E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

ভিতর থেকে উঠে আসা

ফুলদানিতে রাখা ফুল, পাখি, সাপ, মাছ, ছুরি দিয়ে দ্বিখণ্ডিত ফল, বালিশ-তোশকের পাশাপাশি সারি সারি নারী-পুরুষের মুখমণ্ডল ও দেহাবয়ব নিয়ে একের পর এক চিত্রপট।

সুশোভন অধিকারী

শেষ আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬ ০৭:৩৮

শিল্পকলার আসরে সুন্দরের সংজ্ঞা বদলেছে বার বার। বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তথাকথিত সুন্দরের পাশাপাশি পাতা হয়েছে অসুন্দরের আসন। যদিও সেই আঁচ আমাদের দেশে পৌঁছতে সময় লেগেছে। স্বাদেশিকতার আবহে তখন মাথা তুলছে ভারতীয় শিল্পের অঙ্কুর। আমাদের শিল্প-চালচিত্রের সেই পর্বে বিনোদবিহারীর কণ্ঠে ফুটেছে কিছু ভিন্ন সুর। তিনি বলেছেন, অবনীন্দ্রনাথ যখন ভাষা আর ভাবের সমন্বয়ে শিল্পের অন্দরমহলের অনুসন্ধান করছিলেন, তখন সমগ্র ইউরোপের শিল্পধারা হেঁটেছে সম্পূর্ণ বিপরীত পথে। এ নিয়ে তর্ক উঠলেও বিষয়টা অস্বীকার করা চলে না।

সে দিক থেকে, ভারতীয় শিল্পে তথাকথিত সুন্দরের মার্কা লাগানো বেদিতে প্রথম আঘাত হেনেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শিল্পকলায় সুন্দর ও অসুন্দরের ধারণাকে নতুন ছাঁচে তিনিই প্রথম মেলে দিয়েছিলেন। আজ পিছন ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, যোগেন চৌধুরীর ছবির ভুবন এগিয়েছে রবীন্দ্রনাথের সেই পথ ধরে। তাঁর শিল্পভাবনার অন্দরেও বহমান থেকেছে অসুন্দরের জয়যাত্রা।

পরিণত অধ্যায়ে পৌঁছে যোগেন চৌধুরীর ছবির নিজস্ব আঙ্গিক, সাদা-কালোর বিস্তার, কালিকলমের ‘ক্রস-হ্যাচ’ কাজে প্রাণের যে স্পন্দন জেগে ওঠে, বেদনার্ত নারীপ্রতিমার মুখমণ্ডলে কি রবীন্দ্রনাথের ছায়া এসে পড়ে? তাঁর ছবি ও পাণ্ডুলিপির কাটাকুটিতে যে সূক্ষ্ম জালিকাজ, তা যেন নতুন চেহারায় রূপান্তরিত হতে চায় যোগেন চৌধুরীর ক্যানভাসে। শুধু কি তা-ই? গ্রামবাংলার লোকাচার ঘিরে থাকা আলপনার যে চলন, ঘরোয়া গল্পগাছার অবসরে গড়ে ওঠা যে হাতের কাজ, কাঁথার ফুলকারি, সুচ-সুতোর বুনন দিয়ে ঘেরা কাপড়ের আশ্চর্য নরম যে টেক্সচার, তা কি শিল্পীর চিত্রপটকে অনায়াসে অধিকার করেনি?

তাঁর ছবির দিকে তাকিয়ে এ কথাও মনে হয়, তিনি যতখানি রেখার শিল্পী, ততটা রঙের শিল্পী নন। অবশ্য এই ভিন্নতা একাধিক শিল্পীর কাজে প্রতিভাত, যা শিল্পীর সচেতন আঙ্গিক। ছবিতে যে চোখ ভুলানো রঙের মায়া রচিত হয়, একাধিক শিল্পী তা থেকে সরে গিয়ে অবস্থান করেন সাদা-কালোর সংযত প্রয়োগের মধ্যে। তবে দৃষ্টিগত সাদৃশ্যই যে সব নয়, শিল্পীর পটে মিশে থাকে অনুভবের গভীর পলেস্তারা।

১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি, অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে যোগেন চৌধুরীর জন্ম। ফেব্রুয়ারি মাসের জাতক হিসেবে তিনি বেশ গর্ববোধ করতেন। রসিকতার ছলে বলতে শুনেছি, কবি আর শিল্পীর জন্মমাস হল ফেব্রুয়ারি। এ কথার সূত্রে দেখব— জীবনানন্দ দাশ, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, কে জি সুব্রহ্মণ্যন, শঙ্খ ঘোষ, গণেশ হালুই প্রমুখ ফেব্রুয়ারির জাতক। জন্মতারিখের সংখ্যা নিয়েও তাঁর ভাবনার অন্ত ছিল না। এক আর ছয় যোগ করে সাত সংখ্যা দাঁড়ায়, তা নাকি শিল্পীর পক্ষে সৌভাগ্যসূচক— বলতে শুনেছি এমনটাও। তাঁর ছবির অভিমুখ তথাকথিত সুন্দরের বিপরীতে ধাবিত, কিন্তু কী ভাবে বুঝতে হবে সেই ছবি আর শিল্পীর চিত্তপট! তাঁর ছবিতে কি মিশে আছে ফেলে আসা শৈশবের ঘ্রাণ, স্মৃতি আর মায়া দিয়ে জড়ানো ও-পার বাংলার রূপকথা?

তাঁর অনুভূতিশীল মনের দরজায় অনবরত কড়া নেড়েছে দেশভাগের যন্ত্রণা, স্বজন হারানোর ব্যথা, উদার উন্মুক্ত প্রকৃতির হাত ছাড়িয়ে হঠাৎ এক দিন কলকাতা শহরের সঙ্কীর্ণ প্রকোষ্ঠে ঠাসাঠাসি জীবনে। কতই বা বয়স তাঁর, শৈশব আর কৈশোরের সীমারেখা সবে ছুঁয়েছে তখন। কিন্তু মনের গভীরে জেগে উঠছিল অদম্য শিল্পসত্তা, বাবার আঁকা ছবির স্মৃতি। উপকরণের প্রাচুর্যহীন কৈশোরে কাঁচি দিয়ে পত্রপত্রিকা থেকে ছবি কেটে সংগ্রহ শুরু করেছেন এই পর্বেই। কেবল সংগ্রহ নয়, সযত্নে খাতায় সেঁটে রাখার অভ্যাস সেই কিশোরবেলা থেকে।

শিল্পীজীবনের উষালগ্নে সংগৃহীত সেই আটপৌরে খাতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়েছে, স্ফীত হয়েছে, হারিয়ে যায়নি। সেই সব ছবির তাগিদ তাঁকে দেওয়ালের গায়ে রেখা টানতে উস্কে দিয়েছে, কখনও গড়িয়ে নিয়েছে পুতুল। প্রথম জীবনের সেই জীর্ণ খাতা শেষ দিন পর্যন্ত অটুট ছিল। চকিতে মনে হয়, ‘একমনে তোর একতারাতে একটি যে তার সেইটি বাজা—/ ফুলবনে তোর একটি কুসুম, তাই নিয়ে তোর ডালি সাজা’— রবীন্দ্রগানের এই ভাবনা কখন অজানতে তাঁর জীবনের মন্ত্র হয়ে উঠেছিল। শিল্পীজীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা অপরিমেয় অভিঘাতে ভরা পথের শেষে তাঁর সদ্য চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে তেমনটাই মনে হয় আমাদের।

জীবনের প্রায় মধ্যপর্বে তিনি শিক্ষক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের কলাভবনে যোগ দিয়েছেন, যা নিঃসন্দেহে তাঁর ভাবনা ও কাজে বিশেষ মাত্রা যুক্ত করেছে। তাঁর জীবনের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট শান্তিনিকেতন, ছবিতেও এসেছে পরিবর্তন। বিশেষ করে আঙ্গিকের ক্ষেত্রে তাঁর বহুচর্চিত ‘ক্রস-হ্যাচ’ পদ্ধতির সূক্ষ্মতার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে ক্যালিগ্রাফির আধারে রচিত ঘন কালো মোটা রেখার সপাট ঋজু আঁচড়— যা তাঁকে আগলে রেখেছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। এখানে মনে রাখা দরকার, কর্মসূত্রে দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে তাঁকে শান্তিনিকেতনে আনার পিছনে সুব্রহ্মণ্যনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। শান্তিনিকেতন পৌঁছে অল্প সময়ের মধ্যে তিনি ছাত্রছাত্রীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। আজও দেশ-বিদেশে তাঁর অগণিত ছাত্রছাত্রী ছড়িয়ে— যাদের সঙ্গে যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ ছিল প্রায় শেষ দিন পর্যন্ত।

শিল্প সংগঠক হিসেবেও তাঁর অসামান্য ভূমিকা ছিল, লিখেছেন কবিতা, আবার নানা সামাজিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন। ছাত্রছাত্রী তথা তরুণ শিল্পীদের জন্য অকাতরে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন, সে চিকিৎসা হোক বা আর্থিক প্রয়োজনে। তাদের কাজ নিয়ে ভেবেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন, সামনে ঠেলে দিতে দ্বিধা করেননি। কাজের মধ্যে ডুবে থাকাই ছিল তরুণ চিত্রীদের জন্যে তাঁর একান্ত পরামর্শ। মনে পড়ে, শান্তিনিকেতনে আসার কিছুকাল পরে এক সাক্ষাৎকারে শিল্প-প্রতিষ্ঠান ও ছাত্রদের প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন, “কোনও ছাত্রের যে নির্দিষ্ট জায়গা থাকে, সেটাই বিশেষ ইম্পরট্যান্ট।” অর্থাৎ শিক্ষকের খেয়াল রাখা দরকার, ছাত্রের আগ্রহের বীজ কোথায় লুকিয়ে আছে।

পাশাপাশি তাঁর মতে, “ইনস্টিটিউশনে শিক্ষার তিনটে ধাপ আছে। এক, আঙ্গিকের সম্ভাবনাকে কাল্টিভেট করা। অর্থাৎ কম্পোজিশন, ড্রয়িং, এ্যাপ্লিকেসন অব কালার প্রভৃতি প্রাথমিক ব্যাপারটা তৈরি করে দেওয়া।… দ্বিতীয় হচ্ছে, এইগুলোর উপর ভিত্তি করে নিজস্ব জায়গায় পৌঁছতে শিল্পীকে সাহায্য করা। অর্থাৎ ছবির আঙ্গিকের ওপর নির্ভর করে একটা ছবি করতে শেখানো।… এর পরে আসে, শিল্পীর মানসিক চেতনার স্তরকে ঠিক মতো খুলে দেওয়া। সেটাই শিল্পীর সবচেয়ে জরুরি কাজ, তার নিজস্ব চিত্রভাষা তৈরি করা— যেখানে জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা দিয়ে শিল্পীকে পৌঁছতে হয়।” এটা বাইরে থেকে শিক্ষকরা গড়ে দিতে পারেন না, “এটা শিল্পীর নিজস্ব পরিভাষা।” শিক্ষক তথা শিল্পী হিসেবে এই বিশ্লেষণ তাঁকে শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। অর্থাৎ এ কথা পরিষ্কার, চিত্রকর যোগেন চৌধুরীর সঙ্গে শিক্ষক যোগেন চৌধুরীকে মিলিয়ে না-দেখলে তাঁকে পরিপূর্ণ চেনা সহজ নয়।

আবার ফিরে আসি তাঁর ছবির জগতে। ফুলদানিতে রাখা ফুল, পাখি, সাপ, মাছ, ছুরি দিয়ে দ্বিখণ্ডিত ফল, বিছানায় কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে থাকা বালিশ-তোশকের পাশাপাশি সারি সারি নারী-পুরুষের মুখমণ্ডল এবং দেহাবয়ব নিয়ে গড়ে উঠেছে একের পর এক চিত্রপট। রঙের সামান্য ছোঁয়ায় নরম, মাংসল গা-শিরশির করা অনুভূতি জাগিয়ে তোলে এই সব ছবি।

একই সঙ্গে আর্ত, অসহায়, ব্যথাতুর ছবির সারি, ক্ষতচিহ্নে জর্জরিত মুখ বা শরীর দিয়ে রচিত মানুষ— যাদের সর্বাঙ্গে আঘাতের চিহ্ন আঁকা। সে যেন হাড়ের কাঠামোহীন কাঁচা মাংসের স্তূপ। পাশাপাশি যৌবনপ্রান্তের কামনাদীর্ণ অভিব্যক্তি আর নুইয়ে পড়া শরীরের শেষ আগুনটুকু জ্বালিয়ে দেওয়ার অসহায় ভঙ্গিতে ছেয়ে আছে চিত্রীর ক্যানভাস। শিল্পীর নিজস্ব ভাষায়— ‘পাপের মূর্তিগুলি উঠে আসে’।

এ সব ছবির দিকে বেশি ক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না, আবার চোখ সরিয়ে নেওয়াও অসম্ভব। কী এক অমোঘ আকর্ষণ দর্শককে ছবির সামনে দাঁড় করিয়ে রাখে। এই সব প্রতিমা যেন অবচেতনের গহন থেকে হানা দেয়। কোথাও গর্জে ওঠে বিদ্রুপের তীব্র চাবুক, আলো-ছায়া ঘেরা জীবনের সঙ্গে বাদ পড়ে না রাজনীতির অন্ধকার, সমাজের ধ্বস্ত এলাকা।

চিত্রকলার তিনটি প্রধান ভরের মধ্যে রেখার দিকেই তাঁর পাল্লা বিশেষ ভারী হয়ে উঠেছে। তবে প্রশ্ন জাগে, সে কোন রেখা? ক্যালিগ্রাফের মতো হাওয়ায় ভাসিয়ে দেওয়া রেখা সে নয়, তাঁর রেখা তীব্র ভাবে মাটি আঁকড়ে এগিয়ে চলে। তার মন্থর গতি ক্যানভাসের গায়ে জাপ্টে লেগে থাকে, ঠিক যেমন শিল্পী তাঁর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিবিড় ভাবে এই জীবনকে জড়িয়ে ছিলেন।

মনে পড়ে, বুদ্ধদেব বসুর কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের আঁকা ছবি প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “(ছবি) ভেতরের থেকে উঠে এলো তো এলো, না এলো তো এলো না।” যোগেন চৌধুরীর চিত্রজগতের দিকে তাকিয়ে মনে হয়— এ ছবি শিল্পীর সেই ভিতর থেকে উঠে এসেছে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
jogen chowdhury artist Painter Rabindranath Tagore

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy