মাসখানেক আগে আইআইটি বম্বের এক পড়ুয়ার আত্মহত্যার ঘটনা তোলপাড় ফেলেছিল দেশ জুড়ে। দেশের প্রযুক্তি পাঠের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানে এক জন পড়ুয়ার মৃত্যু সামনে নিয়ে এসেছে বহু সংবেদনশীল বিষয়কে। ফলে সঙ্গত কারণেই প্রতিষ্ঠানের ভিতরের পঠনপাঠন, গবেষণা থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বহু খুঁটিনাটি বিষয় উঠে এসেছে আতশকাচের তলায়।
দেশের প্রযুক্তি পাঠের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হিসাবে চিহ্নিত করা হয় আইআইটিগুলিকে। এখানে ভর্তি প্রক্রিয়ায় দ্বিস্তরীয় ছাঁকনির প্রবেশিকা জয়েন্ট এন্ট্র্যান্স মেন এবং জয়েন্ট এন্ট্র্যান্স অ্যাডভান্স-এর পাঁচিল টপকানো বেশ কঠিন। ফলে প্রতি বছর দেশের ২৩টি আইআইটির প্রায় ১৮,০০০ স্নাতক স্তরের আসনে ভর্তি পরীক্ষায় বসে প্রায় পনেরো লক্ষ ছাত্রছাত্রী। এমন ইঁদুর দৌড়ের প্রবেশিকায় সফল হওয়ার পরেও যখন কিছু পড়ুয়া সেই প্রতিষ্ঠানের চার দেওয়ালের মধ্যে লেখাপড়া করতে গিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, তখন সমাজে সেই মৃত্যু নিয়ে বেশি আলোড়ন তৈরি হওয়াই প্রত্যাশিত। আইআইটিগুলিতে এমন ছাত্রমৃত্যু বিরল কিংবা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং গত দুই দশকে এমন মৃত্যুমিছিল লেগেই রয়েছে দেশের বিভিন্ন আইআইটিতে। প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তনীদের একটি সংগঠনের হিসাবে, ২০০৬ থেকে ২০২৬ অবধি দেশের আইআইটিগুলিতে পড়ুয়াদের আত্মহত্যার সংখ্যা ঘটেছে ১৭১টি, যার মধ্যে গত দশ বছরে ঘটেছে ১২০টি ঘটনা। আর চলতি বছরেই আইআইটিগুলিতে এই নিয়ে ১৩ জন পড়ুয়ার আত্মহত্যার ঘটনা ঘটল।
ফলে, দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানগুলির ক্যাম্পাসে প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা, পড়ুয়াদের অত্যধিক মানসিক চাপ বা সামাজিক বৈষম্যের বিষয়গুলি সঙ্গত কারণেই উঠে আসছে আলোচনায়। প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পড়ুয়াদের আত্মহত্যার অন্যতম কারণ হিসাবে উঠে আসে লেখাপড়ার চাপ সইতে না পেরে মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে ওঠা, যেটা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এক অশনিসঙ্কেতও বটে। কারণ, এই আইআইটিগুলিতে ভর্তির ইঁদুর দৌড়ে কচিকাঁচা পড়ুয়াদের জীবনের সিংহভাগ কেটে যায় দেশের বিভিন্ন শহরে গজিয়ে ওঠা ‘কোচিং ফ্যাক্টরি’তে। সেখানে নাওয়া-খাওয়া ভুলে পরীক্ষায় সাফল্য অর্জনের কৌশল শিখে যেতে হয়। দেশের আনাচ-কানাচ থেকে জড়ো হওয়া বিভিন্ন স্কুলের মেধাবী পড়ুয়াদের ওই কোচিং-নির্ভর শিক্ষায় দীক্ষিত করা হয়— শেখানো হয় যে, জীবনের মোক্ষলাভ হল কেবল প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন।
এমন ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যের পাড়ার সেরা পড়ুয়ার দল যখন প্রবেশিকার কঠিন বাধা টপকে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে হাজির হয়, তখন সেখানে সেরাদের ভিড়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়। আবার শুরু হয় নতুন করে ‘সেরার সেরা’দের ইঁদুর দৌড়। শুরু হয় নতুন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে খাপ খাওয়ানোর নতুন চ্যালেঞ্জ। সেই চাপের মুখে যারা উতরে যায়, তারা শ্রেষ্ঠত্বের হাসি হেসে ক্যাম্পাস ছাড়ে। আর যারা হেরে যায়, তাদের কেউ কেউ কোর্সের মাঝপথেই আত্মহননের পথ বেছে নেয়।
সাফল্যের চড়াইয়ের পথ পেরোতে গিয়ে যদি পা পিছলে কেউ থমকে দাঁড়ায়, তার কি আর বাঁচার কোনও উপায় থাকবে না এই প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে? পড়ুয়াদের জীবনে সাফল্য থেকে ব্যর্থতা পর্যায়ক্রমে হাজির হতেই পারে। কিন্তু সাফল্যকে যে ভাবে সমাজ কিংবা প্রতিষ্ঠান বরণ করে, ব্যর্থতার ক্ষেত্রে সহনশীলতার শিক্ষার অভাব রয়েছে বলেই কি মানসিক বিষাদ এক জন পড়ুয়াকে দ্রুত এই চরম পরিণতির পথে নিয়ে যায়? প্রতিষ্ঠানের অচেনা পরিবেশে তৈরি হওয়া লেখাপড়ার চাপের সঙ্গে আনুষঙ্গিক আরও চাপ জুড়ে গিয়ে বৃহত্তর অবসাদের বৃত্তে ঢুকে পড়ে এক দল হতভাগ্য পড়ুয়া।
আইআইটিগুলিতে সিংহভাগ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে পরীক্ষা কিংবা ফল প্রকাশের সময় এবং প্লেসমেন্ট চলাকালীন। যার অর্থ স্পষ্ট যে, পরীক্ষায় খারাপ ফল বা ভাল চাকরি পেতে ব্যর্থ হয়েই মানসিক অবসাদের পরিণতি ঘটছে আত্মহননের মধ্য দিয়ে। এখানেই বড় প্রশ্ন যে, দেশের প্রথম সারির উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে পড়ুয়াদের শৃঙ্খলা নিয়মানুবর্তিতার সঙ্গে প্রশাসনিক সংবেদনশীলতার কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য ব্যাহত হচ্ছে কেন বার বার? আইআইটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলিতে যে-হেতু মূলত শিক্ষকেরাই বহু প্রশাসনিক দায়িত্বে যুক্ত থাকেন, তাই তাঁদের আরও বেশি সংবেদনশীল হতে হবে। কারণ মনে রাখতে হবে যে, প্রতিষ্ঠানের ভিতরে মানসিক চাপ তৈরির অন্যতম ভরকেন্দ্র ক্লাসরুম থেকে ল্যাবরেটরি, কিংবা পরীক্ষার হল কিংবা ফল থেকে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ। ফলে তখন এর যাবতীয় দায়দায়িত্ব কেবল এক জন পড়ুয়ার নয়। তার সঙ্গে জুড়ে থাকে সামগ্রিক ভাবে প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিও।
ফলে প্রতিষ্ঠানের চার দেওয়ালের মধ্যে ‘সাফল্যের ভয়’ দূর করার পরিবেশ গড়তে হলে শিক্ষক থেকে প্রশাসন, সর্বস্তরেই সংবেদনশীলতার প্রয়োজন। অন্যথায় নানা ঘটনায় পড়ুয়াদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির হালহকিকত অধরা থেকে যাবে। অথচ, কেবলমাত্র গুটিকয়েক কাউন্সেলর-নির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে আজকের দিনে এই ভয়মুক্ত কিংবা চাপমুক্ত প্রতিষ্ঠান তৈরি করা কার্যত অসম্ভব।
আইআইটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলির কৌলীন্য বজায় রাখতে এখন এক কর্পোরেট ধাঁচের অভিজাত ও পেশাদার সংস্কৃতি তৈরির চেষ্টা চলছে। ফলে সেই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের মাপকাঠিতে গবেষণাপত্র, গবেষণা প্রকল্প, দেশি-বিদেশি অনুদানের পরিমাণ বা ভাল চাকরি প্রাপ্তির খতিয়ানগুলি বিবেচিত হলেও পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ জীবনে চাপ-তাপের উপযুক্ত সহনশীলতার চর্চা হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানের অন্দরে। ‘জলকে যে পাত্রে রাখো, সেই পাত্রের আকার ধারণ করবে’— এই ধারণার বশবর্তী হয়ে পড়ুয়াদের শুরু থেকেই প্রবল চাপে ফেলে এক ধাঁচের পেশাদার তৈরির কারখানা হয়ে উঠছে দেশের এমন বহু উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
দেশের বিভিন্ন আইআইটিতে ভাষা ধর্ম বর্ণের ভিন্নতা নিয়েই ভর্তি হয় হাজার হাজার পড়ুয়া। ফলে আর্থ-সামাজিক ভিন্নতা নিয়ে বেড়ে ওঠা একদল পড়ুয়া যখন এক ছাতার তলায় চলে আসেপ্রযুক্তির পেশাদার হতে, তখন তাদের বৌদ্ধিক মেধার পাশাপাশি তাদের সাংস্কৃতিক ভিন্নতার সহাবস্থান ঘটে প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। সেই সহাবস্থান এক দিকে যেমন পড়ুয়াদের বৃহত্তর জগৎ চিনতে শেখায়, তেমনই সেই বৃহত্তর জগতের মধ্যে কৃষ্ণগহ্বর হয়ে লুকিয়ে থাকা সমাজের অসুখকেও সামনে নিয়ে আসে।
দেখা গেছে, গত দুই দশকে আত্মহত্যা করা পড়ুয়াদের সিংহভাগ ছিল সামাজিক ভাবে প্রান্তিক পরিবার থেকে আসা। এ বারের আইআইটি বম্বের ঘটনায় মৃত পড়ুয়ার পরিবার ইতিমধ্যে পরীক্ষার হলে উপস্থিত শিক্ষকের বিরুদ্ধে জাতিগত নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছেন। বৃহত্তর ক্ষেত্রেও অভিযোগ যে, আইআইটির মতো কুলীন প্রতিষ্ঠানের ভিতরে মেধার শ্রেষ্ঠত্বের দৌড়ে নিচু বনাম উঁচু জাতের ভেদরেখা কেবল পড়ুয়াদের মধ্যে নয়, এমনকি সেই রোগ একাংশের শিক্ষকদের মধ্যেও সংক্রমিত হয়ে চলেছে। এই একবিংশ শতাব্দীর ‘ডিজিটাল’ যুগেও এমন অভিজাত প্রতিষ্ঠানের অন্দরে জাতের চালুনি দিয়ে মানুষ খুঁজে বার করার প্রচ্ছন্ন ঝোঁক কাজ করে। প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে জাত, ধর্ম, বর্ণভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজন কিংবা নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিতে না পারলে ওই সামাজিক অসুখ চোরাস্রোতের মতো গ্রাস করে নেয় হস্টেল থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ভবন সর্বত্র।
তথ্যের অধিকার আইনে সম্প্রতি পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে যে, আইআইটি বম্বেতে গত ন’বছরে পাঁচটি বিভাগে কোনও তফসিলি জনজাতিভুক্ত পড়ুয়া ভর্তি হতে পারেনি। সামাজিক ভাবে প্রান্তিক অংশের পড়ুয়া ভর্তি থেকে শিক্ষক নিয়োগ প্রতিটি ক্ষেত্রেই করুণ অবস্থা বেরিয়ে আসছে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই এই পড়ুয়া মৃত্যুর অভিযোগে উঠে আসা বহুমাত্রিক অভিযোগের বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত জরুরি। দেশের একটা প্রথম শ্রেণির উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্যতম লক্ষ্য কেবল পড়ুয়াদের সাফল্যের পথ বাতলানো নয়। বরং প্রতিষ্ঠানের অন্দরে ‘সত্যেরে লও সহজে’ বার্তার শিক্ষা প্রসার জরুরি।
ব্যর্থতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর শক্তি অর্জনের চর্চা কিংবা ঘুরে দাঁড়ানোর পথের খোঁজ করা প্রয়োজন। তবেই তো শ্রেষ্ঠত্বের পথ চলা। জীবনের কোনও রাউন্ডে হেরে যাওয়া মানে জেতার লড়াই যে শুরু করা যায় সেখান থেকেই, সে ভাবেই পড়ুয়া থেকে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ থেকে প্রশাসনিক ভাবনার পুনর্বিন্যাস দরকার আজ। দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জীবনের স্বার্থেই।
নির্মাণপ্রযুক্তি বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়