E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

রাত, তুমি কার

সীমন্তিনী গুপ্ত

শেষ আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:১৮

১৯০৫ সালে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন লিখেছিলেন সুলতানার স্বপ্ন। তাঁর কল্পনার ‘লেডিল্যান্ড’-এ মেয়েরা নিশ্চিন্তে বাইরে বেরোয়, আর পুরুষেরা থাকে ঘরের ভিতরে। রোকেয়ার সেই উল্টে দেওয়া পৃথিবী ছিল সমাজের গালে এক সপাট থাপ্পড়। রোকেয়া প্রশ্ন করেছিলেন, যে সমাজ নিরাপত্তার অজুহাতে মেয়েদের ঘরে আটকে রাখে, সেখানে সম্ভাব্য অপরাধীকে নিয়ন্ত্রণ না করে সম্ভাব্য শিকারকে কেন বন্দি রাখা হবে?

একশো কুড়ি বছর পরেও প্রশ্নটি অস্বস্তিকর ভাবে প্রাসঙ্গিক।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ধর্ষণ ও যৌন হেনস্থার একের পর এক ঘটনা সামনে এলেই সমাজমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবাদ হয়। হ্যাশট্যাগ ছড়ায়। রাস্তায় নামে মেয়েরা। ছেলেরাও। মোমবাতি মিছিল করে, ‘রাস্তা দখল’ বা ‘রাত দখল’ করে সরবে জানানো হয়, রাস্তা শুধু পুরুষের নয়, রাতও শুধু পুরুষের নয়। শহরের কোনও জনপরিসর এমন হতে পারে না, যেখানে মেয়েদের উপস্থিতিকেই ঝুঁকি হিসাবে দেখা হবে।

জানি তো সে কথা। মানি কই! আমার মেয়ে উনিশ। দিল্লিতে থাকে। সে যখন বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের বাইরে যায়, শুধোই, কখন ফিরবে? কারা সঙ্গে আছে? সতর্ক করে দিই, ফোনে পুরো চার্জ আছে তো! বলি, লোকেশন অন রাখবে, পৌঁছে আমাকে জানাবে।

জীবনের একটা বড় অংশ ধরে নারীবাদী-বুলি-কপচানো আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয় আমার নিজের এই আচরণ। ভাবি, কেন এই সতর্কতা আমার মেয়ের স্বাধীন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে? নিজেকে প্রশ্ন করি, ‘ছেলের মা’ হলেও কি এ রকম করতাম? তার পরে নিজেকে ফের স্তোক দিই, আমি মা। আমি আমার মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হব, এটাই তো স্বাভাবিক।

তবু প্রশ্নগুলো পিছু ছাড়ে না। কেন মেয়েদের রাতের শহরে এত হিসাব করে চলতে হবে? কেন মেয়ের ফোনে লোকেশন অন থাকা নিশ্চিন্ত হওয়ার অন্যতম শর্ত? কেন একটি মেয়েকে স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করার আগে সম্ভাব্য বিপদের তালিকা মাথায় রাখতে হবে?

মেয়েদের আমরা ছোটবেলা থেকেই সাবধান হতে শেখাই। কোথায় যাবে, কখন ফিরবে, কার সঙ্গে যাবে, নির্জন রাস্তা এড়িয়ে চলবে— সতর্কতার এই তালিকা কখনও শেষ হয় না। কিন্তু ছেলেদের আমরা কি একই ভাবে শেখাই যে অন্যের শরীর, স্বাধীনতা এবং সম্মতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো তাদের দায়িত্ব?

মেয়েদের আমরা রাতে একা বেরোতে নিষেধ করি। ভাবি, সঙ্গে অন্তত একটা ছেলে থাকলে সে নিরাপদে থাকবে। ভুলে যাই, নির্ভয়ার সঙ্গে তার পুরুষ বন্ধুটিও ছিল। আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল মেয়েটিকে বাঁচাতে।

মেয়ে হিসাবে, মেয়ের মা হিসাবে, আমরা কি চাই যে হাজার গন্ডা এই বিধি-নিষেধকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিক আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম? তাদের কি বলতে চাই, “জেন-জ়ি প্রতিবাদ মিছিলে যাচ্ছ, যাও। কিন্তু সঙ্গে কেউ যাচ্ছে তো? দেখো বাবা, ফিরে এসো বেশি রাত হওয়ার আগে।” আমরা কি চাই, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এমন একটা পৃথিবীকে মেনে নিক, যেখানে মেয়েদের স্বাধীন ভাবে রাতে রাস্তায় হাঁটা ‘অতিরিক্ত’ স্বাধীনতা বলে বিবেচিত হবে। এই কারণেই রাত দখল বা রাস্তা দখলের মতো প্রতিবাদগুলি গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েরা কোনও বিশেষ সুবিধা চাইছে না। যে রাস্তা, যে পার্ক, যে বাস, যে মেট্রো, যে বিশ্ববিদ্যালয়, যে কর্মক্ষেত্র তাদেরও, সেটিই তারা নিজেদের বলে ফিরে পেতে চাইছে।

নিরাপত্তা অবশ্যই প্রয়োজন। রাস্তার আলো, সিসি ক্যামেরা, কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থা, নিরাপদ গণপরিবহণ, দ্রুত অভিযোগ নেওয়া এবং নিরপেক্ষ তদন্ত— সবই তার অংশ। দিল্লি ও আশপাশের এলাকায় বেড়ে চলা যৌন হেনস্থার পরে কয়েক দিন আগেই এই মন্তব্য করল দেশের শীর্ষ আদালত। কারণ, নিরাপত্তার নামে মেয়েদের চলাফেরা কমিয়ে দেওয়া নিরাপত্তার সমাধান হতে পারে না। নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা পরস্পর বিরুদ্ধ পদ নয়। বরং নিরাপদ জনপরিসরই স্বাধীন ভাবে চলাফেরার পূর্বশর্ত।

ধর্ষণ বা যৌন হেনস্থার ঘটনার পরে স্বাভাবিক ভাবেই কঠোর শাস্তির দাবি ওঠে। শাস্তি জরুরি। কিন্তু শুধু শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। না হলে তো এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট যোগী আদিত্যনাথের রাজ্য উত্তরপ্রদেশে মেয়েদের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার ঘটনা এমন লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে যেত না।

বরং এই প্রশ্নগুলি করা জরুরি। অভিযোগ জানানোর পরে নির্যাতিতার সঙ্গে কী আচরণ করা হচ্ছে? তদন্ত কতটা দ্রুত এবং কার্যকর? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার অভিযোগের ব্যবস্থা কতটা বিশ্বাসযোগ্য? অপরাধ প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা কতটা কার্যকর? সবাই কি মেনে নিচ্ছে যে ঘটনাটি সত্যিই হয়েছে, না কি কোনও ভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে?

আর এই জায়গাতেই নীরবতার প্রশ্নটি আসে।

২০২৪ সালে আমেরিকার নামজাদা কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ধর্ষণ ও যৌন হেনস্থা মামলা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক তরুণীর অভিযোগ, এক রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত জন ছাত্র তাকে যৌন নির্যাতন করে। শুধু তা-ই নয়, ঘটনাটির আগে বন্ধুদের গ্রুপ চ্যাট-এ তারা এ নিয়ে অনেক ক্ষণ ধরে কথাবার্তাও চালিয়েছিল। জনা পঞ্চাশেক বন্ধুকে সরাসরি প্রস্তাব দিয়েছিল— “মেয়েটি নেশায় আচ্ছন্ন, কে কে মজা লুটতে আসবি, অমুক ঘরে চলে আয়!” মেয়েটি অভিযোগ জানালেও ওই ছাত্রদের বিরুদ্ধে কোনও মামলা হয়নি, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তে কয়েক জন ছাত্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা করা হয়। দীর্ঘ টালবাহানার পরে দুষ্কৃতীদের এই লঘু শাস্তিতে তিতিবিরক্ত মেয়েটি এ বার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ এনে মামলা করেছে। ফলে ফের শুরু হয়েছে তদন্ত, তার সঙ্গে কাটাছেঁড়া, সেই রাত নিয়ে, এবং অবশ্যই মেয়েটিকে নিয়ে। প্রশ্ন উঠছে, নেশা করে তোমার ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা মারতে যাওয়া কেন বাপু! আচ্ছা, একটি ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে নেশা করলে এই প্রশ্নটা কি করতাম আমরা?

অস্বস্তি আরও বেড়ে যায়, যখন খেয়াল করে দেখি যে ‘ওই সাত জন কী করেছিল’র থেকেও অনেক বড় প্রশ্ন, গ্রুপ চ্যাটের বাকি ছেলেগুলো কী করছিল? চ্যাট হিস্ট্রি বলছে, তাদের মধ্যে কেউ প্রতিবাদ করেনি। কেউ কি ওই সাত জনকে থামাতে পারত না? কেউ কি সাহায্য চাইতে পারত না? কেউ কি পরে অন্তত বলতে পারত না— এটা ঠিক হয়নি।

যৌন হেনস্থার ক্ষেত্রে নীরবতা কখনওই নিরপেক্ষ অবস্থান নয়। কেউ সরাসরি অপরাধে যোগ না দিলেও, অপরাধের সাক্ষী হয়ে চুপ করে থাকা একটি বৃহত্তর সামাজিক সমস্যার অংশ। আর ‘বন্ধুকে বাঁচানো’, ‘বিষয়টি বাড়তে না দেওয়া’, ‘এটা আমাদের ব্যাপার’— এই মানসিকতা মেয়েটির যন্ত্রণা শত গুণ বাড়িয়ে দেয়।

আমরা মেয়েদের বলি, বিপদে পড়লে সাহায্য চাও। কিন্তু ছেলেদের ক’জন শেখাই— যদি দেখো একটি মেয়েকে কেউ হেনস্থা করছে, কী করবে? সেই ছেলেটি যদি তোমার খুব প্রিয় বন্ধু হয়, তা হলেই বা কী করবে। শুধু নিজে অপরাধ না-করাই যথেষ্ট নয়। অন্যায় দেখলে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক দায়িত্বও নাগরিক জীবনের অংশ।

তাই মেয়েদের শরীর, মেয়েদের নিরাপত্তা, মেয়েদের শিক্ষা, মেয়েদের জন্য শৌচালয়, ঋতুকালীন ও মাতৃত্বকালীন অসুবিধা, মেয়েদের কাজ করার অধিকার, সব ধরনের আলোচনায় বাড়ির ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই সক্রিয় ভাবে যুক্ত করা জরুরি। করতেই হবে। যৌন হেনস্থা ‘মেয়েদের নিরাপত্তা’র সমস্যা নয়। এটি পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক আচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সম্মতি এবং ব্যক্তিগত সীমারেখা বোঝার প্রশ্ন। ছেলেদের ছোটবেলা থেকে শেখাতেই হবে— কারও ‘না’ মানে না; বন্ধুর অনুচিত আচরণকে প্রশ্রয় দেওয়া সাধারণ বিষয় নয়, একটি মেয়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু মেয়েটির নিজের নয়। ছেলেদের বোঝাতে হবে, কোনও পোশাক, দিন বা রাতের সময়, সম্পর্ক, পেশা বা জীবনযাপনের ধরন— যৌন হেনস্থার দায় তৈরি করে না। অপরাধের দায় অপরাধীরই।

মেয়েদের ‘সাবধানে থাকতে’ বলা সহজ। হয়তো মা হিসাবে আমি এখনও মেয়েকে বলব— ‘রাতে একা ফিরো না।’ কারণ জানি, বাস্তব পৃথিবী এখনও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। কিন্তু একই সঙ্গে চাই, এই কথাগুলি যেন চিরকাল বলতে না হয়। আমার মেয়ের প্রজন্মকে যেন তার পরের প্রজন্মকে বলতে না হয়। তাদের কাছে স্বাধীনতা যেন সতর্কতার সমার্থক না হয়। রাত যেন আতঙ্কের আর এক নাম না হয়। রাস্তায় হাঁটা যেন সাহসের পরীক্ষা না হয়।

এর পরেও যদি কেউ প্রশ্ন করেন, কেন, ছেলেরা, বিশেষত শিশু বা কিশোরেরাও তো ধর্ষিত হয়। কই, তাদের কথা তো বললে না।

হয়, অবশ্যই হয়। কিন্তু সেখানে ধর্ষক তো সেই— পুরুষই!

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Safety Society

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy