ছোট্ট মেয়েটির সাদামাঠা আবদার ছিল, ‘ও মাগো মা, অন্য কিছু গল্পো বলো/ এক যে ছিল রাজারানি, অনেক হল’। সলিল চৌধুরীর সে গানে মোদ্দা কথা— অধিকাংশ গানের বাণী সময়কে ধরতে পারছে না, সময়ের গানও হয়ে উঠছে না। চলার বলার ছন্দে প্রতি মুহূর্তে পাল্টে যাওয়া আজকের পৃথিবীর শিশুরা ছেলে-ভুলানো রাজা-রানির গল্প শুনবে কেন? প্রশ্ন ওঠে, আধুনিক বাংলা গানের আধুনিকতা শুধু কি সুরের? কথার নয়? কথাই তো আগে। তাই ‘মানুষ মানুষের জন্যে’, ‘অবাক পৃথিবী অবাক করলে তুমি’, এমনকি ‘মুক্তির মন্দিরসোপানতলে’ পুরাতন হয়েও অক্ষয় অব্যয়, বাণীর গৌরবেই। অন্নদাশঙ্কর রায়ের অমল কবিতা ‘বিজলীর ধারা এই, এই আছে এই নেই/ এর চেয়ে মোমবাতি ভালো/ জ্বালো জ্বালো হ্যারিকেন জ্বালো’ গানের অবয়বেও সময়ের প্রহরী।
প্রতুল মুখোপাধ্যায়ও তাঁর গান বেঁধেছেন আগামী পৃথিবীর জন্য, সে সব গানে বার্তা সর্বকালের। সলিল চৌধুরী সবিতা চৌধুরীকে দিয়ে সেই কবে গাইয়েছেন, আজও প্রাসঙ্গিক যা: ‘এ দেশের মেয়ের কথা জানেন অন্তর্যামী/ শুধু সন্তানের বোঝা, সব বুঝে কিছু না বোঝা/ যা কিছু হোক মাথায় আছেন পরম গুরু স্বামী’। বরিশালের যজ্ঞেশ্বর (চারণকবি মুকুন্দদাস) গানে যে প্রতিজ্ঞার কথা বলেছিলেন, আজও আছে তার অনুরণন, ‘দেখাতে হবে আজি জগৎবাসী সবে, এখনও ভারতের যায়নি রে চেতনা’। তাঁর সময়ের থেকে শতবর্ষ এগিয়ে এ গান, জনপ্রিয়তাই তার প্রমাণ। এমনকি মিন্টু দাশগুপ্তও সমাজমনস্ক প্যারডিতে শুনিয়েছিলেন প্রেমের সরস পাঠ, ‘গুল সবই গুল/ তোমার চিঠির পাতায় পাতায় যা লেখা সে গুল’। চিঠির প্রেমের পূর্বাপর কয়েক যুগ ধরা সেই রঙ্গগানে। কালজয়ী বলেই না মোহিনী চৌধুরীর ‘পৃথিবী আমারে চায়’ শব্দগুচ্ছ সামান্য রূপ পাল্টে অনায়াসে হয়ে গিয়েছিলো ‘চাঁদ ফুল জোছনার গান আর নয়/ ওগো প্ৰিয় মোর, খোলো বাহুডোর/ পৃথিবী তোমারে যে চায়’। এই সব গানের তারারা যত আলোকবর্ষ দূরেই থাকুক না কেন, ব্যাপ্তিতে প্রতি মুহূর্তে প্রাসঙ্গিক।
কিন্তু ছোট্ট মেয়েটির অনুযোগ অন্য কারণে। রাজা-রানি সে দেখেনি, ঠাকুরমার ঝুলি-র পরিবেশে সে মানুষ হয়নি। ছোটদের গল্পগাথায় এখন বড় ভূমিকা বিজ্ঞানের। কমিক্স ছেয়ে আছে রোমহর্ষক অতিরঞ্জনে। ছোটদের বাংলা গানে তার স্পর্শ থাকবে না? গান-ই তো নেই। আগে ছোটদের জন্য সনৎ সিংহ, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়রা ছিলেন। বড়দের গানে সে দৈন্য বেশি। কারণ দেখিয়েই রামকুমার চট্টোপাধ্যায় নাকচ করে দিয়েছিলেন ১৯৪৪-এ প্রকাশিত প্রণব রায় কমল দাশগুপ্ত জগন্ময় মিত্র-ত্রয়ীর ‘তুমি কি এখন, দেখিছ স্বপন/ আমারে আমারে’-র সঞ্চারী, যেখানে আছে: ‘খোলা এলো চুল, মুখের দুপাশে সরায়ে/ তুমি ঘুমায়ে আছো কি?’ কী কারণ? “না না, খোলা এলো চুল আজকাল মেয়েরা আর রাখে নাকি? কেটে ফেলেছে বাপু। তাই এ গান আর চলবে না,” বলে চোখ টিপলেও ওঁর মন্তব্যটি কিন্তু একেবারে ফেলনা নয়।
হারানো সুর ‘সিনিয়র সিটিজ়েন’দের প্রাণের আরাম, এ কালের শ্রোতারাও দিব্যি শোনেন। কিন্তু ‘দু’শো বছরের নিঠুর শাসনে গড়া যে পাষাণবেদি’ বা ‘সেই সাগরবেলায় ঝিনুক খোঁটার ছলে গান গেয়ে পরিচয়’ জাতীয় বাক্যবন্ধে সমকাল কী ভাবে নিজেকে মানিয়ে নেবে? ‘সেই শপথের মালা খুলে/ আমায় গেছ যে ভুলে’— আজকের প্রেম-বিবাহের নিত্য ছাড়াছাড়ি-আবহে আদৌ কোনও জায়গা পাবে কি? এই শ্রবণ মহান ইতিহাস। কিন্তু তার পরে কী চলছে? ‘তুমি কোথায়, আমি হেথায়’, ‘মন মানে না, মানে না’-য় কিছু আবোল তাবোল সময় গেছে। রবীন্দ্রনাথের গান আর লোকসঙ্গীতকে কে কী ভাবে ‘এডিট’ করে গাইছেন, আজকের গানের স্মার্টনেস সেখানেই থমকে। আর আছে সুফি গজল বা মধ্যযুগীয় কতিপয় সঙ্গীতধারায় এলোপাথাড়ি কিছু শব্দ-সমাবেশ। সময়ের গান কি এর অপেক্ষাতেই ছিল? ব্যান্ডের গানে কিছু সারবত্তা নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু রূপম ইসলামের পরে কোথায় গেল একক কণ্ঠগুলি, যাঁরা পালাবদলের হাতিয়ার হবেন!
সংখ্যায় অল্প, কাজ কিন্তু হচ্ছে। কাজী কামাল নাসেরের ‘একটা কালো মানুষ মরল বলে আমেরিকায় আগুন জ্বলে’ নিশ্চয়ই খুব তাড়াতাড়ি ভোলা যাবে না। অতিমারি-আবহে পরিযায়ী শ্রমিকের ঘরে ফেরার মর্মন্তুদ আখ্যান নিয়ে লোকসুরে সে-গান বেঁধেছেন শিল্পী। আর জি কর কাণ্ডের প্রেক্ষিতে অর্ণা শীল ও শান্তনু মৈত্রের যৌথ নির্মাণ ‘তুমি বন্ধু আজ শুনবে’ মঞ্চে শুনিয়ে শ্রেয়া ঘোষাল জানাতে পেরেছিলেন, সাধারণের পায়ের তলার মাটি কতটা অশক্ত ও ভঙ্গুর। ‘খুড়োর কলেতে জানি সামনে গাজর ঝোলে/ আমাদের দেশ চলে সেই একই কৌশলে’, এমন বহু সুরশোভন কথামুখ সৌমিক দাসের গানের পালে আনছে অন্য হাওয়া। এ স্লোগান হলে স্লোগান, গান ভাবলে গান।
আজকাল যেমন খুশি কথা ও সুর এআই-এর কল্যাণে নামমাত্র দক্ষিণায় কণ্ঠসৌকর্যে দক্ষ আউটপুট হয়ে বেরিয়ে আসছে। তাতেই মাথা ঘুরে গেছে সকলের। গানবাজনার কি কিছু বাকি রইল? ‘কপি’-কণ্ঠে ‘চুপকে চুপকে’-র জাল সংস্করণ বেরোনোর পরে গুলাম আলি বলেছিলেন, আমার ঘরানাকে কে জাল করবে? এ-ই হল বলভরসা ফিরে পাওয়ার উচ্চারণ। সেই ভরসায় বুক বেঁধে শ্রোতারা চান সেই অযান্ত্রিক বুদ্ধিদীপ্ত মেলোডি, যা প্রতি দিনের চলার কথা বলবে গলা খুলে।