E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

‘রিল’ রাজনীতির ফাঁদ

স্বাধীন ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে এমন আলোচনা কি আগে হয়েছে? নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, না। তর্কের খাতিরে কেউ বলতেই পারেন, আগে তো ইনস্টাগ্রামই ছিল না! এমন প্রসঙ্গ আসবেই বা কেন?

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৩ অগস্ট ২০২৬ ০৬:১৩

কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক চলছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের মন্ত্রীদের ইনস্টাগ্রামে সক্রিয় হতে বলছেন। ইনস্টাগ্রামের জন্য আরও বেশি করে ভিডিয়ো বা রিল তৈরি করতে বলছেন। মন্ত্রিসভার বৈঠকের আগের রাতে প্রধানমন্ত্রী নিজেই তরুণদের বার্তা দিতে ইনস্টাগ্রামে ভিডিয়ো করেছিলেন। তা দেখিয়ে সহকর্মীদের রিল তৈরিতে অনুপ্রাণিত করছেন তিনি।

স্বাধীন ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে এমন আলোচনা কি আগে হয়েছে? নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, না। তর্কের খাতিরে কেউ বলতেই পারেন, আগে তো ইনস্টাগ্রামই ছিল না! এমন প্রসঙ্গ আসবেই বা কেন? তা ঠিক। তবে এটাও সত্যি, ইনস্টাগ্রামের বয়সও ষোলো বছর হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে গত বারো বছরে তাঁর সরকারের মন্ত্রীদের ইনস্টাগ্রামে সক্রিয়তা নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়নি। ২৪ জুলাই মন্ত্রিসভার বৈঠকে পঁচাত্তর-পার প্রধানমন্ত্রীকে তা-ও করতে হল।

ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে যন্তর মন্তরে জেন জ়ি-র আন্দোলন দেশ জুড়ে যে ঢেউ তুলেছে, শুধুমাত্র তা নরেন্দ্র মোদীর ইনস্টাগ্রাম নিয়ে উৎসাহের কারণ নয়। এর পিছনে আসল রহস্য বুঝতে তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে পিছিয়ে যেতে হবে। তামিল সিনেমার নায়ক ‘তলপতি’ জোসেফ বিজয়ের দল টিভিকে যে ভাবে দক্ষিণের রাজ্যে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছে, এ দেশের রাজনীতির চিরাচরিত রণকৌশল দিয়ে তার ব্যাখ্যা করা যায় না। টিভিকে এমন একটি দল হিসেবে তামিলনাড়ুর ভোটে নেমেছিল, যার কোনও সংগঠন নেই, জাতপাতের সমীকরণের ভরসা নেই, কোনও নির্দিষ্ট মতাদর্শ নেই। ভরসা শুধু নেট-দুনিয়ার সমাজমাধ্যম, বিশেষ করে ইনস্টাগ্রাম। এবং অবশ্যই, রাজনীতিতে ‘পরিবর্তন’-এর জন্য আশাবাদী তরুণ প্রজন্ম। যাঁরা বিজয়ের থেকে আশা করেছিলেন, তিনি তামিলনাড়ুর চিরাচরিত ডিএমকে বনাম এআইএডিএমকে-র লড়াই পিছনে ফেলে রাজনীতিতে নতুন পথ দেখাবেন। বৃহত্তর চেন্নাই থেকে শুরু করে তামিলনাড়ুর শহরাঞ্চলের ভোট জিতে বিজয় মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে বসে পড়লেন।

এই ‘পরিবর্তন’-এর আশা নিয়েই জেন-জ়ি বা ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীরা যন্তর মন্তরে ভিড় করেছিলেন। না, সরকার পরিবর্তনের জন্য নয়। রাজনীতিতে পরিবর্তনের জন্য। যে রাজনীতি ভবিষ্যতের আশা দেখাবে, পুরনো আনুগত্য চাইবে না। কোনও রাজনৈতিক নেতাকে দেশের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিরতার জন্য ‘অপরিহার্য’ হিসেবে তুলে ধরবে না। সরকারি ব্যর্থতার দায় নিতে পারবে।

