হীরক রাজার দেশে’ ছবিতে মানুষের চিন্তা নিয়ন্ত্রণের জন্য ছিল ‘যন্তর মন্তর’, তার বিপরীতে ছিল গুপী-বাঘার গান। সেখানে গান নিছক বিনোদন নয়: প্রশ্ন ও ব্যঙ্গ করার, অস্বীকারের ভাষা। গানের শক্তি ছিল যতটা সুরে, কথাতেও ততটাই। তবে শুধু সিনেমায় নয়, বাস্তবেরও কত আন্দোলনে গান হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের হাতিয়ার। বদলেছে শুধু তার ভাষা, অভিজ্ঞতা, আর পৌঁছনোর পথ।
নিট-প্রশ্নফাঁস থেকে উঠে আসা যে আন্দোলন ভারত দেখল সম্প্রতি, গান সেখানেও ছিল ‘দৃশ্যমান’ প্রতিবাদী মাধ্যম। জেন-জ়ি’দের এই আন্দোলনে সৈয়দ আলী রাজা (মনজর ভোপালী)-র লেখা ‘দেশ কি তবাহি কা হিসাব দিজিয়ে’ গানটি হয়ে উঠেছিল এক সাংস্কৃতিক প্রতীক। আবার বেঙ্গালুরুর সঙ্গীতশিল্পী সুনীল কোশে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তৈরি করেন ‘ডাটে রহো’ গানটি, আন্দোলনকে দার্ঢ্য দিয়েছিল তা। বাংলাদেশের ফারজানা ওয়াহিদ সায়ানের কথা ও সুরে ‘সোনম ওয়াংচুকের গল্প’ গানটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সমাজমাধ্যম বেয়ে। সাউথ কোরিয়ান ব্যান্ড বিটিএস-এর পুরনো গান— ‘নো মোর ড্রিম’, ‘নট টুডে’ ইত্যাদিও ‘প্রোটেস্ট এডিট’-এ নতুন অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর বার বার বেজে ওঠে সেই অমোঘ গান, ‘একলা চলো রে’।
দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এক প্রজন্মে জন্মানো মানুষ আর এক প্রজন্মের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন। কেবল সাল-তারিখের শৃঙ্খলেই তাই সব প্রজন্ম বা ‘জেন’দের বাঁধা মুশকিল। অন্যায়ের চোখে চোখ রেখে, অন্যায্য পৃথিবীর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস থেকে গিয়েছে প্রতিটি প্রজন্মের ডিএনএ-তেই। আর তাই ‘ফেডারেশন’ থেকে ‘জেন-জ়ি’, সবাইকেই গান দিয়ে যায় চেনা।
‘ফেডারেশন’ প্রজন্মে রবীন্দ্রনাথের ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী তথা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল। ‘বিল্ডার্স’ প্রজন্মে স্বাধীনতার স্বপ্ন আরও পোক্ত: নজরুলের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, তারও পরে ‘কদম কদম বঢ়ায়ে যা’-সহ বহু গান ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামী চেতনা জাগিয়েছিল। ‘বেবি বুমারস’-এর সময়ে সেই কণ্ঠ আরও প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক রূপ নেয়। নির্মলেন্দু-হেমাঙ্গ-সলিল; গণসঙ্গীত কিংবা আইপিটিএ-ধারার গান স্বাধীনতা-পরবর্তী শ্রমিক-কৃষকের জীবন, খাদ্য, শোষণ ও বৈষম্যকে সামনে এনে তৈরি করে এক সমবেত ‘আমরা’— ‘মাঠে কিষান, কলে মজুর, নওজোয়ান জোট বাঁধো’।
‘বেবি বুমারস’-এর সময়ে নকশাল আন্দোলন, ১৯৭৫-এর জরুরি অবস্থার প্রভাবে প্রতিবাদের ভাষা-সুর বদলাতে থাকে। ভূপেন হাজরিকার ‘মানুষ মানুষের জন্য’, ‘বিস্তীর্ণ দু’পারে’ প্রতিবাদের ভাষাকে প্রসারিত করেছিল সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বৃহত্তর প্রশ্নের দিকে। শরণার্থীর যন্ত্রণা নিয়ে অ্যালেন গিন্সবার্গ ১৯৭১-এ লেখেন কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’, অনেক পরে, নব্বইয়ের দশকে মৌসুমী ভৌমিকের গলায় তা হয়ে ওঠে গান, ‘যশোর রোড’— ‘এত মরা মুখ, আধমরা পায়ে/ পূর্ব বাংলা কোলকাতা চলে’। স্মৃতি ও প্রতিবাদী চেতনা মিশে যায় গানের পরতে পরতে। ‘মিলেনিয়ালস’-এ সমষ্টিগত ‘আমরা’ যেন এসে দাঁড়ায় এক প্রান্তিক ‘আমি’-র সামনে। কবীর সুমনের গানের কথা ‘শ্রেণীহীন সমাজের চির বাসনায়/ দিনবদলের খিদে-ভরা চেতনায়’ জেগে থাকে। প্রতিবাদ হয়ে ওঠে সামাজিক বাস্তবতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার শিল্প। এই সময়ে প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের ‘আমি বাংলায় গান গাই’ গানে প্রতিবাদের ভাষা ও জাতিচেতনা মিলেমিশে ছড়িয়ে পড়ে ব্যক্তি থেকে সমষ্টি-‘আমি’তে।
জেন-জ়ি’র আন্দোলনে স্লোগান ও প্ল্যাকার্ডের পাশে জায়গা করে নিয়েছে মিম, রিল, শর্টস-ও। এদের পাশাপাশি ভাইরাল হয়েছে গানও, সুরের আগুন ছড়িয়েছে দ্রুত। লাইক, শেয়ার করাও হয়ে উঠেছে আন্দোলনে পাশে থাকার প্রতিশব্দ। জেন-জ়ি প্রতিবাদের ভাষাকেই নতুন করে নির্মাণ করেছে— কখনও কবিতায়, জ্যাজ়-হিপহপ-পপে, পুরনো গানে, কখনও ডিজিটাল এডিটিংয়ে।
গুপী-বাঘা ছবির ‘যন্তর-মন্তর’-এর কারসাজিতে হাত মেলায়নি, বরং সেই যন্ত্রের বিরুদ্ধেই গেয়ে উঠেছিল— ‘নহি যন্ত্র, নহি যন্ত্র, আমি প্রাণী’। জ্ঞান-বলে এবং গান-বরে তারা সব সময় নিপীড়িত, সঙ্ঘবদ্ধ মানুষের প্রতিবাদেই শামিল হয়েছিল। আর বাস্তবের গুপী-বাঘা জেন-জ়ি’দের দেখা গেল আর এক ‘যন্তর মন্তর’-এর বুকেই আন্দোলনে মুখর হতে। অন্য রূপে, অন্য ভাবে ‘সারেগামাপাধানিসা’ গাইতে পারার বর তাদেরও আছে। জেন-জ়ি-রনিট আন্দোলন নিজেই যেন প্রতিবাদী সঙ্গীতের এক নতুন সাউন্ডট্র্যাক। সে দিনের ‘রাজা ধিক’ থেকে আজকের ‘হিসাব দিজিয়ে’— এই দীর্ঘ পথ আসলে প্রতিবাদের সাঙ্গীতিক ঐতিহ্যের চিহ্ন। সুনীল কোশের ‘ডাটে রহো’ তাই মনে করিয়ে দেয় কবীর সুমনের ‘হাল ছেড়ো না’কে। আর জি কর-পরবর্তী আন্দোলনে অরিজিৎ সিংহের ‘আর কবে?’র বিবেক-জাগানো প্রশ্ন আর ‘নো মোর ড্রিম’ তো একই মুদ্রার এ-পিঠ ও-পিঠ! আসলে প্রজন্মের দাবি, প্রতিবাদের ভাষা, এমনকি প্রচারের মাধ্যমও বদলায়, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুষ্টিবদ্ধ হাত শূন্যে ছোড়ার জনচেতনা কোনও দিন মরে না। নতুন সময়ে, নতুন প্রজন্মকণ্ঠে, নতুন কিংবা পুরনো গান গলায় নিয়ে ফিরে ফিরে আসে সে।
বাংলা বিভাগ, হেরম্বচন্দ্র কলেজ