১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট: ইতিহাস বইয়ে চিরকাল লেখা থাকবে একটি বিপুল গুরুত্বের তারিখ হিসেবে— সে দিন কেবল ভারতীয়রা নয়, বিশ্বের সমস্ত পরাধীন ও অধিকারহীন জাতি স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিল।” না, এ কোনও ভারতীয়ের আবেগমথিত উক্তি নয়, বলেছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা, ১৯৯৭ সালের ২০ অগস্ট। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট ম্যান্ডেলা ভারতের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর উদ্যাপনে বলেছিলেন কথাটা।
আগামী কাল ভারতের আশিতম স্বাধীনতা দিবস। দিনটি তো কেবল ভারতের আশি-তে আসা নয়, একটা দুনিয়া-পাল্টানো আন্দোলনেরও আট দশক পার করা বটে। এই চার-দশকব্যাপী আন্দোলন ভারতকে ভিতর থেকে উল্টে পাল্টে দিয়েছিল, আর সঙ্গে সঙ্গে, ভারতের বাইরেও প্রবল আঁচ ছড়িয়ে দিয়েছিল। অথচ ‘স্বাধীনতা’ ও তার উত্তরাধিকার নিয়ে আমরা যত ভাবনাচিন্তা করি, ‘আন্দোলন’ ও তার উত্তরাধিকার নিয়ে ততটা করি কি?
ম্যান্ডেলার বর্ণবিদ্বেষবিরোধী আন্দোলনকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছিল ভারতের অভিজ্ঞতা। ১৯৫২ সালের ‘ডিফায়েন্স ক্যাম্পেন’-কে ভারতের সত্যাগ্রহ ও আইন অমান্য আন্দোলনকে অনুসরণ করেছিলেন তিনি। বলেছেন, লড়াইয়ের আসল অস্ত্র ভারতই তাঁদের দিয়েছে। বলেছেন, ‘ভারত হল সত্যাগ্রহ ও গণপ্রতিরোধের বিশ্বজনীন সূতিকাগার।’
শুধু ম্যান্ডেলা নন। ১৯৪৭-এর পর দশক পার হতে না হতেই আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠায় ‘সিভিল রাইটস মুভমেন্ট’-এর নেতা মার্টিন লুথার কিং (জুনিয়র) ভারত সফরে এসে বলেছিলেন, তিনি খ্রিস্টধর্ম থেকে প্রেরণা পেলেও প্রতিবাদের বৈপ্লবিক কৌশল শিখেছেন মহাত্মা গান্ধীর আন্দোলন থেকেই। ১৯৬৮ সালে নিহত হওয়ার আগে বার বার বক্তৃতায় বা সাক্ষাৎকারে এ কথা তিনি বলেছেন। এই সবে সত্তর বছর পূর্ণ হল মন্টগোমারি বাস বয়কটের। বাস-যাত্রায় গাত্রবর্ণভেদ না মেনে মার্টিন লুথার কিং-এর নেতৃত্বে সেই অহিংস অসহযোগ আন্দোলন থেকেই ও দেশের সুপ্রিম কোর্ট বাধ্য হয়েছিল পরিবহণে বর্ণবৈষম্য নিষিদ্ধ করতে। সেলমা ব্রিজের ঐতিহাসিক পদযাত্রারও একষট্টি বছর পুরল, যে দিন পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গ সত্যাগ্রহীরা— যাঁদের সাহস ও বিশ্বাস এসেছিল ভারতীয় আন্দোলন থেকেই।
প্রশ্ন হল, মার্টিন লুথার কিং (জুনিয়র) বা নেলসন ম্যান্ডেলার মতো রাজনৈতিক নেতারা যা বলেছিলেন, ইতিহাসবিদরাও কি তা বলবেন? বিশ্বের সমস্ত পরাধীন ও অধিকারহীন জাতির কাছে প্রতিরোধের প্রতীক ভারতের আন্দোলন— এ কি সত্যি? ইতিহাসের দিক থেকে এ কথা অতিরঞ্জন বলা চলে না। বিশ শতকের দু’টি বিশ্বযুদ্ধের পাশাপাশি, বি-উপনিবেশীকরণ বা ‘ডি-কলোনাইজ়েশন’ও যদি আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হয়, তবে মনে রাখতেই হবে, সিরিয়া, লেবানন থেকে ফ্রান্স বেরিয়ে আসার পর ভারতই প্রথম বড় স্বাধীনতা-অর্জনকারী দেশ। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন তার নিজের জোরেই অ-তুলনীয়— সাম্রাজ্যবাদের প্রতিরোধে, গণপ্রতিবাদের নতুন দর্শনের কর্ষণে। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত— এই মাটিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বার বার প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ঝড় উঠেছে, প্রবল গণ-আন্দোলন চলেছে— এশিয়া, আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকার আর কোনও উপনিবেশিত দেশে এতখানি দেখা যায়নি। এ যেন একটা বিশেষ মডেল, যার প্রভাব কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, সমগ্র পশ্চিমি ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাকেই যা অনধিকারী ও অত্যাচারী বলে চিহ্নিত করে শাসিতের আন্দোলনের একটা ‘নৈতিক’ মাত্রা তৈরি করে দিয়েছিল। গান্ধীজির সৌজন্যে বিশ্বের নিপীড়িত মানুষকে দিয়েছিল ‘সত্যাগ্রহ’-র মতো মহাস্ত্র, অহিংসা, অনশন ও গণ-অসহযোগের মতো প্রতিরোধ। এই মডেল আজও বিশ্বের মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের দিশারি।
অহিংসার পাশাপাশি, ভারতের সশস্ত্র বিপ্লবের বলিষ্ঠ ধারাও সে দিন বিদেশি শাসককে ঘোর সঙ্কটে ফেলেছিল, ব্রিটিশ নথিপত্রেই তার প্রভূত প্রমাণ। আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনের যোগের কথা বহু-আলোচিত, দুই দেশের বিপ্লবীদের মধ্যে ছিল পারস্পরিক প্রভাব। ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন এই অগস্টে পঁচাশিতে পা দিল। বিশ্বযুদ্ধের আবহে ব্রিটিশ শক্তিকে ওই আন্দোলন এমন কাঁপিয়ে দিয়েছিল যে তারা ‘ইন্ডিয়া’ দ্রুত ‘কুইট’ করার চিন্তা শুরু করে। আর ছিল সাম্রাজ্যবাদী শাসককে ‘আন্দোলিত’ করার সেই আশ্চর্য দুরূহ পন্থা— সামরিক বাহিনীর একাংশে বিদ্রোহ জাগিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা— নেতাজি সুভাষচন্দ্রের আজ়াদ হিন্দ ফৌজের অসমসাহসিক অবদান। সেই অবদান বিশ্ব-ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল ভাবে খোদিত। পশ্চিম পাকিস্তানের অত্যাচারের বিরুদ্ধে যখন রুখে দাঁড়াচ্ছে পূর্ব পাকিস্তান, শেখ মুজিবুর রহমান নেতাজির ‘ত্যাগ ও তিতিক্ষার আদর্শ’ হৃদয়ে বহন করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন। নেলসন ম্যান্ডেলাও কেবল গান্ধীব্রতী ছিলেন ভাবলে ভুল হবে। ১৯৯০ সালে জেল থেকে মুক্ত হয়ে প্রথম বার ভারতে এসে তিনি বলেছিলেন, “আপনাদের সে দিনের নায়করা আমাদের আজকের নায়ক। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষদের অন্যতম নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সম্পর্কে আমরা কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্ররা মনে করতাম, তিনি যেমন আপনাদের নেতা, তেমন আমাদেরও নেতা। উপনিবেশ দেশগুলির লড়াকু যুবসম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন তিনি। আমরা তাঁর মহান উত্তরাধিকারকে গর্বের সঙ্গে স্মরণে রাখতে চাই, ঠিক যেমন মহাত্মা গান্ধী ও পণ্ডিত নেহরুর উত্তরাধিকার আমাদের গর্বের ধন।”
গান্ধী, নেহরু, সুভাষচন্দ্র। বিস্ময়ের কিছু নেই বোধ হয় যে, আজকের ভারতে তিন জনকেই ঢালাও অশ্রদ্ধা প্রদর্শন চলছে। এক জনের হত্যাকারী জাতীয় নায়ক বলে অভিনন্দিত। এক জনের জাতীয়তাবাদী চিন্তা ও রাষ্ট্রিক কর্মযজ্ঞ প্রাত্যহিক অপমানের লক্ষ্য। আর এক জনের প্রতি নিয়মিত অকথা-কুকথা বর্ষণ, তাঁর নামাঙ্কিত রাস্তার নাম পাল্টানো। এই শেষ জনের প্রতি ‘দেশদ্রোহী’ গালিকে বলা যেতে পারে এ বারের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে বিশেষ অর্জন! এঁদের সঙ্গে অবশ্যই আছেন রবীন্দ্রনাথ, যাঁর অমূল্য ‘মানব-ধর্ম’ ভাবনা আজ নিরন্তর উপেক্ষা ও অবজ্ঞার লক্ষ্য। এই সামূহিক আত্মবিস্মৃতিতে তলিয়ে যাওয়ার আগে কি আমরা এক বার মনে করে নেব যে, এঁরা সবাই অধিকারের জন্য উঠে দাঁড়াতে, রুখে দাঁড়াতে বলেছিলেন? ‘আন্দোলিত’ হতে বলেছিলেন? প্রথম অহিংস আন্দোলন শুরু করার সময় গান্ধীর বার্তা ছিল, “আমরা যদি নিজেদের জাতি বলে প্রমাণ করতে চাই, তা হলে শাসক আমাদের স্বার্থের বিরুদ্ধতা করলে শাসকের সঙ্গে আমরা অসহযোগ করব, এই প্রতিজ্ঞা রইল।” নেহরু বলেছিলেন, ভারত নামে দেশটি আছে মানুষের মধ্যেই: “দি ইন্ডিয়ান পিপল আর নট গোয়িং টু বি কোআর্সড,... দ্য প্রাইস টু বি পেড বাই অল কনসার্নড উইল বি আ হেভি ওয়ান।” বিপ্লব-বিদ্রোহের শিরোভাগে দাঁড়িয়ে সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, “এ জগতে ত্যাগ ও ক্লেশ স্বীকার ছাড়া কোনও আদর্শ পূর্ণতা পায়নি।” আর, রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন: “দেশকে জয় করিয়া লও,... বিদ্বেষকে পরাস্ত করো, রুদ্ধ দ্বারে আঘাত করো, বারম্বার আঘাত করো— কোনো নৈরাশ্যে, কোনো আত্মাভিমানের ক্ষুণ্ণতায় ফিরিয়া যাইয়ো না।”
এই ভাবে, অহিংস বা সহিংস, ভারতের আন্দোলনের প্রতিটি ধারার মধ্যে ছিল এক গভীর নৈতিক ডাক। অপশাসন বা অন্যায়ের প্রতিরোধের ডাক। শাসকের যথেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে শাসিতের অধিকার প্রতিষ্ঠার ডাক। বৈষম্য ও বিদ্বেষ দূর করে উদার মানবিক গণতান্ত্রিক দেশ তৈরির দাবি। ভাবি, এই ‘নৈতিক ডাক’ এক দীর্ঘ সময় ধরে দেশের কোণে কোণে ধ্বনিত হয়েছিল বলেই কি আজকের ‘জেন-জ়ি’ আন্দোলন যখন অন্যান্য দেশে ধ্বংসের রাস্তা ধরতে পারে, ভারতের মাটিতে তা স্থিত থাকতে পারে সাম্য-মৈত্রী-দ্বেষহীনতার প্রতিজ্ঞায়?
জানি না। জানি শুধু, ইতিহাসের নামে মিথ ও মিথ্যা না ছড়িয়ে বলা দরকার: ১৯৪৭ যে বিপুল আন্দোলনের সমাপনবিন্দু, তার মধ্যে ছিল এক বড় মাপের নৈতিক বিপ্লব। স্বাধীনতার সময়ে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের যন্ত্রণায় চাপা পড়ে গিয়েছিল সেই বিপ্লবের সাফল্যগৌরব। তবু আমরা যেন ভুলে না যাই, ভারতের বলিষ্ঠ আন্দোলন কিন্তু বারংবার সব রকম বিভাজন অতিক্রম করার কথা বলেছিল। ভিতরের বাইরের নানা রকম ‘কারা’র লৌহকপাট ভেঙে ফেলে সর্বজনের মুক্তির দিকে চলার অঙ্গীকার করেছিল। সেই অঙ্গীকার মনে রাখাই হতে পারে পনেরো অগস্টের একমাত্র উদ্যাপন।