তরুণ প্রজন্মের এই ‘পরিবর্তন’-এর আকাঙ্ক্ষা বিজেপিকে সবচেয়ে বেশি চোট দিয়েছে বিহারের বাঁকিপুরে। বিজেপির ইতিহাসে এই প্রথম দলের জাতীয় সভাপতির ঘরের মাঠে বিজেপি উপনির্বাচনে হেরে গিয়েছে। ষোলো বছর আগে ইনস্টাগ্রাম ভারতে পা রেখেছিল। সেই সময় থেকেই নিতিন নবীন বাঁকিপুরের বিধায়ক। তার আগে ওই এলাকারই পশ্চিম পটনা আসন থেকে উপনির্বাচনে জিতে প্রথম বার বিহারের বিধায়ক হয়েছিলেন তিনি। গত বছরের শেষে বিহারের বিধানসভা ভোটে নিতিন নবীন ৫০ হাজারের বেশি ভোটে জিতেছিলেন। তাঁকে রাজ্যসভায় জিতিয়ে আনার পরে বাঁকিপুরের উপনির্বাচনে বিজেপি হেরে গেল। পটনার চারটি শহরাঞ্চলের বিধানসভা কেন্দ্র, পটনা সাহিব, দিঘা, কুম্হরার ও বাঁকিপুর বরাবরই বিজেপির দখলে থাকে। বাঁকিপুর ও আশেপাশের এলাকায় সরকারি চাকরির পরীক্ষার জন্য কোচিং সেন্টার ভর্তি। গোটা বিহারের তরুণদের ভিড়। বিজেপির জাতীয় সভাপতির সেই গড় থেকে ভোটে জিতে বিধায়ক হলেন প্রশান্ত কিশোর। বারো বছর আগে তিনি ভোটকুশলী হিসেবে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপির কেন্দ্রে ক্ষমতা দখলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। কিন্তু মাস ছয়েক আগে বিহারের বিধানসভা ভোটে তাঁর জন সুরাজ পার্টি কল্কে পায়নি। যদিও বিকল্প রাজনৈতিক ভাষ্যের সন্ধান দিয়েছিল। এ বার প্রশান্ত তার সুবিধা পেলেন।

তামিলনাড়ুর ভোট, যন্তর মন্তরের আন্দোলন, বাঁকিপুরের ভোট— রাজনৈতিক দলগুলির জন্য বার্তা স্পষ্ট। তরুণ প্রজন্ম ‘পরিবর্তন’ চাইছে। সরকারের পরিবর্তন নয়। রাজনৈতিক ভাষ্যের পরিবর্তন। রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়ের পরিবর্তন। শুধুমাত্র প্রতীকী রাজনীতি করে এই তরুণ প্রজন্মের মন জয় করা যাবে না।

তাৎপর্যপূর্ণ হল, নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পিছনে তরুণ প্রজন্মের বড় ভূমিকা ছিল। মোদী প্রথম প্রজন্মের তরুণ উচ্চাকাঙ্ক্ষীদের ‘অচ্ছে দিন’-এর আশা দেখিয়েছিলেন। কিন্তু গত বারো বছরে বিজেপি ক্রমশ মধ্যবয়স্ক হিন্দু ভোটারদের রক্ষণশীল পার্টি হয়ে উঠেছে। যে মধ্যবয়স্ক হিন্দু ভোটাররা বিশ্বাস করেন, নরেন্দ্র মোদী না থাকলে পাকিস্তানের মদতপুষ্ট জেহাদিরা ভারত দখল করে ফেলবে, বিদেশি অর্থের অনুদানে দেশে নৈরাজ্য তৈরি করা হবে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার ফলে শেয়ার বাজারে ধস নামবে।

আজকের তরুণ প্রজন্ম এই প্রশ্নাতীত আনুগত্যে নারাজ। যে তরুণরা ২০২৯-এ প্রথম বার লোকসভা নির্বাচনে ভোট দিতে যাবেন, শুধুমাত্র ইনস্টাগ্রামে রিল তৈরি করে তাঁদের মন জয় করা যাবে, এমন আশা করা ভুল। তা হলে তাঁরা পঁয়তাল্লিশ বছরের নিতিন নবীনের বিজেপি সভাপতি হওয়াতেই সন্তুষ্ট থাকতেন। তাই অদূর ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ এনে নরেন্দ্র মোদী তরুণদের মন জয় করতে পারবেন কি না, তা নিয়েও সংশয় থেকে যায়। মনে রাখতে হবে, যন্তর মন্তরে যে তরুণ প্রজন্ম নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে স্লোগান তুলেছিল, তাঁরা সকলেই দিল্লি বা আশেপাশের রাজ্য, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান বা বিহারের ভূমিপুত্র। এই হিন্দি বলয় এত দিন বিজেপির দুর্জয় ঘাঁটি ছিল। যন্তর মন্তরের আন্দোলন বা বাঁকিপুরের হার বিজেপির জন্য বার্তা, বিজেপির নিজের গড়েই দলের ভোটব্যাঙ্ক সরে যেতে পারে।

বিরোধী শিবির, বিশেষ করে রাহুল গান্ধীর এতে আনন্দিত হওয়ার কারণ এখনও দেখা যাচ্ছে না। কারণ জেন-জ়ি নরেন্দ্র মোদীর দিক থেকে মুখ ফেরালেও তাঁর দিকে চাইবেন, এমন লক্ষণ এখনও পর্যন্ত নেই। বরং পরিবর্তন-এর আকাঙ্ক্ষা, জাতপাতের প্রতিনিধিত্ব বা কর্মসংস্থান নিয়ে ক্ষোভের সুবিধা কোথাও ‘তলপতি’ বিজয়, কোথাও প্রশান্ত কিশোর কুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সরাসরি রাজনীতিতে এখনও যোগ না দিলেও অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাসরা নতুন রাজনৈতিক ভাষ্য তৈরি করে ফেলেছেন। ককরোচ জনতা পার্টির পিছনে বিদেশি আর্থিক মদত রয়েছে বলে পুরনো মরচে ধরা অভিযোগ তুলে তাঁদের ঘায়েল করা মুশকিল। রাহুল গান্ধীকে রক গানের কনসার্ট বা কলেজ ফেস্ট-এর মতো জনসভার আয়োজন করতে হচ্ছে। কংগ্রেসের নেতাদের বদলে দলের জনসভায় তরুণদের দিয়ে কথা বলানো হচ্ছে।

অমিত শাহ বিজেপির সভাপতি হিসেবে বুথ-স্তর পর্যন্ত দলের সংগঠন মজবুত করে ফেলেছিলেন। আরএসএস-এর প্রচারকদের কাজে নামানো হয়েছিল, যাঁরা চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করেন। কেন্দ্রে ও অধিকাংশ রাজ্যে ক্ষমতায় থাকার সুবাদে বিজেপির আর্থিক শক্তিও কম ছিল না। তার সঙ্গে বিজেপির আইটি সেল ওয়টস্যাপ, ফেসবুকের মগজ ধোলাইয়ের যন্ত্র চালিয়ে গিয়েছে। কংগ্রেস এই অমিত-শক্তির সঙ্গে এঁটে উঠতে পারেনি। কিন্তু তামিলনাড়ুতে বিজয় দেখিয়েছেন, সাংগঠনিক শক্তি ছাড়াও ভোটে জেতা সম্ভব। ককরোচ জনতা পার্টি দেখিয়েছে, বিজেপিকে নেট-দুনিয়ার লড়াইতে হারানো যায়। বাঁকিপুরে মাত্র ৩৫ শতাংশ ভোটগ্রহণ দেখিয়েছে, বিজেপির সংগঠনও নিজের ভোটারদের নির্বাচনী বুথে নিয়ে আসতে ব্যর্থ হতে পারে।

নরেন্দ্র মোদী সময়ের প্রয়োজন বুঝে ‘ওয়টস্যাপ ফরোয়ার্ড’-এর বাইরে ইনস্টাগ্রামে তরুণ-ভক্তের খোঁজ করছেন। রাহুল গান্ধী সাদা টি-শার্ট ছেড়ে তরুণদের জনসভায় গোলাপি জামা পরছেন। কংগ্রেস রাহুলের সঙ্গে তরুণদের কথাবার্তার ‘রিল’ তৈরি করছে।

গত ২৪ জুলাই কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সব মন্ত্রীকে ইনস্টাগ্রামে সক্রিয় হতে বলার পরে এক মন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘরোয়া আড্ডায় বলছিলেন, সোশ্যাল মিডিয়া শিশু, কিশোর, তরুণদের মস্তিষ্কের বৃদ্ধিতে বাধা হয়ে উঠছে। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় কী ভাবে লাগাম পরানো যায়, ভাবা দরকার।

নেতারা মনে করেছিলেন, ‘রিল’-কে হাতিয়ার করে তাঁরা দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করবেন। জেন-জ়ি’র হাতে পড়ে সেই ‘রিল’ এখন দেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Young Generation Generation Z Central Government Social Media indian politics

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy