E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

প্রশ্নের মধ্যেই ভুল

বলা জরুরি যে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের একটি শিক্ষাকেন্দ্র, যেখানে কলা ও বিজ্ঞানের নানান বিষয়ের সঙ্গে প্রযুক্তির ছাত্ররা একই চত্বরে পড়াশোনা করে। ফলে যে কোনও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এর প্রথম তফাত হল ছাত্রসংখ্যায়, বৈচিত্রে ও মেলামেশায়।

রূপালী গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:৩৩

দশচক্রে ভগবান ভূত হন, আর হাজার বার উচ্চারণে মিথ্যে হয়ে ওঠে সত্যি। আপাতত দশচক্রের প্রভাবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠেছে যাবতীয় দুর্নীতির আখড়া। ফলে রাজ্য সরকার অতিসক্রিয় হয়ে দুর্নীতি দূরীকরণে ব্যস্ত। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে দেশদ্রোহিতা, হিন্দুধর্মের অবমাননা, উচ্ছৃঙ্খলতা, ঔদ্ধত্য, নেট ছাড়া পিএইচ ডি করানো এবং ‘ইনব্রিডিং’ (এখানে স্বজনপোষণ)। শুদ্ধীকরণ কর্মপদ্ধতির মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে উত্তেজনা সৃষ্টি, গেরুয়া বসনধারীদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে মিছিল করা, বেদপাঠ ও হনুমান চালিশা পাঠের পরিকল্পনা এবং শিক্ষকদের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি করার বিল পাশ করানো। বিশ্ববিদ্যালয় একটি সার্বিক বিনিময়ের কেন্দ্র; তাই তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যি-মিথ্যে নিয়ে নীরব থাকাটা ক্ষতিকর।

বলা জরুরি যে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের একটি শিক্ষাকেন্দ্র, যেখানে কলা ও বিজ্ঞানের নানান বিষয়ের সঙ্গে প্রযুক্তির ছাত্ররা একই চত্বরে পড়াশোনা করে। ফলে যে কোনও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এর প্রথম তফাত হল ছাত্রসংখ্যায়, বৈচিত্রে ও মেলামেশায়। এখনও এখানে ভর্তির ক্ষেত্রে (প্রযুক্তিতে রাজ্য জয়েন্ট এন্ট্রান্স) বাংলার ছেলেমেয়েরা অগ্রাধিকার পায়। রাজ্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বলে এখানকার ছাত্ররা অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক কম খরচে পড়াশোনা করতে পারে। যাদবপুর চত্বরে গৃহবাসী ও হস্টেলবাসী, ধনী ও দরিদ্র, ইংরেজি ও বাংলা মাধ্যম এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের ছাত্ররা পাশাপাশি পড়াশোনা করে। তবে আসনসংখ্যা সীমিত বলে উচ্চ মাধ্যমিকে খুব উঁচু দিকে নম্বর না থাকলে এখানে পড়াশোনার সুযোগ পাওয়া যায় না। কলকাতার আরও দু’টি প্রাচীন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা ও প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়েও খুবই ভাল ছাত্ররা পড়ে— তবে একই সঙ্গে এত রকম ছাত্র প্রায় কোথাও দেখা যায় না। যে কারণে বিভিন্ন নৈতিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ছাত্র যাদবপুর চত্বরে ঘোরে ফেরে, নিজেদের পছন্দমতো দেওয়ালে লেখে, পোস্টার ঝোলায়, গান গায়, নাটক করে। কোনও একটি মতবাদের প্রাধান্য থাকলেও একটিই মতাদর্শ দিয়ে যাদবপুরকে পরিচিত করা যায় না। এখানে দেশদ্রোহিতার চর্চা হয় যাঁরা বলেন তাঁরা রাষ্ট্রের অর্থাৎ সরকারের কোনও নীতির সমালোচনা করাকেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলে মনে করেন।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল পরিচয় তার পড়াশোনায়। দিনের শেষে যাদবপুরে পড়াশোনা ও ফলাফলটা ভালই হয়। প্রযুক্তির ছেলেমেয়েরা ভাল চাকরি পায়, কলা ও বিজ্ঞানের ছেলেমেয়েরা নিজেদের ক্ষেত্রে বেশ নাম করে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে ভালই ফলাফল দেখায়। পড়াশোনা বলতে শুধু ডিগ্রির কথা বলা হচ্ছে না; ডিগ্রি দেওয়ার পাশাপাশি গবেষণা করা ও ভবিষ্যৎ গবেষণাক্ষেত্র তৈরি করে তোলাও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাজ। তাই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের গবেষণাতেও যে যাদবপুরের শিক্ষক ও গবেষকরা যথেষ্ট সুনামের স্বাক্ষর রাখছেন, যা শেষ পর্যন্ত দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের আর সারা বিশ্বে ভারতের মুখ উজ্জ্বল করছে— এই কথাটি এই প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার।

আর এখানেই উঠে এসেছে দুটো অভিযোগ। প্রথমত, যাদবপুরে ‘নেট’ উত্তীর্ণ নয় এমন ছাত্রদের পিএইচ ডি করার সুযোগ দেওয়া হয়, আর দ্বিতীয়ত যাদবপুর স্বজনপোষণের আখড়া। এটা নাকি ভয়ানক এক অনাচার, যেটা রুখতে ওঁরা এমন একটি আইন আনতে চলেছেন, যার জোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অন্যত্র বদলি করা যাবে।

প্রথমত, কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি টেস্ট (নেট) একটি সর্বভারতীয় পরীক্ষা, যার মাধ্যমে স্নাতকোত্তর-উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারে গবেষণার সুযোগ পায়। কিন্তু এর বাইরেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান (বেঙ্গালুরুর আইআইএসসি, মুম্বই-এর টিআইএফআর, কলকাতার সাহা ইনস্টিটিউট ইত্যাদি) নিজেরা পরীক্ষা নিয়ে নির্দিষ্ট গবেষণাবৃত্তি দিয়ে পিএইচ ডি-র ছাত্রছাত্রী নিয়োগ করত। তা ছাড়া বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পের অধীনেও নেট উত্তীর্ণ নয় এমন ছাত্রছাত্রীকে গবেষণার জন্য নিয়োগের সুযোগ ছিল। তাই নেট ছাড়া পিএইচ ডি করার সুযোগ শুধু যাদবপুর নয়, সর্বত্রই ছিল; সেটা নীতিবিরুদ্ধও নয়, গবেষণার মানের অবনতির সূচকও নয়। অতি সম্প্রতি অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকার ‘এক দেশ এক পরীক্ষা’ ছাঁচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নেট ছাড়া পিএইচ ডি-তে ভর্তি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেটা কার্যকর হলে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই নেট ছাড়া পিএইচ ডি করার সুযোগ বন্ধ হবে। সেটা ভাল হবে কি না বলা মুশকিল, কারণ একটিই মান নির্ণায়ক পরীক্ষার উপরে ভরসা করার কুফল আমরা ‘নিট’-এর ক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বৃত্তিগুলো বন্ধ করে সমসংখ্যক কেন্দ্রীয় বৃত্তি চালু করলে অন্তত গবেষকের সংখ্যা কমবে না। তা না হলে দেশের গবেষণার চিত্র খারাপ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

দ্বিতীয়ত, যাদবপুরের শিক্ষকদের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি করে সেখানকার উন্নতি করার প্রসঙ্গটি অর্থহীন। স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও প্রযুক্তি বিভাগ মিলিয়ে যাদবপুরে ছাত্রসংখ্যা (এবং সাপ্তাহিক ক্লাসের সংখ্যাও) অন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে অনেক বেশি; তুলনার ক্ষেত্রে সেটাও বিচার্য। এই শিক্ষকেরা পড়ানোর পাশাপাশি গবেষণাও করেন; এই জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের নিজেদের গবেষণার চাহিদা ও পরিকাঠামো অনুযায়ীই শিক্ষক নিয়োগ করে৷ ধরা যাক, যে বিশ্ববিদ্যালয় লেজ়ার নিয়ে গবেষণা শুরু করতে চাইছে, তারা সেই সংক্রান্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষককেই নিয়োগ করে। এক জন শিক্ষক-গবেষক তাঁর নিজস্ব গবেষণা পরিকল্পনা অনুযায়ী ‘প্রোজেক্ট’ লিখে অনুদান জোগাড় করে তাঁর গবেষণাগার ও পরিকাঠামো তৈরি করেন। যে জন্য অনেক সময় এক জন শিক্ষক অবসর নেওয়ার পর একই ধরনের গবেষণায় পারদর্শী অন্য কাউকে না পাওয়া গেলে তাঁর যন্ত্রপাতি-গবেষণাগার অকেজো হয়ে যায়। নেট-উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীরা এই শিক্ষকদের অধীনেই গবেষণা করে। তারাও শিক্ষকের কাজকর্ম, বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি, গবেষণার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এই রকম বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করেই তাঁর কাছে গবেষণায় যোগ দেয়৷ তাই সরকার চাইলেও, কন্যাশ্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা তখনই পিএইচ ডি করতে যাবে, যখন সেই বিশ্ববিদ্যালয় সব দিক থেকে যাদবপুর বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো হয়ে উঠবে। তার জন্য সেখানে যথেষ্ট শিক্ষক নিয়োগ ও পরিকাঠামোর উন্নয়ন দরকার। শিক্ষকদের বদলি করে সেটা হবে না, বরং তাঁর নিজের এবং তাঁর পিএইচ ডি স্কলারদের গবেষণাটা নষ্ট হবে।

অর্থাৎ এক জন গবেষকের গবেষণার সব কিছু ‘স্থানান্তরযোগ্য’ নয়। এখানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের চাকরি পুলিশ বা অন্য আধিকারিকের চাকরির চেয়ে আলাদা। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অন্যত্র বদলি করে তাঁদের ‘জব্দ’ করতে চাইলে আসলে সেটা সরাসরি ‘দেশের ক্ষতি’। তাই সম্ভবত ভারতের কোথাও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ‘বদলি’র নিয়ম নেই৷ উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা থাকলেই বোঝা যায়, বিষয়টা কতটা উদ্ভট ও ক্ষতিকারক।

মন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, এখান থেকে পাশ করে অনেকেই এখানেই চাকরি করছেন আজীবন। কথাটা হয়তো মিথ্যে নয়, কিন্তু দেখা যাবে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যাদবপুর থেকে পাশ করা ছাত্রছাত্রীরা দেশের ও বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পিএইচ ডি ও পরবর্তী গবেষণা করে তবেই এখানে চাকরি পেয়েছেন। যাদবপুরে কাটানো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় অন্যত্র পড়াশোনার, এমনকি চাকরি করার পরও কি আর তাঁদের শুধু যাদবপুরের প্রাক্তনী বলা যায়? তাঁরা যদি সব দিক থেকে খারাপ না হয়ে থাকেন, তা হলে শুধু যাদবপুরের প্রাক্তনী বলেই তাঁদের অভিযুক্ত করা কতটা সঙ্গত? তাই যাদবপুরকে একটি ‘ঘুঘুর বাসা’ বলে দেখাতে চাওয়া সঙ্গত নয়।

কয়েক দিন আগে এক আলোচনায় এক বিধায়ক এক জন শিক্ষক-বিজ্ঞানীর কাছে জানতে চেয়েছেন, তিনি কী নিয়ে কাজ করেন ও ল্যাবে ওঁর অবদান কী। এই প্রশ্ন অন্যায্য তো নয়ই, বরং এর উত্তরে এক জন বিজ্ঞানী তাঁর কাজের গুরুত্ব কোথায় আর সত্যিই তাঁদের বদলি করে দিলে কী কী অসুবিধে হতে পারে সেটা বুঝিয়ে বলার সুযোগ পেলেন। বিজ্ঞানী যে গজদন্তমিনারে বসে অহেতুক আঁক কাটেন না, সে-কথা বুঝিয়ে বলার মধ্যে কোনও ছোট হয়ে যাওয়া নেই। রাজনীতিবিদরাও বরং প্রশ্ন করতে শিখুন।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Jadavpur University West Bengal government West Bengal Politics

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy