E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সংখ্যা নয়, আধিপত্যের প্রশ্ন

সত্যি বলতে, যে ৬০ জন তৃণমূলের ডুবন্ত জাহাজ থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজেপির তাঁদের আশ্রয় দেওয়ার কোনও প্রয়োজন ছিল না।

জহর সরকার

শেষ আপডেট: ০৫ অগস্ট ২০২৬ ০৬:৩৪

তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবি স্পষ্ট হতেই, দলের বিধায়ক ও সাংসদরা যে অভাবনীয় দ্রুততায় তাঁদের আজীবন শত্রু, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র প্রতি সমর্থন জানালেন, তাতে অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। একে যদি আমরা শুধুমাত্র বিশ্বাসঘাতকতা বা লোভ বলে উড়িয়ে দিই, তা হলে মূল বিষয়টি অধরাই থেকে যাবে। আমরা বুঝতেই পারব না, পর্দার আড়ালে এক অত্যন্ত কৌশলী রাজনৈতিক খেলা চলছিল এবং এখনও চলছে।

ভারতের ধনকুবেররা গত বারো বছরে দক্ষিণপন্থী অর্থনৈতিক নীতির ফলে বিপুল লাভ করেছেন এবং তাঁরা নিজেদের প্রাধান্য ও মুনাফা ধরে রাখতে যে কোনও পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত। আর বিভাজনের রাজনীতির ফলে ভারতের প্রকৃত সমস্যাগুলি থেকে মানুষের দৃষ্টি সরে যায়। সঙ্গে ঘৃণার পরিবেশ ভোট দখলে সহায়ক হয়। এই অতি উত্তম রাজনৈতিক যন্ত্রটি ইতিমধ্যে নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা অন্যদের নাগালের বাইরে তুলে দিয়ে নির্বাচনে জেতার বিজ্ঞানকে অসাধারণ ভাবে আয়ত্ত করেছে। আবার, নির্বাচন-পরবর্তী অস্পষ্ট পরিস্থিতিতে দলবদলের রাজনীতিকেও নিপুণ শিল্পে পরিণত করেছে। একের পর এক রাজ্য তার সাক্ষী।

সত্যি বলতে, যে ৬০ জন তৃণমূলের ডুবন্ত জাহাজ থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজেপির তাঁদের আশ্রয় দেওয়ার কোনও প্রয়োজন ছিল না। বরং, সাঁতারুরাই নতুন বিজেপি সরকারকে সমর্থন জানাতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন, যাতে নিজেদের ও তাঁদের অনুগামীদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপের হাত থেকে এবং জনরোষের ডিমের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এক ধরনের ‘বিমা নীতি’ সংগ্রহ করা যায়। অবশ্য, প্রতিটি বিমা নীতিরই নিজস্ব প্রিমিয়াম থাকে। তবে সেই প্রসঙ্গে বা বাংলার অসহায় মানুষ কী ভাবে প্রবল ক্ষোভে যাঁদের প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তাঁদেরই আবার পুরস্কৃত হতে দেখে কী অনুভব করেছিলেন— সে আলোচনায় এখানে যাচ্ছি না।

আসলে, তৃণমূলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিধানসভা, লোকসভা এবং রাজ্যসভায় জায়গা করে দেওয়ার জন্য তিনটি ভিন্ন কৌশল নেওয়া হয়েছিল। রাজ্যসভার তিন তৃণমূল সাংসদের বিজেপিতে যোগ দিয়ে বিজেপির সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হওয়া ছিল অকল্পনীয়। কারণ, তাঁরা সারা জীবন তৃণমূল এবং কংগ্রেসের সদস্য হিসেবে বিজেপির বিরোধিতা করেই রাজনীতি করেছেন। কিন্তু এখানে লক্ষণীয় বিষয়, এর ফলে বিজেপি রাজ্যসভায় ১১৭-র ঘরে পৌঁছেছে (১২২ হল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা) এবং এনডিএ-র মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫২— অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে মাত্র ১০টি আসন দূরে। এই পরিস্থিতি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ, এবং কেন তা, পরে বোঝা যাবে।

কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল লোকসভা। ২০২৪ সালের ফল তিনি কোনও দিন ভুলবেন না। ৫৪৩টির মধ্যে মাত্র ২৪০টি আসন পেয়েছিলেন তিনি, অথচ প্রচার করেছিলেন ৪০০-রও বেশি আসন জয়ের লক্ষ্যে। ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ)-এর শরিকরা মিলে মাত্র ২৫টি আসন যোগ করতে পেরেছিল, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২৭২-এর থেকে ৭টি কম। এই প্রেক্ষাপটে, প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদদের ২০টি আসন, যাঁরা আইনি পদক্ষেপ থেকে তথাকথিত ‘ওয়াশিং মেশিন’ সুরক্ষা পাওয়ার আশায় মরিয়া বলে মনে হয়, মোদীর কাছে এক বিরাট আশীর্বাদ। এতে তিনি নিশ্চিত হতে পারেন যে, এই গোষ্ঠী নিজেদের সুরক্ষা, ক্ষমতা এবং অন্যান্য সম্ভাব্য পুরস্কারের আশায় তাঁর সঙ্গ ছাড়বে না। তাতে লোকসভায় মোদীর তেলুগু দেশম পার্টি এবং জনতা দল (ইউনাইটেড)-এর ২৮ জন সাংসদের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমিয়ে দেয়। রাজনীতির খতিয়ান বরাবরই ব্যয়বহুল, তাই বিকল্প সব সময়ই স্বাগত।

এই রাজনৈতিক কেল্লা ফতের কৃতিত্ব শুভেন্দু অধিকারীকে দিল্লির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর প্রাক্তন তৃণমূল সহকর্মীদের বিজেপির সংলগ্নে নিয়ে এসে মোদীর শক্তি বাড়িয়েছেন। একই সঙ্গে, তিনি পশ্চিমবঙ্গের ‘মূল বিজেপি’ নেতৃত্ব ও কর্মীদেরও অনেকটাই স্তব্ধ করে দিয়েছেন। তাঁরা দলবদলকারীদের নিয়ে বরাবরই সতর্ক, কারণ এরা অতীতের বোঝা বয়ে আনে এবং দলের ‘বিশুদ্ধ’ ঐতিহ্যকে ক্ষুণ্ণ করে। বাস্তবে, বিজেপির অনেকেরই এক ‘বহিরাগত’ ও প্রাক্তন প্রবল প্রতিপক্ষকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনেপ্রাণে মেনে নিতে কষ্ট হয়। কিন্তু এখন তিনি তিনটি আইনসভাতেই নিজের প্রাক্তন দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভরিয়ে তুলছেন। তাই ‘মূল বিজেপি’ কর্মীদের আগের তীব্র বিরোধিতার কথা ভুলে গিয়ে নবাগতদের সঙ্গে সহাবস্থান ছাড়া উপায় নেই। সংঘাতও অনিবার্য, যা দেখা গেল টাকি পুরসভার শাসক-ঘনিষ্ঠ দুই গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বে।

বয়স আজ নরেন্দ্র মোদীর প্রধান শত্রু। তা ছাড়া সঙ্ঘ পরিবারে তাঁকে নিয়ে একাধিক প্রশ্ন রয়েছে। আর এখন জন-অসন্তোষও তাঁর উদ্বেগের কারণ। এই সব কিছুর সঙ্গে আগামী নির্বাচনের অনিশ্চয়তা মোদীকে যেন তেন প্রকারেণ লোকসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন নিশ্চিত করার তাগিদ দিচ্ছে। সংবিধান সংশোধন করে ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্রে রূপান্তরের এটাই তাঁর শেষ সুযোগ হতে পারে। কিন্তু একটি সাংবিধানিক সংশোধন তো ভবিষ্যতে আর একটি সংশোধনের মাধ্যমে বাতিল করা সম্ভব। তাই আরও স্থায়ী উপায় হল লোকসভার আসনসংখ্যার পুনর্বিন্যাস এবং তা এমন ভাবে করা, যাতে তা স্থায়ীভাবে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুত্বের পক্ষে ঝুঁকে থাকে। ২০২৭ সালের জনগণনার ফলাফলের চেয়ে এর জন্য ভাল সুযোগ আর আসবে না। সেই জনগণনা হয়তো দেখাবে, ২০১১ সালে হিন্দিভাষীদের জনসংখ্যা যেখানে ছিল ৪৩ শতাংশ, তা এখন প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। দক্ষিণের রাজ্যগুলি ক্ষুব্ধ, কারণ পরবর্তী লোকসভা কেন্দ্র পুনর্বিন্যাসে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়ার জন্য তাদের শাস্তি দেওয়া হবে, আর অর্থনৈতিক ভাবে অনুন্নত ও অতিরক্ষণশীল হিন্দিভাষীদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য পুরস্কৃত করা হবে।

গত অর্ধশতকে, ভারতের একটি বড় অংশকে বাধ্যতামূলক ভাবে বা অর্থনৈতিক প্রয়োজনে তিনটি ভাষা নিয়ে চলতে হয়েছে। অথচ হিন্দিভাষী জনসংখ্যা মাত্র একটি ভাষা— হিন্দির মাধ্যমেই— সহজে এগিয়ে যেতে পেরেছে এবং বাস্তবে তা-ই করেছে। এমনকি শেক্সপিয়রও নাকি হিন্দিতে পড়ানো হয়। ইংরেজি-জানা এলিটদের বাদ দিলে, এই বিশাল অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ মাতৃভাষার বাইরে অন্তত একটি বা দু’টি ভাষা ও সংস্কৃতি শেখার মাধ্যমে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত করার সুযোগ হারিয়েছেন। সর্বভারতীয় যোগাযোগে হিন্দির লাগাতার আধিপত্য, সরকারি স্তরে প্রত্যক্ষ চাপ এবং এক ধরনের স্বাভাবিক অধিকারের মানসিকতা এমন পরিবেশ তৈরি করেছে যে, ভারতের প্রায় সর্বত্রই হিন্দি জানলেই কাজ চলে যায়।

সরকারি ও আধা-সরকারি চাকরির পরীক্ষাগুলি প্রায় সব ক্ষেত্রেই হিন্দিতে পাওয়া যায়। কিন্তু অন্যান্য ভারতীয় ভাষার ক্ষেত্রে, সরকারি নীতি যা-ই থাকুক না কেন, সেই সুযোগ খুবই সীমিত। ফলে সরকারি পরিষেবায় হিন্দিভাষীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তবে এ বিষয়ে কোনও সরকারি তথ্য নেই, কারণ তথ্যের অধিকার আইনের কার্যকারিতা এখন সীমিত। বিষয়টি স্পষ্ট করতে পারে একমাত্র সরকার। কিন্তু সরকারের আগ্রহ তো উত্তর ভারতের হিন্দিভাষী অঞ্চলের জনসংখ্যা বিস্ফোরণের রাজনৈতিক সুবিধা তোলায়— যাতে আসন্ন লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাসে তার প্রতিফলন ঘটে। মোদী ও আরএসএস এ বিষয়ে সম্পূর্ণ স্পষ্ট যে, তাঁদের হিন্দুত্বের শিকড় উত্তর ভারতে। এই নীতি শুধু হিন্দিকেন্দ্রিকই নয়, সঙ্গে অন্যান্য ধর্ম ও ভাষার প্রতিও অসহিষ্ণু। জাভেদ গয়া-র হার্টল্যান্ড রাইজ়িং‌: দ্য মেকিং অব মেজরিটারিয়ান ইন্ডিয়া-য় এই নিয়ে অনেক তথ্য রয়েছে।

তবে এই পরিস্থিতি একা মোদী সৃষ্টি করেননি। গত সাত দশকে মন্ত্রী ও আমলারা— যাঁদের বড় অংশই হিন্দি ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে এসেছেন— তাঁরা জনগণনার আগে ‘হিন্দি’ শব্দের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে এক-এক করে আরও ৫৬টি ভাষাকে যুক্ত করেছেন। ভোজপুরি ও রাজস্থানি ভাষাভাষীরা এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন এবং দাবি তুলেছেন যে, তাঁদের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করে হিন্দি থেকে পৃথক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। একই দাবি করেছে মগহি, ছত্তীসগঢ়ি, গড়ওয়ালি, কুমায়ুনি, বুন্দেলখণ্ডি, অঙ্গিকা, নাগপুরি (সাদরি), কুর্মালি, বাঘেলি এবং আওধির মতো আরও বহু ভাষা। আজও সেই দাবিগুলি উপেক্ষিত।

এই পরিস্থিতিই বোঝায়, মোদী কেন আম আদমি পার্টির সাত জন রাজ্যসভা সাংসদকে বিজেপিতে গ্রহণ করলেন, শিবসেনার ছয় সাংসদকে সঙ্গে নিলেন এবং তৃণমূলকেও কার্যত গ্রাস করলেন। জনসংখ্যার আনুপাতিক ভিত্তিতে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস হলে, ভবিষ্যতে একটিমাত্র ভাষা ও সংস্কৃতি অন্য সব ভাষা ও সংস্কৃতির উপর স্থায়ী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

ভারতের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বৈচিত্র বজায় রাখতে গেলে দক্ষিণের পাঁচটি রাজ্য, কাশ্মীর ও পঞ্জাবের সঙ্গে বিজেপি পরিচালিত পূর্বের তিনটি রাজ্যকে সঙ্গে থাকতেই হবে। না হলে এই ভারত আর ‘ভারত’ থাকবে না।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
BJP Government North India

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy