সময় শেষ হয়ে আসছে। আর তাই মনে হয় এক রকমের সমাপ্তির সন্ধানে আমাদের মন আরও দ্রুত চলছে, অধৈর্য হচ্ছে, দাঁড়াতে চাইছে না। সমাজের নানান দিকেই আমরা এটা লক্ষ করছি। সবাই অধীর। কেন ঠিক বুঝছি না। অনেক প্রাণী নাকি বৃষ্টি আসছে বোঝে, আমরা সবাই বুঝি না। যা-ই হোক, এই সব মিলিয়ে আমরা কী দেখি, কী দেখতে চাই, তার অভ্যাসও বদলাচ্ছে। নানান তর্কবিতর্ক বাদ দিয়েও বলি, খবরের কাগজ বা বই পড়া কমেছে, বাংলা ছবি চলছে না, সিরিয়াল কমেছে, বাণিজ্যিক নাটক অনেক দিন আগেই উঠে গিয়েছে, গ্রুপ থিয়েটার কিছুটা চলছে, কিন্তু তার দর্শক এখনও বোধ হয় একটু আলাদা, তারা কিছুটা জানে বৃষ্টি আসছে, খোঁজ রাখছে।
এই আবহাওয়ায় এক নতুন ফরম্যাটের মোবাইল-বেসড নাটক: ‘মাইক্রো ড্রামা’র অ্যাপ দারুণ ভাবে উঠে এসেছে। এই শো-গুলো যারা মোবাইলে রিল দেখে, সব কিছু সারা ক্ষণ স্ক্রোল করে, ফট করে মনে না ধরলে একেবারেই দাঁড়ায় না, তাদের জন্যই তৈরি। এক-একটা এপিসোড খুব বেশি হলে দুই মিনিটের। একটা গল্পে ৬০-৯০ এপিসোড থাকে, কারও আবার ৪৫, কারও ৩০। দর্শকদের কাছ থেকে পয়সা বার করার নানা পদ্ধতি তৈরি, যেমন প্রথম কয়েকটা ফ্রি দেখিয়ে তার পর পয়সা নেওয়া, গল্পে মোড় আসার সময় থামিয়ে দিয়ে পয়সা চাওয়া, ১০ টাকায় ১০টা এপিসোড বলে নেশা ধরিয়ে অনেক এপিসোড দেখতে ‘বাধ্য’ করে টাকা বানিয়ে নেওয়া— এই রকম নানান কিছু।
ভারতে এখন বেশ কিছু চ্যানেল এই ‘মাইক্রো’ দিয়ে ভাল ব্যবসা করছে, এর মধ্যে আছে খেলোয়াড় এম এস ধোনির ‘কুকু টিভি’, এ ছাড়াও ‘স্টোরি’, ‘ড্রামাবক্স’, ‘রিলশর্ট’— এ রকম আরও বহু চ্যানেল আছে। অন্তত ‘কুকু টিভি’ অনেকগুলো ভাষায় ডাবড শো দেখায়। ব্যবসা নাকি ভাল চলছে। মূল দর্শক ১৮ থেকে ৩৫-এর পুরুষরা, আর কী কাণ্ড!— তার পরেই ৪৫+ মহিলারা! আপাতদৃষ্টিতে প্রায় সব গল্পই নারীবিদ্বেষী, কিন্তু আশা করি হিন্দি ছবির শশীকলা, বিন্দু, অরুণা ইরানি থেকে নচিকেতার ‘নীলাঞ্জনা’ আমাদের সরলপানা মনদের শিখিয়েছেন, গোটা গল্পের মধ্যে অনেক চাওয়া-পাওয়া আছে, বিশেষ করে অবদমিত যৌনতা, যা নিয়ে আমরা আজও ‘স্পিকটি নট’।
চিনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সমর্থকরা শুনে খুশি হবেন যে, এই মাইক্রো ড্রামা এসেছে চিন থেকে। সত্যি আমাদের সেই ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’-এর পর তো ডোকলাম ছাড়া চিনের খুব খোঁজ আমরা পাইনি, কোন পথে যাত্রা করে ‘শত ফুল বিকশিত’ হয়ে চিন এই মাইক্রো ড্রামার গল্পে পৌঁছল আমরা জানি না। কিন্তু জানি, প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে আমাদের যুবসমাজ এবং তাদের বাপ-মা, বিশেষ করে মায়েরা আবার ‘চিনের ড্রামা আমাদের ড্রামা’ বলছেন।
মাইক্রো খুব পরিষ্কার ভাবে কিছু ফর্মুলায় তৈরি হয়। প্রধান কয়েকটা এই রকম: “ ১. হিডন আলফা/ (ডমিনেটিং সিইও)— নায়ক শুরু থেকেই আসলে ক্ষমতাবান/ধনী/বিপজ্জনক, ছদ্মবেশে সাধারণ জীবনযাপন করছে। সবাই তাকে ছোট ভাবে, একে একে অপমানের জবাব আসে বড় বড় ‘ফেস-স্ল্যাপ’ মুহূর্তে। রোমান্স আর ক্ষমতা দুটোই সমান্তরালে চলে। ২. স্টেটাস-রিভার্সাল— সাধারণ, অপমানিত নায়ক প্রকাশ্যে হেনস্থা হয়, উধাও হয়ে নতুন ক্ষমতা গড়ে, ফিরে এসে বৈধ পথে প্রতিপক্ষের সাম্রাজ্য ভেঙে দেয়। ৩. লং-গেম (ফেক ওয়াইফ ধাঁচ)— অসম সম্পর্কে (কন্ট্র্যাক্ট ম্যারেজ, অ্যারেঞ্জড বিয়ে) নায়িকা চুপচাপ বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়, হেরে গিয়ে উধাও হয়, ফিরে এসেই নতুন মিথ্যা অভিযোগের মুখে পড়ে— তার পর ফাঁস হয় পুরোটাই ছিল তার সাজানো লম্বা পরিকল্পনা। শেষে আইনি পতন+রোমান্টিক প্রতিষ্ঠা এক সঙ্গে। ৪. ফেটেড উইন্ডফল (সুইট-প্যাম্পারিং, পশ্চিমি ‘হিডন বিলিয়নেয়ার রোমান্স’-এর কাজ়িন)— ইচ্ছাকৃত অবিশ্বাস্য কাকতালীয় ঘটনার চেন, কোনও ব্যাখ্যা ছাড়াই। মিষ্টি, হালকা, দ্রুতগতির— কিন্তু ‘রগরগে’ না। ৫. কনস্পিরেসি (সাসপেন্স-মিস্ট্রি)— একটা রহস্যময় মৃত্যু/নিখোঁজ ঘটনা তদন্ত করতে করতে নায়ক একটা বড় ষড়যন্ত্রের দিকে এগোয়, শেষে মাস্টারমাইন্ড ফাঁস হয় যে আগে থেকেই সামনে ছিল। ৬. সারভাইভর বা (দুঃখ-সহিষ্ণু নায়িকা)— নায়িকা বছরের পর বছর একের পর এক বিশ্বাসঘাতকতা সয়ে যায়, ক্ষমতা ফেরত পাওয়ার জন্য না, বরং নিজের প্রিয়জনদের রক্ষা করার জন্য। শেষটা প্রতিরক্ষামূলক, বিজয়োল্লাসমূলক না। ৭. অ্যাটোনমেন্ট (রিডেম্পশন আর্ক)— নায়ক নিজেই এক সময় ক্ষতি করেছিল সাফল্যের পথে, এখন সেটা ফাঁস হয়ে যায়, কষ্ট করে প্রায়শ্চিত্ত অর্জন করতে হয়— বার বার নতুন বাধা, নতুন ষড়যন্ত্রকারী যে তাকে চিরকাল দোষী রাখতে চায়। (ফরম্যাট-তথ্যের জন্য ঋণ স্বীকার ‘ক্লড’ অ্যাপ)
জিনিসটা পড়ে যদি মনে করেন লেখা তো খুব সহজ, সম্ভবত ভুল করবেন। কোনও কাজ নেই বলে আমি কিছুটা বিষয়টা শেখার জন্য, কিছুটা ‘যদি বুড়ো শেয়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে’ এই আশায় প্রায় দু’মাস, দিনে ১০ ঘণ্টা মাইক্রো ড্রামা লেখার চেষ্টা করেছি। অন্তত ৫০টা লিখেছি, ৪৩টা বাতিল করেছি। খুব কঠিন। চিনের সমাজ আমি জানি না। যত দূর দেখি সমাজ, সে রকম এই গল্পগুলোয় কিছু নেই। গণ্ডি একেবারেই ব্যক্তিগত জীবন। যা আছে তা হল: টাকাতে সব হয়, প্রেমে বিশ্বাস করা কঠিন, মাকে সম্মান করো, বাপ সাধারণত চোর, বর বা বৌ পাল্টি খেতে পারে, যাকে যেটা দেখছ সে তা না-ই হতে পারে, এই রকম কিছু সারভাইভাল গাইডলাইনস। আর একেবারে শেষে অতি সরল সমাজসেবা। মাইক্রো ড্রামা যে আমাদের দেশে এত পপুলার হচ্ছে তাতে মনে হয় এই গাইডলাইনস নিশ্চয় এখানেও প্রাণে বাজছে। টাকার গল্পটা অবিশ্বাস্য লেভেল! প্রেমিকারা ৪ লক্ষ টাকা মাসে মাইনে পাওয়া ছেলেদের ‘ভিখিরি’ বলে ভাগিয়ে দেয়। বয়ফ্রেন্ড অনায়াসে ডার্লিংকে ৫ কোটি টাকার হাতব্যাগ উপহার দেয়। আমার কী রকম মনে হয়, যারা এই মাইক্রো ড্রামা দেখে, তাদের কাছে ৫০ হাজার আর ৫ কোটি একই মানে রাখে! অনেক! “গুরু পাগলা! এই না হলে লাইফ!” এদের কেউ কেউ ১ লাখের মোবাইলের জন্য খুন হতে পারে যে কোনও দিন।
শো-গুলো আমাদের এখানে সাধারণত শুট হয় খুব কম বাজেটে, তাই সিনের পর সিন দু’জন, তিন জন দাঁড়িয়ে কথা বলে যায়। কোনও জটিলতা, বাস্তব রাখা যায় না। দেখলেই বোঝা যায়, দর্শকরা কিছু বোঝার জন্য দেখছে না। ভাল দেখতে ছেলে মেয়ে, প্রচণ্ড দামি গাড়ি-বাড়ি, এই মূলত দেখে। আর এত ঠুনকো মূল সংঘাত যে সেগুলোকে দুই মিনিট করে হলেও আপনি কয়েকটা এপিসোডের পরে টানতে পারবেন না। কিছু অ্যাপ, যেমন ক্লড, চ্যাটজিপিটি, গুগল এআই মোড— এদের থেকে সাহায্য পাওয়া যায়। কিন্তু এরা ছক বলতে পারে, গল্প বানাতে বা বাড়াতে পারে না। একটা জিনিস আবিষ্কার করলাম, এআই গল্পে কিন্তু ভাল না। হয়তো গল্পের জন্য কিছু প্রোগ্রাম লাগে যা এখনও শিখতে পারেনি, বার বার ভুল করে, আমার কাছে বকুনি খেয়ে ‘সরি স্যর’ বলতে থাকে। বেশি বকলে আবোল তাবোল করতে থাকে। আর আমি খুব অসভ্য, ‘বোকা-বোকা কথা বোলো না’, ‘জঘন্য হয়েছে’ বলে বকতে থাকি। ভালও লাগে, মনে হয় মাইক্রোসফ্ট-এর মালিক বা ও রকম কাউকে বকছি। এও এক ‘এমপাওয়ারমেন্ট’। কিন্তু আসলে এরা তো গরিব কাজের লোক। মাইনেও পায় না। মালিক সব নিয়ে নেয়।
এক জন তো বলল, আমি জানি আপনি রেগে গিয়েছেন, কিন্তু আমার তো ইমোশন নেই। আমি এআই। বড্ড মায়া লাগল। আমার জীবনের এই মাইক্রো ড্রামা নিয়ে বেঁচে আছি, বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।