জোট সরকারের বাধ্যবাধকতার জন্য কেন্দ্রীয় ভাবে আইন না এনে বরং ডাবল ইঞ্জিনের রাজ্য সরকারগুলি নিজ নিজ রাজ্যে আরএসএস-এর গুরুত্বপূর্ণ অ্যাজেন্ডা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়ন করুক, এটাই এখন ভারতীয় জনতা পার্টির লক্ষ্য। উত্তরাখণ্ড, গুজরাত এবং অসম সরকার ইতিমধ্যে তা করেছে। মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তীসগঢ় করার পথে। এর পর পশ্চিমবঙ্গ।
বিজেপির মত, সংবিধান ও আদালতের রায়কে মান্যতা দিতেই এই বিধি প্রণীত হচ্ছে। সংশয়াতীত ভাবে, সংবিধানের নির্দেশাত্মক নীতির ৪৪ নম্বর ধারায় গোটা দেশের সমস্ত নাগরিকের জন্য অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের জন্য রাষ্ট্রকে প্রয়াস করতে বলা হয়েছে। তবে এও ঠিক, একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই সংবিধানের প্রণেতারা এই ধারাকে নির্দেশাত্মক নীতির মধ্যে রেখেছিলেন। একে বাধ্যতামূলক করেননি, সময়সীমা দেননি। এটাও ঠিক, মাঝে মাঝে সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টিতে কেন্দ্রীয় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিভিন্ন সময়ে কথাপ্রসঙ্গে কিছু পরামর্শ দিয়েছে, কোনও নির্দেশ দেয়নি। যেমন ১৯৮৫ সালে শাহ বানো মামলায়, ১৯৯৫ সালে সরলা মুদ্গল বনাম ভারত রাষ্ট্র মামলায়, ২০০৩ সালে খ্রিস্টানদের সম্মতিদান সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্ট কিছু মন্তব্য করলেও নির্দিষ্ট নির্দেশ দেয়নি।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বলতে বোঝায় বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, সম্পত্তির অধিকার, অভিভাবকত্ব, ভরণপোষণ, দত্তক গ্রহণ প্রভৃতি বিষয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতি-গোষ্ঠীর নিজস্ব ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা প্রথাগত যে বিধি আছে তা বাতিল করে সকলের জন্য অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা। অথচ এই বিষয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সামাজিক, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ও প্রথাগত ঐতিহ্যকে বাতিল করে হিন্দু আইনের কাঠামোতেই কিছু রদবদল করা হচ্ছে। ২১তম আইন কমিশন ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পরামর্শপত্র দিয়ে বলেছে, আমাদের দেশে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনই তা কাম্যও নয়। সেই সঙ্গে ওই কমিশন ‘রিফর্ম অব ফ্যামিলি ল’ নামে আলোচনাপত্র জমা দিয়ে পারিবারিক ও প্রথাগত ব্যক্তি আইনগুলির সংস্কারের কথা বলেছে। ২০২৪ সালে ২২তম আইন কমিশনের কার্যকাল শেষ হয়েছে এবং তারা কোনও সুপারিশ করেনি।
বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যই ভারতের সংবিধানের মূল মর্মবাণী। সংবিধানের ২৫-২৮ ধারা ধর্মের স্বাধীনতা রক্ষার ও নিজ ধর্মের বৈশিষ্ট্যগুলি বজায় রাখার অধিকার দিয়েছে। ২৯(১) ধারায় সাংস্কৃতিক বহুত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে। সুতরাং, বিজেপি যখন বলে, এক দেশ এক বিধান হওয়াই সংবিধানের নির্দেশ, সেই দাবিটি ঠিক নয়। বরং ভারতীয় সংবিধান দেওয়ানি বিষয়ে ভিন্নতাতেই মান্যতা দিয়েছে।
দু’টি বিষয় এখানে মনে রাখা দরকার। এক, আমাদের দেশে ফৌজদারি আইন অভিন্ন এবং বেশ কিছু দেওয়ানি অভিন্ন যেমন ভারতীয় সাক্ষ্য আইন, নিবন্ধীকরণ আইন, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, শিশু বিবাহ প্রতিরোধ আইন ইত্যাদি সকলের জন্য সমান ভাবেই প্রযোজ্য। দুই, দেওয়ানি বিষয়ে কেবল মুসলমানরা ভিন্নতা ভোগ করেন এমন নয়। হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ প্রভৃতি ধর্মাবলম্বীর নিজস্ব ব্যক্তিগত আইনও আছে। তাঁরাও ভিন্নতা ভোগ করেন। দেশের ছয় শতাধিক বিভিন্ন জনজাতি গোষ্ঠী নিজেদের প্রথাগত আইন দ্বারা পরিচালিত হন। আবার স্বাধীনতার পরে ১৯৫৬ সালে যে হিন্দু কোড তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেও ভিন্নতাকে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের ২৪৪ নম্বর ধারায় (যা জনজাতিভুক্ত এলাকার জন্য প্রযোজ্য) এই মান্যতা দেওয়া হয়েছে। এখন ভোট-রাজনীতি মাথায় রেখে অভিন্ন বিধির বিরুদ্ধে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ প্রশমিত করতে বিজেপি সরকারগুলি সেই রাজ্যের জনজাতিভুক্তদের অভিন্ন বিধির আওতার বাইরে রেখেছে। তা হলে এখনও কিন্তু এক দেশ এক বিধান হচ্ছে না। নীতি প্রণয়নের লক্ষ্য এখন কেবল ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী!
যুক্তি শোনা যায়, গোয়ায় দীর্ঘ দিন অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু আছে। তা হলে সারা দেশে হবে না কেন? দেওয়ানি বিষয়ে পর্তুগিজ় আমল থেকেই গোয়ায় কিছু সাধারণ পারিবারিক আইন আছে, যা সব অংশের মানুষকেই মেনে চলতে হয়। কিন্তু গোয়ার পারিবারিক আইনকে বিভিন্ন অংশের পারিবারিক আইনের কিছু কিছু অংশ নিয়ে একটি প্যাকেজ বলা যেতে পারে, যার মধ্যে বহু ক্ষেত্রে সমতা নেই। যেমন বিবাহ সংক্রান্ত বিষয়ে ক্যাথলিকদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা আছে। আবার অল্প কিছু ক্ষেত্রে হিন্দু স্বামীদের দ্বিতীয় বিবাহের শর্তাধীন অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, দেশের বর্তমান যে-সব ব্যক্তিগত আইন আছে তাতে নারীদের প্রতি বঞ্চনা করা হয়েছে। অভিন্ন আইন সে দিক দিয়ে যুক্তিযুক্ত হলেও প্রশ্ন ওঠে, অভিন্ন আইন হলেই কি সমতা আসে? বিশেষ বিবাহ আইন (১৯৫৪), পণপ্রথা নিবারণ আইন (১৯৬১), গার্হস্থ হিংসা নিবারণ আইন (২০০৫), কিংবা কন্যাভ্রূণ হত্যা নিবারণ আইন, ‘অনার কিলিং’ নিবারণ আইন, কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা বন্ধ আইন ইত্যাদি অনেক অভিন্ন আইন আছে। তাতে কি সমতা এসেছে? এগুলির কঠোর রূপায়ণে রাষ্ট্রের ভূমিকা কী? কেন বিজেপি রচিত অভিন্ন বিধিতে ‘লিভ-ইন’ রিলেশনকে বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন অথবা জেল জরিমানা করা হবে? তৃতীয় লিঙ্গের প্রতি এই বিধি কি সমতা দান করেছে? তাই বিষয়টিকে কেবল সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না, আইনের মধ্যেও সমতার প্রশ্নটিকে আলাদা করে দেখতে হবে।
মুসলমান শরিয়তি আইনে এমন কিছু বিধান আছে যা নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক— সেগুলির সংস্কার দরকার। তবে তার মানে এটা নয় যে, হিন্দু পারিবারিক আইনগুলিতে নারীদের পূর্ণ সমতা দেওয়া হয়েছে। হিন্দু আইনেও ভ্রাতাদের সঙ্গে পূর্বপুরুষদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার পেতে, পছন্দের জীবনসঙ্গী নির্বাচন করতে এবং স্বামীর সম্পত্তিতে মালিকানা পেতে, বিচ্ছেদের অধিকার পেতে হিন্দু নারীরা অনেক সময় বঞ্চিত হন। বিচ্ছেদ বা ভরণপোষণের জন্য তাঁদের আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়। এখানে বিজেপির মনুবাদী অবস্থান নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগায়, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিজেপি ভাবাদর্শ ও সরকারি নীতি যথেষ্ট কার্যকর কি না?
মুসলিম ব্যক্তিগত আইন যাকে শরিয়তি আইন বলি, তা আমাদের দেশে চালু হয় ১৯৩৭ সালে। মনে রাখতে হবে শরিয়তি বিধানগুলির বেশির ভাগ নবম-দশম শতাব্দীর আরব সমাজের পটভূমিতে রচিত। যেমন মুসলিম পুরুষদের শর্তসাপেক্ষে চারটি বিয়ের অধিকার। ১৫০০ বছর আগে আরব সমাজে সে সময়ের ব্যভিচারের আমলে, বিশেষ করে উহুদের যুদ্ধের পরে, আশ্রিতাদের সঙ্গে সম্পর্কে এই বিধান হয়তো বাস্তবোচিত ছিল। কিন্তু সমীক্ষা বলছে, এ দেশে প্রায় ৯৬% মুসলিম পুরুষ একাধিক বিবাহ করেন না। আসলে একাধিক বিবাহ মূল প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হল, এই বিধানের কেন পরিমার্জন হবে না? কোন মুসলিম পিতা-মাতা চাইবেন, তাঁদের মেয়ের একাধিক সতিন হওয়ার বিধান চালু থাকুক? ১৯৮৫ সালে শাহ বানো মামলার রায়ের পর যে আইন তৈরি হল তাতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ নম্বর ধারা (বিএনএসএস ১৪৪ ধারা) থেকে মুসলিম নারীদের বঞ্চিত করা হল। তা কেন হবে? তালাকপ্রাপ্ত নারী যাবেন কোথায়? কেন দেনমোহর বাদে মুসলিম নারীরা স্বামীর সম্পত্তির দুই আনা (১২.৫%) পাবেন? কেন ঠাকুরদা বেঁচে থাকতে তাঁর কোনও সন্তান মারা গেলে মৃত সন্তানের স্ত্রী ও পুত্র-কন্যারা ঠাকুরদার সম্পত্তির অংশীদার হবেন না? এই সব অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক বিধানের পরিমার্জন চাই। বুঝতে হবে যে এই সব সংস্কার চাওয়া মানে কিন্তু ধর্মের বিরোধিতা নয়।
মনে রাখতে হবে, মুসলমানদের মধ্যেও শরিয়তি বিধানের ভিন্নতা আছে। শিয়া-সুন্নিদের মধ্যে যেমন কিছু পার্থক্য আছে, তেমনই সুন্নিদের হানাফি ও সাফেদের মধ্যে পার্থক্য আছে। তাই এগুলি অলঙ্ঘনীয় নয়। চাই যুগোপযোগী সংস্কার। বহু মুসলিমপ্রধান দেশে শরিয়তি বিধানের পরিমার্জন হয়েছে। তুরস্ক, টিউনিজ়িয়া, ইন্দোনেশিয়া, আলজিরিয়া, মিশর, মরক্কো, এমনকি ১৯৬১ সালে পাকিস্তানে কিছু কিছু শরিয়তি বিধানের সংস্কার হয়েছে। এতে ওই দেশগুলির মুসলমানত্ব নষ্ট হয়ে যায়নি। তা হলে এখানে হবে না কেন?
আসলে এ দেশে এখন মুসলিম মননে নিরাপত্তার অভাববোধ কাজ করছে। তাঁরা মনে করছেন, বিজেপি সরকার তাঁদের ইসলামি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে চাইছে। দেশের বৈচিত্রকে ভেঙে ফেলতে চাইছে। ফলে বিজেপি সরকারগুলি যে ভাবে অভিন্ন বিধি আনতে চাইছে তাতে তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক ও বিচ্ছিন্নতাবোধ বাড়ছে। তাই এই প্রশ্নে তাড়াহুড়ো না করে, সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে, মহিলা সংগঠনগুলির সঙ্গে, বিশিষ্টজনদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য ঐকমত্যে আসতে হবে। এ ছাড়া উপায় নেই।