সংসদের বাদল অধিবেশন চলাকালীন জেন জ়ি আন্দোলন যখন দেশ জুড়ে ঢেউ তুলছে, ঠিক তখনই লোকসভায় পেশ হল ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট (আইএসআই) বিল ২০২৬। এই নতুন আইন বাতিল করে দেবে ১৯৫৯ সালের আইএসআই আইন। এটা কি সেই প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা, যা অ-বাণিজ্যিক, সরকারি অর্থে পুষ্ট শিক্ষার আদর্শকে ধারণ করে?
কেন্দ্রীয় স্ট্যাটিস্টিক্স অ্যান্ড প্রোগ্রাম ইমপ্লিমেন্টেশন মন্ত্রকের অধীনে আইএসআই এক স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। ১৯৩১-৩২ সালে ভারতীয় রাশিবিজ্ঞানের জনক প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের হাতে আইএসআই-এর গোড়াপত্তন হয় একটি সোসাইটি হিসাবে, সদর দফতর কলকাতায়। স্বাধীন ভারত বিশ্বমানের গবেষণা করতে সক্ষম— আইএসআই হয়ে ওঠে এই বিশ্বাসের প্রতীক। স্বাধীন ভারতের অর্থব্যবস্থা পুনর্গঠনে প্রতিষ্ঠানটির অবদানকে সংসদ স্বীকৃতি দেয় আইএসআই আইন ১৯৫৯-এর মাধ্যমে— আইএসআই সোসাইটিকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ঘোষণা করে।
১৯৫৯ সালের আইনটি আইএসআই সোসাইটির নিয়মাবলিকে স্বীকৃতি দেয়। এই সোসাইটি ছাড়া আইএসআই-এর পরিচালন ব্যবস্থার আরও দু’টি স্তম্ভ কাউন্সিল আর অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল (এসি)। কাউন্সিলের মেয়াদ দু’বছরের। সরকার নয়, সোসাইটির সদস্যরাই সোসাইটির সভাপতিকে দু’বছরের জন্য নির্বাচন করেন। প্রতিষ্ঠানটি মূলত পরিচালিত হয় কাউন্সিল আর ডিরেক্টরের মাধ্যমে, সোসাইটির নিয়মানুসারে। কাউন্সিলের সদস্য সংখ্যা ৩৩, যার মধ্যে ডিন-সহ ১০ জন নির্বাচিত আইএসআই-এর বিজ্ঞানী বা কর্মচারী, এ ছাড়া ডিরেক্টর ও তিন জন সেন্টার হেড। আইএসআই-এর বাইরে থেকে ন’জন বিজ্ঞানী ও ছ’জন কেন্দ্রীয় সরকারের আমলা। এ ছাড়া সোসাইটির জন্য বরাদ্দ তিনটি আসন, কিন্তু তাঁদের কোনও ভেটো ক্ষমতা নেই। কাউন্সিলের মাথায় থাকেন এক জন চেয়ারপার্সন।
কাউন্সিলের গঠন এতটাই ভারসাম্যমূলক যে, কোনও একটি গোষ্ঠী একক ভাবে কাউন্সিলের উপরে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে পারে না। সোসাইটির সভাপতি শুধু কাউন্সিলের প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন, যেখানে কাউন্সিলের চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কাজে সোসাইটি হস্তক্ষেপ করে না। ডিরেক্টর নিযুক্ত হন কাউন্সিলের সুপারিশে, এবং তিনি কাউন্সিলের কাছেই দায়বদ্ধ থাকেন। এর ফলে ডিরেক্টরের স্বাধিকার বজায় থাকে। কাউন্সিল সম্পূর্ণ ভাবে স্বশাসিত, এবং শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়গুলির দায়িত্ব তাদের। প্রতিষ্ঠানের সমস্ত অধ্যাপক এর সদস্য। ভারতের অগ্রগণ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আইএসআই-এর পরিচালন-ব্যবস্থাই সম্ভবত সবচেয়ে গণতান্ত্রিক। আইএসআই সোসাইটি কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন ছাড়া নিয়মাবলি সংশোধন করতে পারে না, আবার সরকারও জরুরি অবস্থা ছাড়া এই নিয়মাবলি বদলাতে পারে না। নিয়মাবলি বদলাতে হলে তা শুধুমাত্র কাউন্সিল বা সোসাইটির মাধ্যমেই বদলাতে পারে। এই ভারসাম্যই আইএসআই-এর স্বাধিকার রক্ষার কবচ এবং তাই সোসাইটি কাঠামোটি টিকিয়ে রাখা জরুরি।
আইএসআই-এর গোড়ার দিকে শুরু হওয়া কোর্সগুলোয় কোনও টিউশন ফি নেই। বরং স্টাইপেন্ড আছে। হস্টেল ফি আর মেডিক্যাল বিমা বাবদ বছরে দিতে হয় ৩,৫০০ টাকা। এই বিনামূল্যের মডেল সম্ভব হয়েছে স্বাধিকারের কারণেই। তুলনায়, আইআইটি-তে সাধারণ ক্যাটেগরির পূর্ণ ফি দেওয়া ছাত্রের বি টেক-এর খরচ বছরে প্রায় ২.৫ লক্ষ টাকা। তবে সময়ের চাহিদা মেনে, আইএসআই কিছু নতুন, বাজারমুখী কোর্সে ফি চালু করেছে।
আর এ মাশেলকর-এর সভাপতিত্বে সরকার-নিযুক্ত পর্যালোচনা কমিটি আইএসআই আইন ১৯৫৯ খতিয়ে দেখে মাত্র দু’টি সংশোধনীর সুপারিশ করেছিল। ১৯৫৯ সালের আইন বাতিল বা সোসাইটি বিলুপ্তির কথা বলেনি। অথচ ২০২৬ সালের বিলটি মাশেলকর কমিটির নামে ঠিক উল্টোটাই করে। এই বিল অনুযায়ী, মহলানবিশ-প্রতিষ্ঠিত সোসাইটির জায়গায় আসছে এক সংবিধিবদ্ধ কর্পোরেট সংস্থা, যা আইএসআই-এর অন্তর্নিহিত স্বাধিকার কেড়ে নেবে। উৎকর্ষের জন্য সংবিধিবদ্ধ কর্পোরেট সংস্থা হওয়া জরুরি নয়— ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স চলে একটি দাতব্য ট্রাস্ট হিসাবেই। প্রতিনিধিত্বমূলক কাউন্সিলের বদলে আসছে কেন্দ্রীয় সরকার-নিযুক্ত বোর্ড অব গভর্ন্যান্স (বিওজি), যা দায়বদ্ধ শুধু সরকারের কাছে। অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের ভূমিকাও সঙ্কুচিত হচ্ছে। অতঃপর বিওজি যথেচ্ছ কোর্স ফি বসাতে পারবে। আইএসআই-এ সমস্ত ধরনের নির্বাচন বাতিল হয়ে যাচ্ছে, কর্মীদের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রক এই বিলটি তৈরির সময় আইএসআই সোসাইটি, কাউন্সিল, ও এসি-র সঙ্গে কোনও আলোচনা করেনি, যদিও তারা সবাই খসড়া বিল নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।
এই বিলটি পাশ হলে, ভেঙে পড়বে এমন এক প্রতিষ্ঠান, যা স্পষ্ট ভাবে প্রমাণ করে যে, বাণিজ্যিকীকরণ না করেও সর্বোচ্চ স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা বজায় রাখা সম্ভব, সবার জন্য।
ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, কলকাতা