রাজ্য সরকার-পোষিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে যাঁরা শিক্ষকতা করেন, তাঁরা পড়ানোর পাশাপাশি গবেষণার কাজও করেন। এই গবেষণা মৌলিক বা পরীক্ষামূলক, যে কোনও ধরনের হতে পারে। অথচ এই শিক্ষকরা গবেষণার জন্য তেমন কোনও সাহায্য বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারের কাছ থেকে পান না, যেমন পেয়ে থাকেন কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান-গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী অথবা কেন্দ্রীয় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। প্রসঙ্গত, বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি পরিসর যেখানে এক জন ছাত্র কোনও একটি কোর্সে পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণার স্বাদও পায়। ফলে এখান থেকেই শুরু হয় ভবিষ্যতের গবেষক তৈরির প্রক্রিয়া। যাঁরা মৌলিক বিষয়ে গবেষণা করেন তাঁদের সমস্যা হচ্ছে, মানুষ মাঝে মাঝেই প্রশ্ন করেন, এই গবেষণা করে সমাজের কী উপকার হচ্ছে? আসলে আমরা সকলেই চটজলদি ফলাফল প্রত্যাশা করি। কিন্তু মৌলিক গবেষণার ফলাফল যে চটজলদি পাওয়া যায় না, তা বিজ্ঞানের ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে।
অন্য দিকে, রাজ্য-পোষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও শিক্ষক যদি পরীক্ষামূলক গবেষণা করেন, তা হলে তাঁর কাজ আরও কঠিন। কারণ নির্দিষ্ট একটি পরীক্ষামূলক গবেষণার জন্য প্রয়োজন ল্যাবরেটরি, যেখানে থাকবে বেশ কিছু বিশেষ গোত্রের যন্ত্রপাতি, যাদের দাম প্রায়শ লাখ, এমনকি কোটির ঘরে। সেই সব যন্ত্রপাতি আনার জন্য শিক্ষকরা গবেষণা-প্রকল্পের পরিকল্পনা জমা দেন দেশ-বিদেশের এমন সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, যারা অর্থনৈতিক সাহায্য করে। কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে সেই প্রকল্পগুলির মূল্যায়ন ঘটে। সেই মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হলে তবেই পাওয়া যায় প্রকল্পের অনুমোদন, আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জন বিজ্ঞানের শিক্ষক যিনি গবেষণা করেন এবং করান, একটা বড় সময় তাঁকে ব্যয় করতে হয় ল্যাবরেটরি তৈরির কাজে এবং তারও আগে সেই কাজে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড়ের চেষ্টায়। এমনকি, ল্যাবরেটরি চালানোর দৈনন্দিন খরচ এবং যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতির টাকাও সেই শিক্ষককেই জোগাড় করতে হয় গবেষণা-প্রকল্পের মাধ্যমে। এত কিছুর পর গবেষণার ফল হিসেবে গবেষণাপত্রের প্রকাশ অথবা পেটেন্ট নিতে হলে, ওই শিক্ষককে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্তরে এমন সব গবেষকের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় নামতে হয়, যাঁরা গবেষণার কাজে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে ধারাবাহিক ভাবে অনেক বেশি আর্থিক সাহায্য পেয়ে এসেছেন।
এখানে আর একটি কথাও মনে রাখা দরকার, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে গবেষণার জন্য কোনও কেন্দ্রীয় সুবিধা (সেন্ট্রাল ফেসিলিটি) ব্যবস্থা নেই। যেমন আছে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও কোনও শিক্ষা বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে। বর্তমানে উচ্চতর গবেষণার একটা বড় অংশ আন্তঃবিভাগীয় গবেষণা, যেখানে নানা বিষয়ের শিক্ষক-গবেষকেরা যৌথ ভাবে গবেষণা করেন। এই ধরনের গবেষণায় পরিকাঠামো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানে গবেষকেরা এক সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সাধারণ গবেষণা-পরিকাঠামো ব্যবহার করে গবেষণা চালান। সেখানে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর কোনও একটি অংশ অনুপস্থিত থাকলে গবেষণা-প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়বে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে এই ধরনের পরিকাঠামো গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন বিপুল সরকারি অর্থের জোগান। এই মুহূর্তে চিন যে বিজ্ঞান-গবেষণায় অনেকখানি এগিয়ে তার কারণ, সে দেশের সরকার ভারতের তুলনায় বিজ্ঞান-গবেষণায় ঢের বেশি অর্থ বরাদ্দ করে। চিন ব্যয় করে জিডিপি-র ২.৪-২.৬%, আর আমাদের দেশে তা ০.৬-০.৭%। বলা বাহুল্য, রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বিজ্ঞান-গবেষণায় ব্যয়-বরাদ্দের অবস্থা আরও শোচনীয়।
গবেষণার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হলেন গবেষকরা। কিন্তু এই মুহূর্তে উপযুক্ত গবেষক পাওয়াই আমাদের রাজ্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা। অথচ একটা সময় সারা ভারতবর্ষের সমস্ত বিখ্যাত বিজ্ঞান-গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বাঙালি গবেষকদের আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো। বাঙালির এই দুর্নাম ছিল যে, তারা আইএএস অথবা আইপিএস হতে চায় না। কিন্তু বাঙালি চিরকালই গবেষণা করতে চেয়েছে, বিজ্ঞানী-গবেষকদের মাথায় করে রেখেছে। সে জন্য এখনও সারা দেশের বেশির ভাগ বিজ্ঞান-গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বাঙালি বিজ্ঞানীদের আধিপত্য প্রশ্নাতীত। আসলে এই গবেষকদের একটা বড় অংশ আসত বাংলার গ্রামগঞ্জ, মফস্সলের সরকার-পোষিত স্কুলগুলো থেকে। সেই সব ছাত্রের চোখে লেগে থাকত বিজ্ঞানের এক-একটা বিষয়ের প্রতি অদ্ভুত ভালবাসা। বিষয়ের গভীর থেকে তারা এমন বহু প্রশ্ন তুলে আনত, যা অভিজ্ঞ শিক্ষকদেরও ভাবাত।
অথচ এখন এক দিকে সেই সরকার-পোষিত স্কুলগুলো পরিকাঠামো ও শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছে, অন্য দিকে সর্বভারতীয় পরীক্ষায় সাফল্যের জন্য বাড়ছে বেসরকারি কোচিং সেন্টারগুলোর রমরমা। এই সব কিছুর মধ্যে যে সব ছাত্র এখনও রাজ্য সরকার-পোষিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে উচ্চতর গবেষণার জন্যে আসছে, তারা মুখোমুখি হচ্ছে এক চরম অনিশ্চয়তার। এক দিকে তাদের ফেলোশিপের টাকা আসছে না, অন্য দিকে অপ্রতুল গবেষণা-পরিকাঠামোর মধ্যে তারা কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। তা ছাড়া, তাদের সামনে ভবিষ্যতের কোনও সঠিক দিশাও নেই। ফলে গবেষণার প্রতি আগ্রহ কমছে। শুধু আমাদের রাজ্যে নয়, দেশের বিখ্যাত বিজ্ঞান-গবেষণা কেন্দ্রগুলিতেও এখন ভাল মানের গবেষকের আকাল। কয়েক দিন আগেই আইআইটি-র এক জন শিক্ষকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি জানালেন, ইদানীং তাঁরা গবেষক প্রায় পাচ্ছেনই না। এখন যা অবস্থা তাতে নেট-গেট পাশের দরকার নেই, শুধু গবেষণা করার ইচ্ছেটুকু আছে— এমন ছাত্র হলেই তাঁরা বর্তে যান। বোঝাই যাচ্ছে, আমাদের দেশে বিজ্ঞান-গবেষণা আগামী দিনে কোন সঙ্কটের দিকে এগিয়ে চলেছে।
এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার শিক্ষকদের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রান্সফার বিল পাশ করিয়েছে। এর ফলে সম্ভবত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন গবেষকেরা। এক দিকে তাঁদের পিএইচ ডি গাইডকে বদলি করা হলে তাঁদের গবেষণা মাঝপথে ধাক্কা খাবে। কারণ বিজ্ঞানের গবেষণা বহুলাংশে গাইড-নির্ভর এবং গাইডের তৈরি ল্যাবরেটরি-নির্ভর। এমনিতেই বিজ্ঞান-গবেষণা অনিশ্চয়তায় ভরা। অনেক সময় বেশ কয়েক বছর কাজ করার পরেও গবেষকেরা কাঙ্ক্ষিত ফল পান না। এর উপর যদি কাজের মাঝপথে গাইড চলে যান, তা হলে সেই গবেষণার পরিণতি শোচনীয় হতে বাধ্য। এমন ঘটনা, বলা বাহল্য, গবেষকদের চরম বিপদ ও হতাশার মধ্যে ফেলে দেবে।
অন্য দিকে, যে শিক্ষক বহু বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর গবেষণার জন্য প্রকল্প লিখে, টাকা আনিয়ে তিল তিল করে ল্যাবরেটরি গড়ে তুললেন, তাঁর সেই পরিশ্রমও শেষ পর্যন্ত উপযুক্ত মূল্য পাবে না। শিক্ষকদের ভবিষ্যৎকে যদি এই রকম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়, নিশ্চিত ভাবে তাঁরাও উদ্যম হারাবেন, গবেষণা প্রকল্প আনার জন্য সচেষ্ট হবেন না, রাজ্য সরকার-পোষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত গবেষণা-পরিকাঠামোর মধ্যে গবেষণা চালানোর যে কাজটি তাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে এত কাল করে এসেছেন, সম্ভবত সেই কাজেও তাঁরা উৎসাহ হারাবেন। ভবিষ্যতে হয়তো শুধু পড়ানোর জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন তাঁরা।
এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাজ্য-পোষিত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নাক’ রেটিং, এনআইআরএফ র্যাঙ্কিং প্রভৃতির ক্ষেত্রে গবেষণাপত্রের সংখ্যা, গবেষণা-প্রকল্প, গবেষক সংখ্যা— এই সব কিছুরই বড় ভূমিকা। গত বছরের এনআইআরএফ র্যাঙ্কিং দেখলেই বোঝা যাবে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে যে সব বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সব ক’টি কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্যপ্রাপ্ত। একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণার সাফল্য নির্ভর করে সেই প্রতিষ্ঠানের গবেষণার পরিকাঠামো, শিক্ষক, গবেষক, গ্রন্থাগার, অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক স্বশাসন প্রভৃতি উপাদান-নির্মিত একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্রের উপরে। বাস্তুতন্ত্রের প্রতিটি উপাদানই একে অপরের পরিপূরক। তাদের যে কোনও একটি অংশ যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তা হলে সেই প্রতিষ্ঠানের গবেষণার মান কমতে বাধ্য।
পদার্থবিদ্যা বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়