E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

বৃষ্টি নামার পরের কলকাতা

আসল গলদ কলকাতা গড়ে তোলার কৌশলে। অনিয়ন্ত্রিত ‘কংক্রিটাইজ়েশন’ বা কংক্রিটের নগরায়ণ শহরের সেই সমস্ত স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে দিচ্ছে, যা এক সময় বৃষ্টির জলকে মাটির নীচে নামতে বা ধীরে ধীরে সরে যেতে সাহায্য করত।

শোভিনী মণ্ডল

শেষ আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:৫৩

কলকাতা প্রতি বর্ষায় এক অস্থায়ী হ্রদে পরিণত হয়। জমা জলের নীচে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া গর্ত বা বিদ্যুৎবাহী তার এড়িয়ে চলতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নেন পথচারীরা। কয়েক দিন পর জল নেমে যায়, রাস্তায় জোড়াতালি দেওয়া হয়, শহর ছন্দে ফেরে— পরবর্তী ভারী বৃষ্টি নামা পর্যন্ত।

আসল গলদ কলকাতা গড়ে তোলার কৌশলে। অনিয়ন্ত্রিত ‘কংক্রিটাইজ়েশন’ বা কংক্রিটের নগরায়ণ শহরের সেই সমস্ত স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে দিচ্ছে, যা এক সময় বৃষ্টির জলকে মাটির নীচে নামতে বা ধীরে ধীরে সরে যেতে সাহায্য করত। আইআইটি খড়্গপুরের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় এই ভয়াবহ রূপান্তরের স্পষ্ট ছবি ধরা পড়েছে। ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে কলকাতা মেট্রোপলিটন অঞ্চলে বাঁধানো বা কংক্রিটে ঢাকা জমির পরিমাণ ৭২ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৮৬ শতাংশে পৌঁছেছে। বিলীন হয়ে গিয়েছে ৬০ বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি গাছপালা এবং প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটার জলাশয় ও জলাভূমি। এই পরিসংখ্যান প্রকৃতপক্ষে শহরের প্রাকৃতিক জল-ব্যবস্থাপনা ধ্বংসের খতিয়ান।

একটি শহর তখনই বৃষ্টি সামলাতে পারে, যখন তার মধ্যে মাটি, খোলা জমি, গাছপালা আর পুকুর অক্ষত থাকে। কিন্তু এগুলোকে যখন বহুতল, পার্কিং জ়োন বা পিচ-কংক্রিটের আস্তরণে ঢেকে ফেলা হয়, তখন জল আর মাটির নীচে নামতে পারে না। ফলে, সমস্ত জল মাটির উপর দিয়ে সজোরে নিকাশি নালার দিকে ধাবিত হয়। এতে আধুনিকতম নিকাশিব্যবস্থাও স্তব্ধ হতে বাধ্য।

ঠিক এখানেই কলকাতার রাস্তাঘাট তৈরির পরিকল্পনাকে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন। আমরা প্রায়ই মনে করি একটা পুরনো ক্ষতিগ্রস্ত পিচের রাস্তা তুলে সেখানে ঢালাই কংক্রিটের রাস্তা বানিয়ে দেওয়া মানেই উন্নয়ন। স্থায়িত্বের বিচারে ঢালাই রাস্তা হয়তো মজবুত, কিন্তু স্থায়িত্ব আধুনিক নগর-পরিকাঠামোর একমাত্র মাপকাঠি নয়। সাধারণ পিচের রাস্তা জল শুষে নেয় আর কংক্রিটের রাস্তা জল আটকে দেয়— বিষয়টি এতটা সরল নয়। প্রচলিত পিচ এবং সাধারণ ঢালাই কংক্রিট— দুটোই জল-অপ্রবেশ্য। আসল বিকল্প হল ‘পারমিয়েবল ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বা জল-ভেদ্য পরিকাঠামো— এমন এক বিশেষ প্রযুক্তির পিচ বা ছিদ্রযুক্ত কংক্রিট, যার মধ্য দিয়ে বৃষ্টির জল সহজেই মাটির নীচে চলে যেতে পারে। ‘ইন্ডিয়ান রোডস কংগ্রেস’ (আইআরসি)-এর নির্দেশিকাতে ইতিমধ্যেই এই ধরনের জল-ভেদ্য ফুটপাত ও রাস্তার পরিকাঠামোকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এমনকি কলকাতার মতো শহরের বৃষ্টিপাতের পরিমাণের কথা মাথায় রেখে কী ভাবে এই বিশেষ ছিদ্রযুক্ত কংক্রিট ব্যবহার করা সম্ভব, তা নিয়েও আইআরসি-র গবেষণা রয়েছে।

বিশ্বের বহু দেশ এই ভাবধারাকে নগর পরিকল্পনার মূল ভিত্তি বানিয়ে ফেলেছে। জাপানের শহরগুলোতে জলশোষক ফুটপাত, ভূগর্ভস্থ জল-সংগ্রাহক চ্যানেল এবং অনুপ্রবেশ ব্যবস্থার এক বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে। চিনের ‘স্পঞ্জ সিটি’ প্রকল্পও একই নীতিতে গড়ে উঠেছে— বৃষ্টির জল ঠিক যেখানে পড়ছে, সেখানেই ধরে রাখার চেষ্টা হল এই নীতির উদ্দেশ্য, যাতে শহরের সমস্ত জল এক সঙ্গে ড্রেনের দিকে ধেয়ে না যায়।

ভারতের শহরগুলোকেও এখনই এই মডেল অনুসরণ করতে হবে। কেন্দ্রের ‘আর্বান ফ্লাড রিস্ক মিটিগেশন প্রোগ্রাম’-এর অন্তর্ভুক্ত প্রথম সাতটি শহরের তালিকায় কলকাতাও রয়েছে এবং এর জন্য মোটা অঙ্কের তহবিলও বরাদ্দ হয়েছে। এই ফান্ডের কিছু অংশ কি কলকাতার রাস্তা ও প্রকাশ্য স্থানগুলোকে জলকষ্ট সমাধানের অংশ বানিয়ে তুলতে ব্যবহার করা যায় না? রাস্তাকে বৃষ্টি সামলানোর উপযোগী করে তৈরি করতে হবে। ভারী যান চলাচল, মাটির গঠন ও ভূগর্ভস্থ জলের স্তরের উপর ভিত্তি করে ব্যস্ত রাস্তায় পিচই উপযোগী। কিন্তু শহরের পার্কিং এরিয়া, ফুটপাত, পেডেস্ট্রিয়ান জ়োন, এবং সার্ভিস রোড এলাকার অলিগলিতে এই প্রযুক্তি অনায়াসে ব্যবহার করা যায়।

কিছু জল মাটির নীচে যাক, কিছু জল সংরক্ষিত থাক, আর বাকি জলটুকু ধীরে ধীরে নিকাশি নালায় পৌঁছক। এই কৌশল অবলম্বন করলে এক বর্ষায় তড়িঘড়ি মেরামত হওয়া রাস্তা পরের বর্ষাতেই ধসে যাওয়ার যে চেনা ছবি আমরা দেখি, তা পাল্টাতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন স্বল্পমেয়াদি জোড়াতালি মারার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে ‘লাইফ সাইক্‌ল ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বা দীর্ঘস্থায়ী পরিকাঠামো নীতি গ্রহণ করা। রাস্তা নতুন করে তৈরির আগেই ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন বা তারের স্পষ্ট মানচিত্র তৈরি করতে হবে। বিভিন্ন পরিষেবা সংস্থাকে সমন্বয় রেখে কাজ করতে হবে, যাতে নতুন তৈরি রাস্তা বার বার খোঁড়া না হয়।

বিষয়টি জনসুরক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। গর্ত যখন ২০-৩০ সেন্টিমিটার জলের নীচে অদৃশ্য থাকে, তখন তা মৃত্যুফাঁদ। জলমগ্ন রাস্তা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো প্রাণঘাতী ঝুঁকিও তৈরি করে। গত বছরের অতিবৃষ্টিতে কলকাতা ও তার আশপাশে একাধিক বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা প্রমাণ করেছে যে জল জমা কী ভাবে এক নিমেষে পরিকাঠামোগত ব্যর্থতা থেকে জনসুরক্ষার সঙ্কট হয়ে উঠতে পারে।

আকাশ থেকে কতটা বৃষ্টি নামবে তা কলকাতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। কিন্তু সেই জল মাটি ছোঁয়ার পর শহর তার সঙ্গে কী আচরণ করবে— সেটা ঠিক করার ক্ষমতা পুরোটাই কলকাতার হাতে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Waterlogged Situation waterlogged kolkata Waterlogged Heavy Rainfall Monsoon Season

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy