E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

ব্রিজের নীচে বাস

৩২ নম্বর পঞ্চাননতলা রোড— এই ঠিকানায় রয়েছে ৪৩টি ঘর। রেললাইনের এ পাশ-ও পাশে এমন ঘর কয়েকশো। নোটিস লেগেছে সেখানেও। এনএম৪সি৪পিভিজি, ৭এমজেসিজি৯৬৮এনআর— এই রকম সব ঠিকানাতে আসে বিদ্যুতের বিল, সরকারি চিঠিপত্র। কবে থেকে আছেন এখানে?

স্বাতী ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬ ০৫:৫৮
আশ্রয়: নিজের ঘরে করুণা পাড়ুই। এই ঠিকানাতেই আসে বিদ্যুতের বিল, সরকারি চিঠিপত্র।

আশ্রয়: নিজের ঘরে করুণা পাড়ুই। এই ঠিকানাতেই আসে বিদ্যুতের বিল, সরকারি চিঠিপত্র।

ঢাকুরিয়া ব্রিজের নীচে, রেললাইনের দু’পাশে ঠাসাঠাসি ঘর। ঘর মানে, ছ’ফুট বাই পাঁচ ফুট, উচ্চতা ছ’সাত ফুট— এমন দুটো কি তিনটে বাক্স একের উপর এক চাপিয়ে রাখলে যেমন হয়, তেমন। খাড়া মই বেয়ে ওঠা-নামা। ব্রিজের নীচে বাস, চিন্তা বারোমাস। উপর দিয়ে বাস গেলে, পাশ দিয়ে ট্রেন গেলে, কাঁপতে থাকে সিঙ্গল ইটের গাঁথনি, বাঁশের চালা, কাডবোর্ড, প্লাস্টিক। এখন কাঁপছে বুলডোজ়ারের ইস্পাত-নখের ভয়ে। নোটিস পড়েছে, উঠে যেতে হবে। মামলা আদালতে, কবে কি রায় বেরোয় কে জানে! স্বপ্না পাড়ুই আদালতে তিন আবেদনকারীর এক জন। বছর তেত্রিশের তরুণী এখান থেকেই বিনোদিনী স্কুল, শিবনাথ শাস্ত্রী কলেজে পড়েছেন। কাজ করেন একটা পিৎজ়ার দোকানে, ঘণ্টায় চল্লিশ টাকায়। এ ক’দিন যাচ্ছেন না কাজে। কখন পুলিশ আসে, পুরসভার লোক আসে!

৩২ নম্বর পঞ্চাননতলা রোড— এই ঠিকানায় রয়েছে ৪৩টি ঘর। রেললাইনের এ পাশ-ও পাশে এমন ঘর কয়েকশো। নোটিস লেগেছে সেখানেও। এনএম৪সি৪পিভিজি, ৭এমজেসিজি৯৬৮এনআর— এই রকম সব ঠিকানাতে আসে বিদ্যুতের বিল, সরকারি চিঠিপত্র। কবে থেকে আছেন এখানে? মেয়েরা কেউ বললেন, “সেই যখন বাংলাদেশ থেকে তাড়িয়ে দিল, শ্বশুরমশাই তখন থেকে রয়েছেন।” কেউ বললেন, “আমার শাশুড়ি বিয়ে হয়ে এসেছিল এখানে।” পাঁচ-ছ’দশক ধরে কত না জন্ম-মৃত্যু সার্টিফিকেটে উঠেছে এই ঠিকানা। এখন চলছে মা মনসা, মা শীতলার কাছে মানত, শিবদুর্গা মন্দিরে অভিমান— “আমরা উঠে গেলে কে জল দেবে ঠাকুর?”

ঠাকুরের দয়া? ঠিকরে উঠবেন আন্দোলন কর্মীরা। আবাস হল অধিকার। দেশে কি আইন কানুন নেই? সংবিধান নেই? আছে বইকি, কিন্তু দেশটা যে বদলে গিয়েছে! এমন তুরীয় দশা, যে প্রশাসনের চোখে নাগরিক কখনও সাকার, কখনও নিরাকার। আধার-ভোটার কার্ড, ইলেকট্রিক বিল-রেশন স্লিপে যাকে দেখা যাচ্ছে, এসআইআর তালিকায় সে অন্তর্হিত। আবার ব্রিজের তলার বাসিন্দারা এসআইআর-এ ঠিকানা-সহ প্রস্ফুট, কিন্তু আদালত বলছে ‘নেতি নেতি’। এই ঠিকানায় কেউ বাস করে, প্রমাণ কই? তাই শুনে এক ফোটোগ্রাফারকে ধরে এনেছিলেন মেয়েরা, জিয়ো-ট্যাগিং করে বাড়ির ছবি তুলে দিতে। এমনই কপাল, এ দিক দিয়ে ক্যামেরা তাক করলে জিপিএস দেখায় কাঁকুলিয়া রোড, ও দিক থেকে দেখায় সাদার্ন অ্যাভিনিউ। কৃত্রিম উপগ্রহও বক্রী। অগত্যা দু’শো টাকা করে খসিয়ে ভোটার কার্ড নতুন করে করিয়ে সকলে পাঠিয়েছে হাই কোর্টে।

“বুঝি, সরকারের জায়গা সরকারকে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের কথাটাও সরকারের ভাবা দরকার।” কী কথা? “এমন জায়গায় থাকতে দিক, যাতে কাজ করে খেতে পারি, ছেলেমেয়েরা স্কুলে পড়তে পারে,” সাবিত্রী দলুই, পাপিয়া হালদাররা বললেন সমস্বরে। পুনর্বাসন না দিয়ে উচ্ছেদ নয়, এই আর্জি কি দাঁড়াবে আদালতে? যে ভাবে দোকান গুঁড়িয়ে গিয়েছে, গৃহস্থঘর হয়েছে টিন আর বাঁশের স্তূপ, সে ভাবে শহরের নানা বস্তিও আইনি সুরক্ষার চৌহদ্দির বাইরে চলে যেতে পারে। কিন্তু আইন-বিধির বাধ্যবাধকতা যেখানে শেষ, সেখানেই শুরু উচিত-অনুচিত, কল্যাণ-অকল্যাণের বিচার। করা তো যায়, কিন্তু করা কি ঠিক?

দার্শনিক অরিন্দম চক্রবর্তী বলেন, ‘ought’ শব্দের উৎপত্তি ‘owed’ শব্দ থেকে। যা নিয়েছি, তা ফিরিয়ে দিতে হবে, এই হল ঔচিত্য, বা ‘এথিকস’-এর মূল কথা। শ্রমিক-আবাসের অবৈধতা শ্রমের দামে ভর্তুকি দিয়ে চলেছে। দু’তিন হাজার টাকায় সারা মাসের রান্না, বারো হাজার টাকায় বারো ঘণ্টার আয়া, ১৫-২০ টাকায় অটো-টোটোয় এক কিলোমিটার যাত্রা, মাসে পনেরো-কুড়ি হাজার টাকায় হাসপাতালের গ্রুপ ডি— বৈধ বাড়ির ভাড়া কি ঢুকে থাকতে পারে মজুরির এই হিসাবে? যদি বাড়ি ভাড়া ঢুকত, তা হলে বহু জরুরি পণ্য-পরিষেবা বেরিয়ে যেতে চাইত মধ্যবিত্তের নাগাল থেকে। বাস ড্রাইভার, শপিং মলের সেলস গার্ল, প্রাইভেট টিউটর, কে না থাকে বস্তিতে!

সাবিত্রী-পাপিয়াদের ষাটটা বাড়ির জন্য তিনটে শৌচালয়। সকালে লাইন পড়ে। ঘর-জোড়া তক্তপোশের উপরে এক জন, তলায় এক জন শোয়। নিত্য ট্রেনে কাটা-পড়ার ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা বাঁচেন। “এই পয়লা বৈশাখে আমার জা কাটা পড়ল, রোদে-দেওয়া বালিশ তুলতে গিয়ে,” বললেন রেণু মণ্ডল। এই দুঃসাধ্য জীবন শহর-অর্থনীতিকে সর্বস্তরের মানুষের সাধ্যের মধ্যে ধরে রাখছে। ধরে রাখে মানবিক সম্পর্কগুলিও। “আমরি হাসপাতালে আগুন লেগেছিল, অর্ধেককে আমরাই বাঁচিয়েছি,” বলছিলেন পঞ্চাননতলার মেয়েরা। কানে হেডফোন-গোঁজা দু’তিন জন বেয়াক্কেলকে ওঁরা ট্রেন থেকে বাঁচান প্রতি মাসে। শিশু-বৃদ্ধদের ‘নিজের মনে-করা’ রিকশাকাকু, আয়ামাসিরা তো আছেনই।

“অবৈধ বস্তিকে আইনশৃঙ্খলার সমস্যা বলে না দেখে জমি-বাড়ির বাজারের ব্যর্থতা বলে দেখা উচিত,” বলেন অর্থনীতিবিদ মহালয়া চট্টোপাধ্যায়। “আমাদের দরকার এই মানুষদের, অথচ এঁদের দরকারটা নগর পরিকল্পনায় কখনও ধরি না আমরা। এঁদের সম্পূর্ণ কর্মক্ষমতা, মেধা, দক্ষতা আমরা নিচ্ছি, কিন্তু প্রতিদানে দিচ্ছি না বৈধ আবাস। উচ্ছেদের আইনি পদক্ষেপে এই অন্যায়টা রয়ে যায়।” ২০১১ সালের জনগণনা এ-ও দেখিয়েছে যে কলকাতার বস্তির ঘরগুলিতে নানা পণ্যের উৎপাদনের কাজ হয়। অতএব এগুলি কেবল আবাসই নয়, কর্মস্থলও বটে, জানালেন মহালয়া।

একটা বয়ান তৈরি হচ্ছে যে এঁরা গরিব নন মোটেই, দেশ-গ্রামে বাড়িঘর, জমিজিরেত আছে। ঘরে ঘরে ফ্রিজ, টিভি। “রিপোর্টাররা এসে আমার বাড়ির ফ্রিজের ছবি তুলে নিয়ে গেল,” বললেন বাবুবাগানের সবিতা হালদার। “ফ্রিজটা কাজের বাড়ি ফেলে দিচ্ছিল, দু’হাজার টাকায় দিল, মাসে মাসে টাকা কেটে নিয়েছে।” একটা ফ্রিজ আবার চার-পাঁচ ঘর লোক দখল করে। “কিছু না পেলে এক বোতল জল রেখে যায়, ঠান্ডা জল খাবে।” মহিলা সমাজকর্মীদের একটি দল চটজলদি সমীক্ষা করেছে ৩২ পঞ্চাননতলা রোডের ৪৩টি পরিবারের মধ্যে। দেখা গিয়েছে, কুড়িটি পরিবারের বস্তির ঘর ছাড়া জমি-বাড়ি কিছু নেই, একুশটি পরিবারের সুভাষগ্রাম, পাথরপ্রতিমা, কি সোনারপুরে কয়েক কাঠা জমি রয়েছে। কেবল দু’টি পরিবারের রয়েছে পাকা বাড়ি-সহ জমি।

ধরা যাক, এটা গোটা ছবি নয়। চাইলে অনেকেই সুভাষগ্রাম, ক্যানিং, লক্ষ্মীকান্তপুরের বাড়িতে থাকতে পারেন। কেমন হবে সেই মেয়েদের জীবন? ভোর সাড়ে তিনটেয় উঠে মোটর ভ্যানে চেপে ট্রেন ধরা, বাড়ি ফেরা রাত দশটায়। রান্না করে শুতে যেতে মাঝরাত, ফের তিনটেয় শুরু দিন। পুরসভার কাছে যা আদালতের নোটিস, এঁদের কাছে তা মুক্ত কারাগারে যাবজ্জীবনের রায়। হাউজ়িং অ্যান্ড ল্যান্ড রাইটস নেটওয়ার্ক-এর সমীক্ষা দেখাচ্ছে, সরকারি উচ্ছেদে ২০১৯ সালে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ২২ জন গৃহহীন হয়েছেন, ২০২৩ সালে ঘণ্টায় ৫৪ জন। কোথায় থাকছেন এঁরা? কেমন থাকছেন?

ব্রিজের তলার বাসিন্দারা থাকতে চান তাঁদের কর্মস্থলের কাছাকাছি। কয়েকজন আশেপাশে ভাড়া ঘরের খোঁজও করেছেন— মাসে আট-দশ হাজার টাকার কমে ঘর মিলছে না। আগাম দু’মাসের সেলামি, দালালকে এক মাসের ভাড়ার টাকা ধরাতে হবে। স্বামী-স্ত্রী আর একটি সন্তান, এমন পরিবার চাইছেন বাড়িওয়ালারা। “শ্বশুর-শাশুড়িকে কি ফেলে দেব?” প্রশ্ন মেয়েদের। প্রশ্ন আরও আছে। কোনও পার্টি কিংবা ইউনিয়নকে সত্তর হাজার টাকা কি এক লক্ষ টাকা দিয়ে যাঁরা কিনেছেন টোটোর লাইন (লাইনে দাঁড়ানোর অনুমতি), অন্যত্র গেলে তাঁরা কি সে টাকা ফেরত পাবেন? না। নয়া ঠিকানায় টোটো, রিকশা রাখতে পারবেন? না। হারাবে কাজ, উঠবে ব্যবসা, ছেলেমেয়েদের পড়ায় ছেদ পড়বে। রোজগার কমবে, খরচ বাড়বে, পরিশোধ না হওয়া ঋণ চলে যাবে সাধ্যের বাইরে। এই হল বৈধতার দাম। পরিচ্ছন্নতার মূল্য। উন্নয়নের মানচিত্র।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Eviction West Bengal government Society

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy