E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

বাঙালির পাতে ‘ভাদরের চুনো’

নদিয়ার দত্তপুলিয়ায় গত ২৯ ভাদ্র পালিত হল ‘খাল বিল চুনোমাছ উৎসব’। নদ-নদীর সংরক্ষণ নিয়ে বহু গবেষণা, কর্মকাণ্ড চলছে, খাল-বিল আর কতটুকু গুরুত্ব পায়? মাছেদের মধ্যে চুনোমাছেরই বা আদর কতটুকু?

শশাঙ্ক দেব

শেষ আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৪৫

বর্ষায় ভরে-ওঠা খালবিলে প্রচুর মাছ জন্মায়, ভাদ্র মাসে জল নামলে তা সহজলভ্য হয়। এই সময়ের চুনো মাছ স্বাদ-পুষ্টিতে ভরপুর। ভাদ্র তাই চুনোমাছ খাবার মাস। খনার বচনের নির্দেশ, “ভাদরের চুনো, আশ্বিনের কোনো/ কার্তিকের মোয়া, খাইছ তো খোয়া।” অর্থাৎ ভাদ্র মাসে চুনো মাছ, আশ্বিনে একটু বড় (কোনো) মাছ খেতে হবে। কিন্তু কার্তিকে মাছের পেটে ডিম এসে যায়, তা খেলে ক্ষতি হবে।

নদিয়ার দত্তপুলিয়ায় গত ২৯ ভাদ্র পালিত হল ‘খাল বিল চুনোমাছ উৎসব’। নদ-নদীর সংরক্ষণ নিয়ে বহু গবেষণা, কর্মকাণ্ড চলছে, খাল-বিল আর কতটুকু গুরুত্ব পায়? মাছেদের মধ্যে চুনোমাছেরই বা আদর কতটুকু? যে সব প্রজাতির মাছের বয়স বাড়লেও মাপ তেমন বড় হয় না, তাদেরই বলে চুনোমাছ। মাছের ব্যবসায় তাদের গুরুত্ব কম, কিন্তু জীববৈচিত্রের নিরিখে গুরুত্ব অপরিসীম। সে-দিনের উৎসবে স্থানীয় মৎস্যজীবীরা ল্যাটা, কাঁচকি, পুঁটি, মৌরলা, খলসে, খয়রা, চাঁদা, ফ্যাঁসা, ময়া, চেলা, ইত্যাদি অন্তত বাইশ রকম প্রজাতির জ্যান্ত মাছ এনেছিলেন। স্থানীয় স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা তাদের চেনার চেষ্টা করল। তাদের মাছ চেনার আগ্রহ বাড়ল।

রুই, কাতলা, মৃগেল ছাড়া ভেটকি, বোয়াল, ট্যাংরা, পারশে, মাগুর, শিং, গলদা, বাগদা, ভেনামি চিংড়ি— এগুলি ছাড়া বাকি মাছেদের সম্মান নেই, দামও নেই। কখনও-সখনও উত্তরবঙ্গের বোরোলি, মধ্যবঙ্গের রাইখর, দক্ষিণবঙ্গের চেঙ্গো (গুলে), মৌরলা খুব দামি হয়ে ওঠে। প্রকৃতিতে নিঃশেষিত হওয়ার আগে কদর বাড়ে। তা না হলে এক-এক জেলায় বিচিত্র নামে ও চেহারায় যে অসংখ্য প্রজাতি ‘চুনোমাছ’ নামের দাবিদার, তাদের তালিকা কে তৈরি করে? অথচ, হাড় ও দাঁত মজবুত করতে, ‘অস্টিয়োপোরোসিস’-এর মতো রোগ প্রতিরোধে চুনোমাছের তুলনা নেই, কারণ ক্যালসিয়াম, ফসফরাসের ভান্ডার চুনোমাছ।

আমাদের লোকাচারে খাল-বিল, পূজা-অর্চনা আর মাছের আনাগোনার কত বিচিত্র ধারা রয়েছে। সরকারি জলাগুলি ঠিকা নিয়ে মৎস্যজীবীরা বা সমবায়গুলি মাছ চাষ করতেন আগে। এখন ঠিকার টাকা আট-দশগুণ বেড়েছে। বড় বিনিয়োগকারীরা বাড়তি লাভের জন্য ‘উন্নত মাছ চাষ’-এর নামে যে পদ্ধতি ব্যবহার করছেন তাতে আর চুনোমাছের স্থান থাকছে না। জীববৈচিত্রও ধ্বংস হচ্ছে।

১৯৬০ সালে দেখেছিলাম, ২০-৩০ ফুট প্রশস্ত স্বচ্ছ জলের খাল চলেছে গ্রামের মধ্যে দিয়ে, গৃহস্থের উঠোনের পাশ দিয়ে। খাল-সংলগ্ন প্রায় সব বাড়ির আঙিনায় পাতা ছিল কঞ্চি বা পাট-কাঠি আর সুতো দিয়ে তৈরি ‘ঘুনি’ বা মাছের ফাঁদ। সেখানে চুনোমাছ ঢুকে আর বেরোতে পারে না। নদীতে ঝুঁকে-পড়া একই গাছের একাধিক ডালে বাঁধা রয়েছে ছিপ, বঁড়শিগুলোতে ছোট ছোট মাছ আটকে আছে। জায়গায় জায়গায় জলের মধ্যে বিপুল শোরগোল। পরে জেনেছি এই খাল ছিল আদি গঙ্গার প্রাচীন ধারার একটি অংশ। দু’হাজার বছর আগে গঙ্গার মূল ধারা নাকি এই পথে সাগরে মিশত। সেই খালের কাছে ফিরে গিয়েছিলাম ১৯৬৯ সালে। তত দিনে খালের মাঝে মাঝে ‘বাধাল’ তৈরি হয়েছে, পলি জমেছে। নৌকা চলে না। অবশিষ্ট ছিল কিছু জলের পকেট, চুনোমাছের সম্পদ নিয়ে। আজ তার অবশিষ্টও খুঁজে পাওয়া যায় না।

কলকাতার উত্তর প্রান্তের নোয়াই খালের উৎপত্তি ব্যারাকপুর অঞ্চলে, ভাগীরথী নদীর পূর্ব পারের ‘বরতির বিল’ থেকে। এক সময়ের লাবণ্যবতী নদী স্রোত হারিয়ে খালে পরিণত হয়েছে। প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জলধারা ব্যারাকপুর, পানিহাটি, খড়দহ, মধ্যমগ্রাম এবং রাজারহাট-গোপালপুর— এই ছ’টি পুরসভা এলাকা এবং বিভিন্ন পঞ্চায়েত এলাকার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিদ্যাধরী নদীতে গিয়ে মিশেছে। এই খালের দু’পাশ দিয়ে শহরের তরল বর্জ্য ছাড়াও খাটাল এবং অসংখ্য রাসায়নিক, ব্যাটারি, প্লাস্টিক, গেঞ্জি, অ্যাসিড ইত্যাদি কারখানার বর্জ্য মিশছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণের ছাড়পত্র-পাওয়া কারখানাগুলি থেকে রঙিন, তৈলাক্ত পদার্থ খালে ছাড়া হচ্ছে, তা স্পষ্টই দেখা যায়। স্থানীয়রা এই খালের নাম দিয়েছেন ‘অ্যাসিড খাল’। দুই মৎস্যজীবী জানিয়েছিলেন, সত্তরের দশকে এই খালে এত মাছ ছিল যে তার উপার্জনে তাঁরা জমি কিনে ঘর করেছিলেন, ভাগের নৌকা ছেড়ে নিজের নৌকা কিনেছিলেন, মেয়েদের বিয়ে দিয়েছিলেন। প্রায় ৩৫০ মৎস্যজীবী খালের জলে মাছ ধরে সংসার চালাতেন। ১৯৯০-এর দশক থেকে খাটাল আর কল-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য, পলি, কচুরিপানার দাপটে মাছ কমতে লাগল। মৎস্যজীবীরা মাছ ব্যবসা, দিনমজুরি প্রভৃতি পেশা খুঁজে নিলেন।

কোভিড লকডাউনের সময় আবার মাছ ফিরে এসেছিল। কিছু দিন কারখানাগুলো বন্ধ থাকার ফলে অনেক চুনো মাছ পাওয়া যাচ্ছিল, এমনকি চিতল, বোয়ালও পাওয়া গেল। তা হলে কি কলকারখানাগুলো বন্ধ করাই উপায়? “তা কেন। সেখানেও তো লোকজন উপার্জন করেন। কিন্তু জ্যোতিবাবুর আমল থেকে শুনে আসছি, কারখানাগুলো ফিল্টার করে জল ফেলবে। সরকার একটা বড় পরিশোধন প্লান্ট বসাবে। তা আর হল কই?” এখনও আদিত্য, শ্যাম নৌকা নিয়ে খালে নামেন, তবে তা মাছ ধরার জন্য নয়। প্লাস্টিক, বোতল প্রভৃতি আবর্জনা তোলার জন্য। মৎস্যশিকারি থেকে তাঁরা এখন আবর্জনা-শিকারি।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Nadia Fish

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy