E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

নিরাপদ থাকার অধিকার

এমনিতে পুরুষমানুষের যাতায়াত অবাধ দিনে-রাতে। কিন্তু রাতে পুরুষমানুষ মেয়ে সঙ্গী নিয়ে বেরোলে অন্য পুরুষের চোখ টাটায়। নারীহীন পুরুষগণ তখন ‘হ্যাভ নটস’। ‘হ্যাভস’-দের প্রতি তাদের ঈর্ষাই স্বাভাবিক যেন।

শতাব্দী দাশ

শেষ আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:২৮
সরব: জামুইয়ে ‘সংস্কৃতি রক্ষক’দের হাতে কিশোর-কিশোরীর নির্যাতিত হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে শামিল ছাত্রসমাজ, পটনা, ২২ সেপ্টেম্বর।

সরব: জামুইয়ে ‘সংস্কৃতি রক্ষক’দের হাতে কিশোর-কিশোরীর নির্যাতিত হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে শামিল ছাত্রসমাজ, পটনা, ২২ সেপ্টেম্বর। ছবি: পিটিআই।

ওরা জিজ্ঞাসা করেছিল, “এত রাতে যুবতী মেয়ে নিয়ে বেরিয়েছিস কেন?” ছেলেটি অবাক হয়, মেয়েটিও। খানিক বচসার পর মেয়েটিকে বাসের ব্যাকসিটে টেনে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়। ছেলেটিকে নগ্ন করে পেটানো হয়। জামুই নয়, সে ছিল ২০১২ সালের দিল্লি— ‘নির্ভয়া কাণ্ড’। বিহারের জামুইয়ে অল্পের জন্য এমনটা ঘটেনি। দিল্লির ঘটনাক্রমের বর্ণনাটি পাওয়া গিয়েছিল খোদ অপরাধী রাম সিংহের মুখে। অনুশোচনাহীন অপরাধী ধরে নিয়েছিল, প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া তার ঠিকই ছিল; মদের ঘোরে এর পর বাড়াবাড়ি— অর্থাৎ ধর্ষণ ও খুন— ঘটে যায়।

এমনিতে পুরুষমানুষের যাতায়াত অবাধ দিনে-রাতে। কিন্তু রাতে পুরুষমানুষ মেয়ে সঙ্গী নিয়ে বেরোলে অন্য পুরুষের চোখ টাটায়। নারীহীন পুরুষগণ তখন ‘হ্যাভ নটস’। ‘হ্যাভস’-দের প্রতি তাদের ঈর্ষাই স্বাভাবিক যেন। নারী যেন ভোগ্য সামগ্রী— কারও আছে, কারও নেই। আবার রাতে পুরুষমানুষের সঙ্গে আমোদ করতে বেরোনো নারী এমনই ‘নষ্টা’ যে, তাকে হতেই হবে বহুভোগ্যা। মেয়েরা কে কখন কোথায় বেরোবে, তা নিয়ে খবরদারি করার অধিকার পুরুষের আছে। আর আছে সীমানা লঙ্ঘনকারী মেয়ের শরীরের সীমা লঙ্ঘন করে তাকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার। চোদ্দো বছর পরে জামুইয়ের গেরুয়া কাপড়ে মুখ ঢাকা যুবকেরাও তেমনই ভেবেছে। নির্ভয়ার ঘটনার জেরে ধর্ষণের আইন বদল হয়েছিল। কিন্তু সমাজমানসে আদৌ বদল হল কি?

ভিডিয়োটি অনেকেই দেখেছেন। ‘সংস্কৃতি রক্ষা’র নাম করে কিছু স্বনিযুক্ত সমাজ-পাহারাদার দুই দশম শ্রেণির কিশোর-কিশোরীকে শাসন করছে। জানা যাচ্ছে, তারা টিউশন থেকে ফেরার পথে এক নিরিবিলি জায়গায় ছবি তুলতে গিয়েছিল। ফেরার পথে আচমকা বাইক ঘেরাও। মেয়েটি কাকুতিমিনতি করে ‘দোষ’ স্বীকার করছে। একটি লোক তাকে যেখানে-সেখানে স্পর্শ করতে করতে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। তার হাতের গতিবিধি দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, মেয়েটির যৌন নির্যাতন ঘটছে, এর পর ধর্ষণও ঘটতে পারে। ছেলেটি বাধা দিতে গিয়ে মার খাচ্ছে। শেষ অবধি তারা ছাড়া পাচ্ছে, ছুটে পালাচ্ছে। পকসোতে মামলা হয়েছে। কিন্তু জামুই শুধুমাত্র যৌন নির্যাতনের ‘ভাইরাল’ নজির নয়। তা এক জটিল অসুখের উপসর্গ।

ছেলেমেয়ে দু’টি বাড়ি ফিরে কাউকে কিছু জানায়নি। ভিডিয়ো ভাইরাল হতে অভিভাবকরা জানলেন। দু’জন যে ট্রমা-র মধ্য দিয়ে গেল, তা কল্পনাতীত। বিশেষত মেয়েটি। মেয়েদের এই অভিজ্ঞতারও স্বাভাবিকীকরণ হয়ে গেছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো-র ২০২৩ ও ২০২৪-এর রিপোর্ট অনুসারে, ৩৬-৪০% অপ্রাপ্তবয়স্ক ‘নথিভুক্ত’ ভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার— তার ৯৮% মেয়ে। অনথিভুক্ত ঘটনার ইয়ত্তা নেই।

ওরা যে নিশ্চুপ ছিল, তা কি কেবল ট্রমাজনিত কারণে? না কি, ওরা দ্বিতীয় বার আক্রমণের ভয় পেয়েছিল? যৌন নির্যাতনের পর দ্বিতীয় আক্রমণটা সচরাচর সামাজিক ভাবে আসে। মেয়েটি কি এই মর্মে ভয় পায়নি যে, ভিডিয়োটি প্রকাশ পেলে সে মুখ দেখাবে কেমন করে? ধরে নেওয়া যায় যে, ভিডিয়ো করেছিল ও ছড়িয়েছিল অপরাধী বা তাদের সঙ্গীরা। তারা কি সত্যি ভাবছিল যে, তারা যা করছে তা ঘৃণ্য অপরাধ নয়, নিতান্ত ‘সংস্কৃতি রক্ষা’?

‘সংস্কৃতি রক্ষা’র ইঙ্গিত ছিল কথোপকথনে। তারা জিজ্ঞাসা করেছিল, “বাবা-মা জানে?” তারা বলেছিল, “যদি জানে, তা হলে পরিবারকে ডেকে আন।” পরিবারের জেনে ফেলা যে সমীচীন নয়, সে কথা যদি আগে কিশোর-কিশোরীর মনে না-ও এসে থাকে, এর পর তা মনে হবেই। কেন সমীচীন নয়? কিশোর বয়সে (বা, প্রাপ্তবয়সে) ছেলেমেয়েদের সম্মতিক্রমে মেলামেশায় দোষ কোথায়? তারা নিজেদের যৌনতা সম্পর্কে সচেতন আর দায়িত্বশীল হলে কোনও দোষই নেই। অথচ আমরা ভাবি, যৌনতার উন্মেষ সম্বন্ধে সচেতন হওয়াই বরং দোষের। বিহারের এক বিধায়ক বলেছেন, বাচ্চাদের ‘নীতি শিক্ষা’ দিতে হবে, কিন্তু সুস্থ পদ্ধতিতে। মানে গোপনাঙ্গে হাত-টাত না দিলে সম্ভবত এই খবরদারিতে তাঁর আপত্তি থাকত না।

জামুইয়ের অভিজ্ঞতা কি নিতান্তই জামুইয়ের? শহর কলকাতার কোনও যুগলের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত, অসম্ভাব্য? ভিক্টোরিয়ায় বা লেকে খোদ উর্দিধারী পুলিশের কাছে কি তারা একই হুমকি শোনেনি? এই যে সামাজিক নীতিপুলিশির স্বাভাবিকীকরণ, সমস্যা এখানেও নিহিত। ‘প্রকাশ্য অশালীনতা’-র এক আবছা ধারা আমাদের আইনে আছে বটে— তার ভয়ই আইনরক্ষকরা দেখান। পুলিশ এবং নীতিপুলিশের কাছে কোনটা অশালীন— পারস্পরিক সম্মতিক্রমে প্রকাশ্য অন্তরঙ্গতা, না কি সেই সম্মতির তোয়াক্কা না করা?

তা হলে কোন ‘নীতি’ শেখাব আমরা ছেলেমেয়েদের? আর কোন ‘সংস্কৃতি’-ই বা রক্ষিত হচ্ছিল জামুইয়ে? এই সংস্কৃতিকে স্পষ্ট ভাবে ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’ বলে ডাকা দরকার। একমাত্র ধর্ষণ সংস্কৃতিতে শ্বাস নেওয়া মানুষই ভাবেন যে, সম্ভাব্য ধর্ষককে ধর্ষণবিরোধী ‘নীতি শিক্ষা’ না দিয়ে সম্ভাব্য ধর্ষিতার চার পাশে লক্ষ্মণরেখা টানতে হবে। ধর্ষণ সংস্কৃতিতে পারস্পরিক সম্মতিক্রমে মেয়েদের পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে ঘোরা নিন্দনীয়, কিন্তু অসম্মতি সত্ত্বেও বিবাহিত স্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গম অপরাধ নয়। ধর্ষণ সংস্কৃতি ধর্ষকের দোষ লঘু করে দেখতে তৎপর। এই সংস্কৃতি আশা করে, নারী নিজের চলাচলের স্বাধীনতা বর্জন করে, নিজেকে আপাদমস্তক ঢেকে রেখে, নির্দিষ্ট আচরণ করে (বা না-করে), নিদেনপক্ষে ক্যারাটের প্যাঁচ ঝেড়ে ধর্ষণ আটকানোর দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করবে। ফলে ধর্ষিতা ও সম্ভাব্য শিকাররা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর পরিধির মধ্যে সিঁটিয়ে বাঁচেন। আক্রমণকারী নিশ্চয়ই অপরাধী; যে রাজনীতির ভাষ্য তাদের সমর্থন জোগায়, অপরাধী তা-ও— কিন্তু তার সামগ্রিক ভিত্তি হিসাবে ধর্ষণের সংস্কৃতিকে স্পষ্ট ভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

যে পিতৃতন্ত্রের নিয়ম মোতাবেক পৌরুষ মানেই খানিক গলা চড়ানো, মাতব্বরি, অন্যের হয়ে মতামত ও সিদ্ধান্ত জাহির করা, সেই পিতৃতন্ত্রের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি এই ধর্ষণ সংস্কৃতি। একের বদলে সমষ্টি জড়ো হলে এই মাতব্বরি আরও রাক্ষুসে। এই সংস্কৃতিতে ধর্ষণের পর ধর্ষক ধরা পড়লে সদলবলে সকলে তার ফাঁসি চায়। কিন্তু সেই ফাঁসি-উৎসাহী দলের যে কেউ ভিড় বাসে বালিকার শরীর খামচানো মুখহীন হাত হয়ে যেতে পারে। এনসিআরবি-র রিপোর্ট বলছে, নাবালিকাদের যৌন নির্যাতকদের ৯৬% পূর্বপরিচিত বা নিকটজন। এই পরিসংখ্যানকে ব্যাখ্যা করতে পারে একমাত্র ধর্ষণ সংস্কৃতি।

২০১২ সালেই নির্ভয়ার ঘটনার পর মধুমিতা পান্ডে তিহাড় জেলে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ধর্ষকদের নিয়ে এক সমীক্ষা করেন। তিনি দেখে আশ্চর্য হন যে, তারা অনুতপ্ত নয়। তারা তখনও মনে করে, মেয়েরা তাদের নাকের ডগায় ঘুরে না বেড়ালে ধর্ষিত হত না। লক্ষণীয়, একই কথা ভাবেন তাঁরাও, যাঁরা জেলের বাইরে আছেন ও মেয়েদের চার পাশে দিবারাত্র গণ্ডি টানছেন। নিজেরা যে গণ্ডি তাঁরা নির্ধারণ করেছেন, তার অন্যথা করা মেয়েদের তাঁরাও যে সহজলভ্য ভাবেন না, সুযোগমতো সেই মেয়েদের শিক্ষা দিতে যৌন নির্যাতন তাঁরাও যে করতে পারেন না— এ নিশ্চয়তা নেই।

ধর্ষণ সংস্কৃতির জবাব হতে পারে না নজরদারির সংস্কৃতি। তার প্রতিকার একমাত্র সম্মতির সংস্কৃতির মাধ্যমে সম্ভব। প্রতিরোধ লুকিয়ে আছে ব্যক্তির শরীরের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যে, সন্তানকে শরীরের সীমারেখা শেখানোর মধ্যে। ‘আমার শরীর আমারই’ শুধু নয়, ‘তার শরীর তারই’— এ যদি ‘নীতি শিক্ষা’ হিসাবে সর্বজনীন না-হয়, তবে অন্যায় বাড়বেই।

সুরক্ষা সংক্রান্ত আশঙ্কায়, বা ‘সংস্কৃতি’কে কোনও সীমায়িত সংজ্ঞায় বাঁধতে আমরা মেয়েদের ক্ষুদ্রতায় বাঁচতে শেখাব না। এক পৃথিবী দৌড়ের প্রান্তর তার প্রাপ্য। এক আকাশ বিস্তার তার হক। রাতের রাস্তার দখলও সে নেবে। আমাদের ছেলেদের বরং আমরা দেব সুকুমারমতি। অন্যের শরীরের সীমারেখার প্রতি সম্মানের শিক্ষা।

জামুইয়ের ছেলেমেয়ে দু’টি যে বয়সে পা দিয়েছে, সেটিই জীবন, সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব আবিষ্কার করার বয়স। মেয়েটি আহত হল, নিজের ভালমন্দের বোধকে প্রশ্ন করল, সাময়িক ভাবে হয়তো নিজেকে দোষারোপও করল। কিন্তু দেশজোড়া ভালবাসায় তার সংশয় যেন ঘুচে যায়। ছেলেটি শিখুক বন্ধুত্বের স্বাভাবিক কর্তব্য। সংস্কৃতি বা নারী, কেউই ত্রাণপ্রত্যাশী নয়। উভয়েই খোলা বাতাস চায়।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Jamui Women Harassment Women Safety

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy