারে ‘মুক্তির নানা মূর্তি’, কোন মূর্তি থেকে মুক্ত হয়েছিল ভারত? বিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে যে প্রভূত উন্নতি হয়েছে বিশ্ব জুড়ে, তাকে অস্বীকার করে স্বাধীন ভাবে বসবাস করা মানে গণতান্ত্রিক দেশের জনগণকে বিশ্বের উন্নয়নের ধারা থেকে বঞ্চিত করা।

সত্তর দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করার আহ্বান জানিয়ে এক সময় দেওয়াল ছেয়ে গিয়েছিল এই পশ্চিমবঙ্গে। সেই মুক্তি এল কই? তার থেকেও বড় প্রশ্ন, কী ছিল সেই বন্ধন যার থেকে মুক্তির ডাক এসেছিল? এখানেও সেই একটাই উত্তর, ‘বুর্জোয়া’ রাজনৈতিক ভাবনা থেকে মুক্তি। সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে রাজনৈতিক চেতনা বদলাতে পারে কিন্তু একনায়কের শাসন আর আসবে না এই বহুধা ভারতবর্ষে, নেহরুর প্রচেষ্টায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্র আজ শিকড় ছড়িয়েছে গভীরে।

সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়ে এই নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল পঞ্চাশোর্ধ্ব পরিদর্শক মিশাকের সঙ্গে। মিশাক বলছিলেন, “ছোটবয়স থেকে দেখে আসছি দেশের সবাই স্বাধীনতার জন্যে কথা বলছে, কাজ করছে, আন্দোলন করছে। বর্ণবৈষম্য আইন যখন চালু হয় আমরা তখন ছাত্র। আমার বাড়িতে বয়োজ্যেষ্ঠরা অবশ্য কেউ সে ভাবে আন্দোলনে জড়িত ছিলেন না। সহপাঠী এবং দেশব্যাপী সোয়েটো আন্দোলনে জড়িত ছাত্রদের মধ্যে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে মনোভাব ক্রমে কঠিন হচ্ছে এবং আমাদের সর্বজনীন নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা গ্রেফতার হওয়ার পর আমাদের ক্ষোভ আরও তীব্র হল, গর্জে উঠল গোটা ছাত্রসমাজ। সেই থেকে আমাদের যেটা মনে এসেছিল তা হল শুধু স্বাধীনতা নয়, মুক্তি চাই। দেয়ার ইজ় আ ডিফারেন্স বিটুইন ফ্রিডম অ্যান্ড লিবার্টি।” তাঁরই কথায়, শ্বেতাঙ্গরা যে ভাবে শতকের পর শতক কৃষ্ণাঙ্গদের উপর অত্যাচার চালিয়েছে, দমন-পীড়ন করেছে, মানুষ হিসেবে গণ্য না করে ওদের দেশেই দক্ষিণ আফ্রিকাবাসীদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে রেখেছে, প্রায় অস্পৃশ্য করে সমাজের এক প্রান্তে সরিয়ে রেখে আবার তাদের দিয়েই নানা ধরনের কাজ করিয়ে প্রাপ্য মজুরি না দিয়ে রেখেছিল তার ফলে প্রজন্ম ধরে একটা হীনম্মন্যতার জন্ম হয় এবং তা মনে গেঁথে যায়। প্রোথিত এই মানসিক ভাব থেকে উত্তরণই হল মুক্তি বা লিবার্টি— যা রাজনৈতিক স্বাধীনতার থেকে আলাদা।

বিষুবরেখার দু’পাশে দুটো গোলার্ধে বিস্তৃত চুয়ান্নটা দেশ মিলে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশ আফ্রিকা। এখানেই আধুনিক মানুষের সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল নীল নদ উপত্যকায়, ফারাওদের শাসনও এই মহাদেশে। আজও প্রাচীন জনজাতীয়দের বাস রয়েছে আফ্রিকার মাটিতেই। খনিজ সম্পদে বিত্তবান দক্ষিণ আফ্রিকা আর এই কারণেই শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের আগমন, বসবাস, অত্যাচার এবং সর্বোপরি কুখ্যাত বর্ণবৈষম্য আইন। এই আইন উঠে যাওয়ার পরও যাতে তার ছায়া সমাজে কোনও স্তরে কোনও রূপে বহাল না থাকে, যাতে কোনও রকম কুসংস্কার না বজায় থাকে তার জন্যেই মিশাকদের ‘লিবার্টি’ আন্দোলন। মিশাক আরও বললেন, দীর্ঘ কারামুক্তির পর ম্যান্ডেলাকে জিজ্ঞাসা করা হয় এই অহিংস আন্দোলনের ধারা তিনি কার কাছ থেকে শিখেছিলেন, তিনি বলেছিলেন, মার্টিন লুথার কিং, আর লুথার কিং স্বীকার করেছিলেন তিনি শিক্ষা পেয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধীর কাছ থেকে। গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম বর্ণবৈষম্যের শিকার এবং অহিংস প্রতিবাদের মুখও।

যত সংস্কার মানুষের মধ্যে বৈর ভাব সৃষ্টি করে সব ক’টাকে এখন আমরা নিয়ে চলেছি। রবীন্দ্রনাথ বার বার বলেছেন উত্তরণ ও মুক্তির কথা, বলেছেন আত্মশুদ্ধির কথা। বিগত এক দশক ধরে যে সুস্থ মানবিক বোধশক্তিকে সম্মোহন করে জাতি ধর্ম বর্ণ আর্থিক অসাম্য ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, তার থেকে উদ্ভূত পুঞ্জীভূত ক্ষোভ একটা মুক্তির পথ চাইছিল। সম্প্রতি দেশ জুড়ে ‘নূতন যৌবনেরই দূত’-দের আন্দোলনে তারই ছায়া।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
indian politics Central Government Independence

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy