E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

চলতে চলতে ঠিক...

এমএসএমই-র ক্ষেত্রে তৃণমূল সরকার উন্নয়ন নীতি হিসাবে বেছে নিয়েছে মূলত আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথ। ২০২০ সালে তৈরি হয়েছে বাংলাশ্রী প্রকল্প, যার মাধ্যমে এমএসএমই সংস্থার মূলধনি বিনিয়োগে ভর্তুকি এবং সুদের হারে ভর্তুকি পাওয়ার কথা।

অমিতাভ গুপ্ত

শেষ আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:১৩
সার্থক?: বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অন্যরা। ফেব্রুয়ারি, ২০২৫।

সার্থক?: বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অন্যরা। ফেব্রুয়ারি, ২০২৫। ছবি: দেবস্মিতা ভট্টাচার্য।

পশ্চিমবঙ্গের শিল্প নিয়ে কথা শুরু করব কোথা থেকে, সেটাই মোক্ষম প্রশ্ন। প্রতি বছর যে বাণিজ্য সম্মেলন আয়োজিত হয়, তার হিসাব দিয়ে শুরু করব, না কি যে অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, মাঝারি উদ্যোগের সংখ্যার নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ গোটা দেশের মধ্যে অগ্রগণ্য, সে ক্ষেত্র সম্বন্ধে পরিসংখ্যানের ভয়ঙ্কর অভাবের কথাই বলা প্রয়োজন শুরুতে? বাণিজ্য-শ্মশান হিসাবে খ্যাতি অর্জন করা রাজ্যে গত ১৫ বছরে কত নতুন সংস্থা নথিভুক্ত হল, সে তথ্যের গুরুত্ব বেশি; না কি আগে মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে, সরকারি হিসাবে যে ডেউচা-পাঁচামিতে ৩৫,০০০ কোটি টাকা লগ্নি আসার কথা, এখনও তাতে লগ্নিকারীদের আগ্রহ নেই বললেই চলে?

বৈপরীত্যে ঠাসা এই রাজ্যের নিরিখেও শিল্পক্ষেত্রে বৈপরীত্যের সহাবস্থান প্রবল। যেমন, পশ্চিমবঙ্গে নথিভুক্ত অফিস আছে, ২০১১ সালে এমন সংস্থার সংখ্যা ছিল ১,৩৭,১৫৬। ২০২৫-এর মার্চে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,৫০,৩৪৩। খুব বেশি বৃদ্ধি, তেমন দাবি করা যাবে না— কিন্তু, খুব কম, বলা যাবে না সে কথাও। কেন্দ্রীয় সরকারের পরিসংখ্যানেই দেখা যাচ্ছে, কোভিড এবং লকডাউনের কারণে যখন গোটা দেশের অর্থব্যবস্থা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, সে বছরও পশ্চিমবঙ্গে নতুন সংস্থা নথিভুক্ত হয়েছে। যে বছরের জন্য শেষ পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে, সেই ২০২৩-২৪ সালে পশ্চিমবঙ্গে নথিভুক্ত হয়েছিল ৮৬৮৩টি সংস্থা, আর এ রাজ্যের খাতা থেকে নাম কাটিয়েছিল ৩৭১টি।

কিন্তু, এই পরিসংখ্যানই কি শিল্প ক্ষেত্রে রাজ্যের উন্নতির পক্ষে অকাট্য প্রমাণ? একেবারেই নয়। প্রথম কথা হল, রাজ্যে কতগুলি সংস্থা নথিভুক্ত হল, তা থেকে আদৌ বোঝার উপায় নেই যে, তার মধ্যে কতগুলি সংস্থার অস্তিত্ব শুধু নামেই, আর কতগুলি সংস্থা সত্যিই অর্থনৈতিক উৎপাদনে যোগদান করে। দ্বিতীয়ত, যে সংস্থাগুলি সত্যিই অর্থনৈতিক উৎপাদনে যোগ দিচ্ছে, সেগুলির আয়তনও এই পরিসংখ্যানে নেই। কোথায় আছে, দেবা ন জানন্তি, তার কারণ— পশ্চিমবঙ্গের শিল্পক্ষেত্র নিয়ে পরিসংখ্যান খুঁজে বার করা এক দুঃসাধ্য অভিযান। গত ডিসেম্বরে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছিলেন যে, তাঁর শাসনকালে এ রাজ্যে প্রতিটি কারখানায় গড় মুনাফা বেড়েছে ৫৪৬ শতাংশ, অর্থাৎ সাড়ে পাঁচ গুণ। এই তথ্যের সাপেক্ষে পরিসংখ্যান কোথায়, তা হয়তো ভবিষ্যতে জানা যাবে, অথবা যাবে না।

কিন্তু, যেটুকু হিসাব জনপরিসরে রয়েছে, তা রাজ্যের পক্ষে আশাপ্রদ নয়। ২০১৫ সালে বেঙ্গল গ্লোবাল বিজ়নেস সামিট (বিজিবিএস, অথবা বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন) আরম্ভ হওয়ার পর থেকে ২০২২ সাল অবধি সে সম্মেলনে মোট বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে সওয়া সাত লক্ষ কোটি টাকারও বেশি— তার ২১.৫% বাস্তবায়িত হয়েছে, ১,৫৫,৯৮৩ কোটি টাকা। এবং, এই পরিসংখ্যানটিও দাঁড়িয়ে আছে ২০১৭ সালে রিলায়েন্স-এর প্রতিশ্রুতির চেয়ে ঢের বেশি লগ্নির কারণে— সেই সংখ্যাটি সরিয়ে নিলে বাকি ছবি ভয়ানকতর। সাম্প্রতিক কালের হিসাব যদি দেখি, তবে ২০২০ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত এ রাজ্যে ১৪৬টি প্রকল্পে মোট বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে ৬৫,২৩৮ কোটি টাকা— তার মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে ১১৬টি প্রকল্পে ১৫,১৮৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, দশ বছর বা পাঁচ বছর, যে কোনও সময়পর্বেই পশ্চিমবঙ্গে প্রস্তাবিত লগ্নির সিকি ভাগও বাস্তবায়িত হয়নি। কেন, সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।

তবে, দেশের শিল্পোন্নত রাজ্যগুলিতেও প্রস্তাবিত লগ্নির সঙ্গে তার বাস্তবায়নের ফারাক বেশ গুরুতর। যেমন, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মহারাষ্ট্রে লগ্নিপ্রস্তাব এসেছিল ৫.৭২ লক্ষ কোটি টাকার, বাস্তবায়িত হয়েছে ১.৯৯ লক্ষ কোটি টাকার লগ্নি— অনুপাত ৩৫ শতাংশের কাছাকাছি। কর্নাটকের ক্ষেত্রে সংখ্যা দু’টি যথাক্রমে ৩.৩২ লক্ষ কোটি টাকা এবং ৩৩,৫৪৬ কোটি টাকা— অনুপাত ১০ শতাংশ। ব্যতিক্রমী রাজ্য গুজরাত, সেখানে এই সময়কালে প্রস্তাবিত ৩.৭৩ লক্ষ কোটি টাকার মধ্যে ৮৭ শতাংশই বাস্তবায়িত হয়েছে। অন্য রাজ্যের তুলনায় গুজরাতের ছবিটি কেন আলাদা, সে ভিন্ন আলোচনার বিষয়। কিন্তু, মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যে যত বিনিয়োগ প্রস্তাব আসে, পশ্চিমবঙ্গে তার দশ শতাংশও আসে না কেন? তার অনেকগুলো কারণের মধ্যে তিনটি উল্লেখ করা যাক— এক, এ রাজ্যে জমি নিয়ে জট সাংঘাতিক; দুই, রাজ্যের কর্মসংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে; এবং তিন, যে রাজ্যের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার সর্বদাই খড়্গহস্ত, লগ্নিকারীদের কাছে তা আকর্ষণীয় গন্তব্য না-হওয়াই স্বাভাবিক। অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গে কেন লগ্নি আসে না, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চাইলে শুধু রাজ্য সরকারের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করাই যথেষ্ট নয়।

বিজিবিএস-এ প্রস্তাবিত লগ্নির তুলনায় বাস্তবায়নের অনুপাতে এগিয়ে রয়েছে যে ক্ষেত্রগুলি, তথ্যপ্রযুক্তি বাদে তার প্রতিটিতেই প্রস্তাবিত লগ্নির পরিমাণ তুলনায় কম। খানিকটা অবাক করার মতো তথ্য হল, পশ্চিমবঙ্গ সরকার পর্যটন ক্ষেত্রে প্রচুর গুরুত্ব দেওয়া সত্ত্বেও, এবং গত কয়েক বছরে ভারতের পর্যটন মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গের বেশ উন্নতি ঘটা সত্ত্বেও এই ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত লগ্নির মাত্র পাঁচ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে ২০২২ সাল অবধি। কিন্তু, যে তথ্যে অবাক হওয়ার বিন্দুমাত্র কারণ নেই, তা হল, সরকারি দফতরের অভিমত অনুযায়ীই বহু লগ্নিপ্রস্তাব শেষ অবধি আটকে গিয়েছে জমি সংক্রান্ত জটে। ২০১১ থেকে এখন অবধি মোট দশটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক বা শিল্পাঞ্চলের জন্য ২০৯৪ একর জমি দেওয়া হয়েছে; তা ছাড়া ২১৪টি বড় প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৩৪০০ একর জমি। গোটা রাজ্যের নিরিখে সংখ্যাগুলি অকিঞ্চিৎকর।

এ রাজ্য অবশ্য বহু দিন ধরেই বৃহৎ শিল্প-নির্ভর নয়— মূল চালিকাশক্তি মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ়েস (এমএসএমই) বা অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। ২০২২-২৩ সালের হিসাবে, রাজ্যে এমএসএমই-র সংখ্যা ৯০ লক্ষ, আর ১.৩৫ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয় এই ক্ষেত্রে। বহুবিধ পণ্য ক্লাস্টারও তৈরি হয়েছে রাজ্যে। সমস্যা হল, এমএসএমই ক্ষেত্রে বিনিয়োগের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গের বেশির ভাগ সংস্থার স্থান নীচের দিকে, গড় লগ্নিপুঁজির পরিমাণ কম। খাতায়-কলমে সংস্থা, এমন বহু এমএসএমই-তে কাজ করেন এক জনই, অর্থাৎ যিনি লগ্নি করেন, তিনি। অথবা, পরিবারের অন্য সদস্যরা যোগ দেন তাঁর সঙ্গে। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, এ রাজ্যে এমএসএমই-র মালিকানায় মহিলাদের অংশ গোটা দেশে সবচেয়ে বেশি— এবং, দেশের প্রতি চার জন মহিলা উদ্যোগীর মধ্যে এক জন পশ্চিমবঙ্গে রয়েছেন। কিন্তু, একে শিল্পক্ষেত্রে নারী ক্ষমতায়নের সূচক বলে ধরা যাবে কি? এমএসএমই-র গড় কর্মিসংখ্যা যেখানে দেড় জন, সেখানে নারী-মালিকানার বেশির ভাগ সংস্থাই আসলে বেঁচে থাকার মরিয়া চেষ্টা।

এমএসএমই-র ক্ষেত্রে তৃণমূল সরকার উন্নয়ন নীতি হিসাবে বেছে নিয়েছে মূলত আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথ। ২০২০ সালে তৈরি হয়েছে বাংলাশ্রী প্রকল্প, যার মাধ্যমে এমএসএমই সংস্থার মূলধনি বিনিয়োগে ভর্তুকি এবং সুদের হারে ভর্তুকি পাওয়ার কথা। পাশাপাশি তৈরি হয়েছে ভবিষ্যৎ ক্রেডিট কার্ড। যদিও এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ভাবে এমএসএমই-র কথা বলা নেই, তবু এই ঋণের মূল অভিমুখ সেই দিকেই হওয়ার কথা। এখন অবধি বাংলাশ্রী প্রকল্পে অনুমোদন পেয়েছে মোট ৪,৮০০টি ব্যবসা, মোট বরাদ্দ হয়েছে ১০৫০ কোটি টাকা; ভবিষ্যৎ ক্রেডিট কার্ডে ঋণ দেওয়া হয়েছে মোট ১২০০ কোটি টাকা। প্রয়োজনের তুলনায় অঙ্কগুলি নেহাতই ছোট।

রাজ্যে শিল্পের কথা কোথা থেকে শুরু করা উচিত, সেটা যেমন সমস্যা, সে কথা কোথায় গিয়ে শেষ হয়, সেটা স্থির করাও কম সমস্যা নয়। অনেক উন্নতি হচ্ছে, বলার উপায় নেই। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না, এই প্রচলিত বিশ্বাসটিও সম্ভবত ভিত্তিহীন। পশ্চিমবঙ্গ তার নিজের গতিতে চলেছে— শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পৌঁছবে, সেটা খোলা প্রশ্ন।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
global bengal business summit industries

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy