জননীতির দর্শনে একটি কেন্দ্রীয় ধারণা হল ইউনিভার্সালিজ়ম বা সর্বজনীনতা। এই সর্বজনীনতার ধারণাটি আধুনিক যুগের নীতির দর্শনের কেন্দ্রে থাকলেও ধারণাটি তত প্রাচীন নয়। সংবিধান-ভিত্তিক গণতান্ত্রিক আধুনিক সার্বভৌম রাষ্ট্রের উত্থানের সঙ্গে সর্বজনীনতার ধারণাটি জননীতির কেন্দ্রীয় ধারণা বলে গ্রাহ্য হয়েছে। সংবিধানে সমস্ত নাগরিকের সমান অধিকারের কথা নিয়মমাফিক বলা হয়ে থাকে। কিন্তু সামাজিক পরিসরে? সংবিধান-প্রদত্ত তথাকথিত রাজনৈতিক সমানাধিকার আর্থনীতিক ও সামাজিক অসাম্যের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব-বিরোধ নিয়েই সহাবস্থান করে।
আর্থনীতিক অসাম্যের সঙ্গে সামাজিক বৈষম্যের সম্পর্কও বেশ জোরালো। শিক্ষার সর্বজনীনতা আর্থনীতিক অসাম্য কমানোর একটি আবশ্যিক শর্ত বলে মনে করা হয়। শিক্ষানীতির প্রশ্নে, বা ‘কার জন্যে কেমন শিক্ষা চাই’ এ রকম একটি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেই আজও দেখা যায় শ্রেণিস্বার্থের উঁকিঝুঁকি। মিড-ডে মিলের বিরুদ্ধ মতটি আসতে দেখেছি তাঁদের থেকে, যাঁদের সন্ততিদের কাছে মিড-ডে মিলের তেমন গুরুত্ব নেই, যাঁরা মনে করেন ‘নো ডিটেনশন’ নীতি শিক্ষার পক্ষে ভাল নয়। অমর্ত্য সেন তাই বার বার মনে করিয়ে দেন, ভারতে বনিয়াদি শিক্ষা আদতে একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন। এই রাজনৈতিকতার উপলব্ধি দেখতে পাই আজ, যখন ভারতের তরুণ সমাজ বিদ্যালয়গুলির দুরবস্থার প্রতি নজর দিতে বলে রাষ্ট্রকে, এবং তার জন্য ধাক্কা খায়।
বনিয়াদি শিক্ষার এই রাজনৈতিকতার উৎস খুঁজতে খুঁজতে ঊনবিংশ শতাব্দীতে উপনীত হতে হয়, আর বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১) যে-হেতু গোটা শতকের অনেকটা জুড়ে ছিলেন, সে সময়ের সামাজিক প্রগতির আলোচনায় তাঁর নাম কেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। শিক্ষা যে সামাজিক সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার একটি প্রধান উপায় হয়ে উঠতে পারে, তা বিদ্যাসাগরের থেকে ভাল আর কে বুঝেছেন সে কালে! প্রাথমিক ভাবে মনে হয়, আর্থনীতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া উচ্চ বর্ণের পুরুষদের ইংরেজি শিক্ষার সুযোগ করে দিয়ে আর্থনীতিক সিঁড়ি দিয়ে উঠতে সাহায্য করাই যেন তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। সংস্কৃত কলেজের পাঠ্যক্রম সংস্কারের দায়িত্ব পেলেন যখন, তাঁর লক্ষ্য ছিল ধর্মতত্ত্বের পরিসর কমিয়ে এনে আধুনিক কার্যকর শিক্ষার প্রসার। কিন্তু শিক্ষাকে তিনি শুধু এই ব্যবহারিক মূল্যের দিক থেকেই দেখেননি, এর অন্তর্নিহিত মূল্যকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছেন, কিন্তু তার মর্মবস্তু ধর্মতত্ত্ব নয়।
বিদ্যাসাগরের সমাজদর্শনের মর্মবস্তুর খোঁজ করতে গেলে যে কথাটি মনে আসে তা হল মানবকেন্দ্রিকতা। বিনয় ঘোষ যা ‘হিউম্যানিজ়ম’ অর্থে ব্যবহার করেছেন— “অপার্থিব থেকে পার্থিবের প্রতি, স্বর্গলোকের দেবতা থেকে মর্ত্যলোকের মানুষের প্রতি, অদৃশ্য অলৌকিক জগৎ থেকে দৃশ্যমান বহির্জগতের প্রতি মানুষের চিন্তাধারাকে পরিচালিত ও কেন্দ্রীভূত করাই ‘হিউম্যানিস্ট’-এর আদর্শ”। বিদ্যাসাগর ধর্ম বা ঈশ্বর নিয়ে ব্যক্তিগত পরিসরে কী ভাবতেন তা জানা যায় না, কিন্তু সামাজিক পরিসরে তা যে কখনও তিনি টেনে আনেননি তা বলা যায়। এখানেও তাঁর স্বাতন্ত্র্য। ‘ইহজাগতিকতা’— এই চমৎকার শব্দটির সঙ্গে বাংলা পাঠককে পরিচিত করিয়ে দেন আনিসুজ্জামান। মোটামুটি একটি সংজ্ঞাও দিয়ে গেছেন তিনি ধারণাটির, “যে জগৎ ইন্দ্রিয়গোচর ও যুক্তিগ্রাহ্য এবং যে জীবন জন্ম ও মৃত্যুর সীমায় আবদ্ধ, সেই জগৎ ও জীবন সম্পর্কে উৎকণ্ঠাকেই বলা যায় ইহজাগতিকতা।” বিদ্যাসাগরের জীবনকাহিনি থেকে তাঁর জীবনদর্শনের যে নির্যাসটুকু পাই তাকে এক কথায় হয়তো বলা যায় ইহজাগতিকতা।
কতিপয় মানুষের প্রগতিশীল চিন্তা ও কর্মধারা সমাজ প্রগতিকে যে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে এই মতটিই তখন জোরালো ছিল। কিন্তু তা যে যথেষ্ট নয়, এখন বোঝা যায়। ব্যক্তি-উদ্যোগের সঙ্গে যখন যুক্ত হয় জন-উদ্যোগ, এবং তার সঙ্গে রাষ্ট্র যখন রসদ জোগাতে বাধ্য হয়, তখনই সামগ্রিক প্রগতির সম্ভাবনা দেখা যায়। ঊনবিংশ শতকে বাংলায় মানব উন্নয়নের বাধা-বৈচিত্রের আন্দাজ পেতে হলে মনে রাখা দরকার সামাজিক পশ্চাৎপদতার কথা, বিশেষত নারী শিক্ষার অভাব, এবং তার সঙ্গে বিদ্যায়তনের অভাব, শিক্ষকের অভাব, শিক্ষায় বিনিয়োগের অভাব— অর্থনীতিতে যাকে জোগানের দিকের সমস্যা বলা হয়। উনিশ শতকের আলোচনা প্রথমটির উপর যতটা আলো ফেলে, দ্বিতীয়টিতে তেমন নয়— কারণ লক্ষ্যটি ছিল ‘আলোকায়ন’ এবং তার কান্ডারিদের চিহ্নিত করা, তাঁদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব এমনকি স্ববিরোধের উপরে বিশ্লেষণী আলো ফেলা, তখনকার অগ্রণী ব্যক্তিবর্গের চিন্তাভাবনা ও কর্মকাণ্ডের বিশ্লেষণ।
শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বজনীনতার ভাবনা, এবং যার ফলে বিভিন্ন দেশে ‘মাস এডুকেশন সিস্টেম’ বাস্তবায়িত হতে থাকল উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, ঔপনিবেশিক বাংলায় তা দেখা যায়নি। বিদ্যাসাগরের মতো একক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব তাঁদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শিক্ষাবিস্তারের বিষয়টি ঠেলে নিয়ে যেতে পারেন বটে, কিন্তু শিক্ষার সর্বজনীনতার জন্য প্রয়োজন শিক্ষায় বিনিয়োগ, শিক্ষকের জোগান বাড়ানো। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এসেও অমর্ত্য সেনকে বার বার এই বিষয়টিকে জনপরিসরে আনতে হচ্ছে দেখে মনে হয়, বিদ্যালয় শিক্ষার সর্বজনীনতার লক্ষ্যে এই শ্লথগতির শিকড় হয়তো লুকিয়ে আছে উনিশ শতকের সমাজ সংস্কার উদ্যোগের এক দিকে বিশেষ ঝোঁক, যেখানে শিক্ষাবিস্তারের উদ্যোগেও এই সর্বজনীনতার অনুপস্থিতি। রবীন্দ্রনাথ ‘শিক্ষার বাহন’ প্রবন্ধে একটি মোক্ষম উক্তি করেছিলেন— “শিক্ষা বিস্তারে আমাদের গা নাই। তার মানে শিক্ষার ভোজে আমরা নিজেরা বসিয়া যাইব, পাতের প্রসাদটুকু পর্যন্ত আর কোনও ক্ষুধিত পায় বা না পায় সেদিকে খেয়ালই নাই।” এখানে ‘আমরা’ বলতে রবীন্দ্রনাথ কাদের কথা বলছেন বোঝাই যায়। এই আমরা-ওরা বিভাজনকে বিদ্যাসাগর অনেকটা ভাঙতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারলেন কি?
বিদ্যাসাগর যে বছরে কলকাতায় এলেন সেই বছরেই লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক গভর্নর জেনারেল হলেন। তাঁর শিক্ষাচিন্তার কেন্দ্রে ছিল ইংরেজি শিক্ষা। ১৮৩৫ সালে সেটি যখন ব্যক্ত হল তার আগে থেকেই এক শ্রেণির দেশীয়র মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা নিয়ে জোরালো আগ্রহ দেখা যাচ্ছিল। নীতি প্রণেতারা এবং তাঁদের মুখপাত্ররা পুরোপুরি কলকাতার অভিজ্ঞতানির্ভর ছিলেন। ফলে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা স্বভাবতই অগ্রাধিকার পায়। ধনী ও সমাজের নেতৃস্থানীয় পরিবারগুলির আর্থনীতিক সমৃদ্ধি ব্রিটিশ রাজের উত্থানের সঙ্গেই বাড়তে থাকে।
এটি মোটামুটি জানা যে, প্রথমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পরে ব্রিটিশ রাজ ভারতে এক রকম ইংরেজি শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছিল, যা তখন বিদ্যমান দেশজ ব্যবস্থাকে ক্রমশ পিছনে ঠেলে দিতে থাকল। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি খুব সরলরৈখিক ছিল বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন না। প্রক্রিয়াটি বিশেষ ভাবে ত্বরান্বিত হয়েছিল ১৮৫৪ সালের উডস ডেসপ্যাচের পর থেকে। সেখানেই ‘মাস স্কুলিং সিস্টেম’-এর ভাবনাটা প্রথম এল। তার আগে কোম্পানির আমলে শিক্ষা বিস্তারের প্রশ্নে দু’তিন রকমের মত দেখা যায়। এক দিকে কোম্পানির আধিকারিকরা ভারতীয়দের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারের প্রয়োজন মনে করছেন, এবং শিক্ষা বলতে তাঁরা আধুনিক ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার আদলকেই বুঝছেন। অন্য দিকে একাংশ ভাবছেন, দেশজ শিক্ষা একেবারে পরিত্যাগ করা শাসকদের পক্ষেই ভাল হবে না। উডস ডেসপ্যাচ অনেকটা পরবর্তী কালের জাতীয় শিক্ষানীতির মতো। ঔপনিবেশিক শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্বের কথা বলা হলেও মাধ্যমিক স্কুল এবং কলেজের উপরেই যেন জোরটা বেশি। ফলত প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার হয়েছে ধীর গতিতে। ১৯১১-র জনশুমারিতে দেখা যাচ্ছে সাক্ষরতার হার ১০ শতাংশও ছাড়ায়নি।
প্রাথমিক শিক্ষার কথা বলা হলেও তার জন্যে ব্যয়বরাদ্দ ছিল কম। তা ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষাকে স্থানীয় ‘বোর্ড’-এর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের কাছে সর্বজনীন শিক্ষার গুরুত্ব অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তেমন ছিল না। বনিয়াদি শিক্ষা তখন থেকেই একটি রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্ন হয়ে ওঠে। যে জেলায় জনবিন্যাস একপেশে নয়, অর্থাৎ নিম্নবর্গের মানুষের পাশাপাশি উচ্চবর্ণের মানুষও কম নয়, সেখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যাও কম। রক্ষণশীল এলিট সম্প্রদায় মাধ্যমিক ও কলেজ শিক্ষায় যতটা আগ্রহী ছিল, অধিক সংখ্যক প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনে সে আগ্রহ ছিল না। জেলা স্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, ১৯১১-র সাক্ষরতার হারের সঙ্গে ১৯০১-এর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যার সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু উচ্চ বিদ্যালয়ের সংখ্যার কোনও সম্পর্ক নেই।
উপনিবেশে শিক্ষাকে সর্বজনীন করতে হবে ভেবে ইংরেজ শাসকরা মাথা ঘামাবে, এ আশা অবান্তর। সমাজের এলিটরাও কি ঘামিয়েছিলেন? না। বিদ্যাসাগর যথাসাধ্য ভেবেছিলেন। কিন্তু জাতপাত, শ্রেণি-বিভাজনের বাস্তবে শিক্ষার সর্বজনীনতা ঘটতে পারে না, তা উনিশ শতকেও সত্যি, একুশেও।