E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

কান দেয়নি, তাই

ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিকে সামনে রেখে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। আন্দোলন তা হাসিল করেছে। এর আগেও কৃষক আন্দোলনের জেরে সরকারকে পিছু হটতে হয়েছিল। গত লোকসভা নির্বাচনে চারশো পার স্লোগান তুলে একক গরিষ্ঠতা মেলেনি।

জাগরী বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৪ অগস্ট ২০২৬ ০৬:৪৭
প্রভাব: কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার পরে যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত ছাত্র ও সিজেপি-সমর্থকেরা, দিল্লি, ২৫ জুলাই ২০২৬।

প্রভাব: কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার পরে যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত ছাত্র ও সিজেপি-সমর্থকেরা, দিল্লি, ২৫ জুলাই ২০২৬। ছবি: রয়টার্স।

দেশবাসী যখন রুখে দাঁড়ায়, শাসককে তাঁর করণীয় নতুন করে স্থির করতে হয়। বিরোধিতার শক্তি কতখানি, সেটা আঁচ করা তাঁর প্রথম কাজ। যদি সেই শক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকে, তবে শাসক গোড়াতেই নড়ে বসেন। কিছু দাবি মেনে নেন, কিছু পদক্ষেপ করেন। আবার এই কাজগুলো গোড়ার দিকেই করে ফেললে নিজেকে বড় বেশি নমনীয়, বড় বেশি উদ্বিগ্ন বলে মনে হচ্ছে কি না, সেটাও তাঁকে ভাবতে হয়। কোন সময় কী করলে বিরোধিতার আঁচ কমানো যাবে আর সেই সঙ্গে নিজের শক্তিমান ভাবমূর্তিও অটুট রাখা যাবে, এই ভারসাম্যের কৌশলটি নিরূপণ করা তাঁর চ্যালেঞ্জ। যন্তর মন্তর আন্দোলনে শাসকের এই কৌশলগত খামতি ভাল রকম প্রকট। শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা তাই মোটেই শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফায় আটকে নেই। বরং নরেন্দ্র মোদী নিজেকে যে দেবত্বে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে এসেছেন ২০১৪ থেকে, সেই দেবত্ব ক্ষণকালের জন্য হলেও চিড় খেয়েছে।

ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিকে সামনে রেখে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। আন্দোলন তা হাসিল করেছে। এর আগেও কৃষক আন্দোলনের জেরে সরকারকে পিছু হটতে হয়েছিল। গত লোকসভা নির্বাচনে চারশো পার স্লোগান তুলে একক গরিষ্ঠতা মেলেনি। মোদীর নিজের সাত লক্ষ ভোটে জেতার স্বপ্ন অধরা থেকেছে। বিরোধীদের সম্মিলিত প্রতিরোধে লোকসভায় আসন পুনর্বিন্যাস বিল আটকে যাওয়ায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে মনোবেদনা লাঘব করতে হয়েছে। কিন্তু তার পরেও একের পর এক রাজ্যে বিপুল জয়, ছলে-বলে-কৌশলে সংসদে শক্তি বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে আপাতভাবে ‘ক্ষতি’ খানিক পুষিয়ে নেওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে ভোট চুরির অভিযোগ এসেছে, এসআইআর নিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন উঠেছে। দল ভাঙানোর খেলা অদৃষ্টপূর্ব মাত্রায় পৌঁছেছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিতে ভর করে সেগুলি উপেক্ষা করতে শাসকের খুব অসুবিধা হয়নি। এই আবহে একটি প্যারডি-সম দলের জন্ম এবং শিক্ষা-দুর্নীতিকে সামনে রেখে আন্দোলনের ডাক, অনশন মঞ্চ, পুলিশি দমন-পীড়নের জেরে আন্দোলনের বিস্তার এবং বিরোধী দলগুলির তৎপরতা— অনেক অঙ্কই উলটপালট করে দিল। নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর সরকারের অপ্রতিরোধ্য ভাবমূর্তি খানিক টাল খেয়ে গেল।

আন্দোলনপর্ব জুড়েই পদে পদে ঠোক্কর। প্রাথমিক উপেক্ষার দাম দিতে হল বড় বেশি করে। সোনম ওয়াংচুককে অনশনমঞ্চ থেকে তুলে নিয়ে গেলে আন্দোলনে ভাটা পড়বে ভাবা হয়েছিল। পড়েনি। লাঠি চালিয়ে আন্দোলন রোখা যাবে মনে করা হয়েছিল। যায়নি। বরং এই দুটো পদক্ষেপই আন্দোলনকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়, ছড়িয়ে দেয়। এই বাড়বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণ শুধু রাজপথ নয়, সমাজমাধ্যমকেও ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে। বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমকে কার্যত অগ্রাহ্য করে, পিছনে ফেলে, রাস্তা থেকে উঠে আসা রিল মানুষের হাতের মুঠোয় উপচে পড়েছে। রিল-মিম-পোস্টার-প্ল্যাকার্ডের জোয়ার আন্দোলনের অঙ্গ হয়ে থাকেনি কেবল, আন্দোলনের ভাষা এবং ভাষ্য নির্ধারণ করেছে। শাসক শিবিরকে যে এই পর্বে বেশ খানিকটা অপ্রস্তুত দেখিয়েছে, তার বড় কারণ এই ভাষার সঙ্গে তাঁদের অপরিচিতি। টিভি চ্যানেল এবং ফেসবুক-ওয়টস্যাপনির্ভর আইটি সেল দৃশ্যতই ইনস্টা-প্রজন্মকে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ। খোদ প্রধানমন্ত্রীকে তাই মধ্যরাতে ভিডিয়ো পোস্ট করতে হয়েছে, ‘মিত্রোঁ’ ছেড়ে ‘ফ্রেন্ডস’-এ সম্বোধন বদলে নিতে হয়েছে, ইনস্টাগ্রামে সক্রিয়তা বাড়ানোর নির্দেশ দিতে হয়েছে।

প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে একটি আন্দোলন এবং অবশেষে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ যে মোদী সরকারের ভাবমূর্তিকে এতটা প্রভাবিত করল, সেটি কিন্তু তারই নিজস্ব অর্জন। নিজের জালে নিজেরই জড়িয়ে পড়া। খুব চেনাজানা একটি দৃষ্টান্ত নেওয়া যাক। ২০০৮ সালের মুম্বই হামলা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন শিবরাজ পাটিল। একে মন্ত্রী হিসেবে ব্যর্থতা, তায় বারংবার পোশাক পাল্টানোয় অসংবেদী বার্তা যাচ্ছে বলে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। জঙ্গি হানার আবহে খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পদত্যাগ করালে সরকার মুখ থুবড়ে পড়বে, এমনটা মনে করা হয়নি কিন্তু। শিবরাজের ব্যর্থতার দায় আখেরে পুরোটাই মনমোহন সিংহের উপরে গিয়ে পড়বে, এমনও ভাবা যায়নি। সর্বোপরি ২০০৯-এ ইউপিএ-র পুনরাগমনও তার জন্য আটকে থাকেনি। কারণ সরকার কোনও ফুটবল দল নয় যে, এক জন লাল কার্ড দেখলে বাকি সময়টা ভাঙা দল নিয়ে খেলতে হবে। মন্ত্রক মন্ত্রকের কাজ করবে, মন্ত্রীরা মন্ত্রীদের কাজ করবেন, প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কাজ করবেন এবং সরকারকে নেতৃত্ব দেবেন— এই রকমই ভাবা হত তখনও। সরকারকে কারও দেবত্বের তল্পিবাহক হতে হত না। নিজেদের অতি পরাক্রমী বানাতে গিয়ে শাসকেরা ইদানীং পুরো ব্যবস্থাটাকে এতখানি ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তুলেছেন যে, একটা হোঁচটও আত্মপরাভব হয়ে ওঠে। তাঁদের প্রতাপ কাঁটা হয়ে তাঁদেরই পায়ে বেঁধে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাধারণ নীতি বলে, সরকার, আইনসভা ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে ভেদরেখা থাকতে হয়। স্বশাসিত সাংবিধানিক সংস্থাকে নিজের মতো কাজ করতে দিতে হয়। সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ, তার স্বাধীনতা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের সব ক’টা প্রতিষ্ঠানকে তাঁবেদার বানাতে চাইলে নিজের বপু তো বাড়েই, সে-গুরুভারে মেদিনীও কেঁপে ওঠে। যে কোনও সংক্ষোভ তখন আপনাআপনি এক লপ্তে সব ক’টি প্রতিষ্ঠানের দিকে ধাবিত হয়। কারণ তারা সবাই তত দিনে মোটের উপরে একটি মুখের প্রতিনিধি হিসেবে সাধারণ্যে সুবিদিত। এই আন্দোলনে সেটাই হয়েছে। আন্দোলনের ব্যাপ্তি যে শাসকের ধারণাতীত হল, সে-বীজও কতকটা তার নিজেরই বোনা। নির্বাচন যেমন ভোটারকে তার মত জানানোর সুযোগ দেয়, দলগুলিকেও দেয় তাদের জনভিত্তির হদিস। নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে ভোটারের আস্থা যদি টলে, সে ক্ষতি শুধু ভোটারের নয়। দলেরও, এমনকি শাসক দলেরও। বিধায়ক-সাংসদ-শরিক সংখ্যা তখন আইনসভার গরিষ্ঠতাই নিশ্চিত করতে পারে, প্রকৃত জনাদেশের প্রতিফলনকে নয়। ‘মন কি বাত’ শোনানোর পাশাপাশি তাই জনমত শোনারও অভ্যাস থাকা দরকার।

শোনার পথ অনেকাংশে সরকার বাহাদুর নিজেই বন্ধ করে রেখেছেন। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে ভারতের স্থান সর্বজনবিদিত। প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদমাধ্যমের একটা বড় অংশের ভূমিকাও প্রায় আড়ালহীন। শাসক ও বিরোধী স্বরের সম্প্রচারে আনুপাতিক অসাম্য অতি প্রকট। এই পরিস্থিতিতে নতুন প্রজন্মের নতুন আন্দোলন শাসকের প্রচারভাষ্যকে কার্যত উপেক্ষা করে নিজেদের ভাষায় কথা বলে গিয়েছে। ব্যঙ্গবিদ্রুপ হয়ে উঠেছে তাদের বড় হাতিয়ার। গত এক দশকে ভারতে স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ানদের একাংশ লাগাতার তাঁদের চৌহদ্দির মধ্যে থেকে সরকারকে প্রশ্ন করে এসেছেন। সেই ফল্গুধারাটি এ বারে জেন-জ়ি আন্দোলনের রিল-মিম-পোস্টারে-স্লোগানে বাঁধভাঙা বন্যা হয়ে রাস্তায় নেমে এল। পুঞ্জীভূত রাগ-ক্ষোভ-হতাশার এই ‘ফিল্টার’হীন ঝাঁঝালো প্রদর্শনী যে কোনও সরকারের হাঁটু কাঁপিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। তার কারণ, আন্দোলনের শুরু আছে, শেষও আছে। কিন্তু এই আন্দোলন যে একই সঙ্গে একটি অশেষেরও বার্তা— দমচাপা ভয় আর অন্ধভক্তির দিনকাল অনন্ত নয়। মোদীত্বের কাছে এখন এটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ভোটের বাক্সে এই আন্দোলনের প্রভাব পড়বে কি না, বিরোধী রাজনীতিতে অক্সিজেন মিলবে কি না, ভারতীয় রাজনীতি ভিন্ন খাতে বইবে কি না, শাসক নিজেকে গড়েপিটে নেবে কি না— এর কোনও কিছুই হিসাব করার সময় আসেনি। খালি একটা বিষয় স্পষ্ট। ধর্মেন্দ্র প্রধান নয়, এই আন্দোলন সরাসরি আঘাত করেছে মোদীত্বকে। শুধু আঘাতও নয়, এই আন্দোলন শাসককে তার রাজবেশ ছাড়িয়ে সরকারি উর্দি পরিয়ে দিয়েছে। সরকারকে স্রেফ সরকারের মতোই দেখতে লাগছে এই মুহূর্তে। সরকার মানে নির্বাচিত প্রশাসক, ভাগ্যবিধাতা নয়। প্রধানমন্ত্রী মানে সরকারের নেতা, ঈশ্বরপ্রেরিত অবতার নয়। ভারতীয় জনতা পার্টি একটি রাজনৈতিক দলের নাম, ভারতীয় সভ্যতার একমাত্র প্রতিনিধি নয়। খুব আটপৌরে এই কথাগুলো ভারত যেন ভুলতে বসেছিল। বলা ভাল, ভুলিয়ে দিচ্ছিল প্রচারযন্ত্রের মুখব্যাদান। যন্তর মন্তর রাজনীতিকে তার বর্ণপরিচয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে। এই হাসিল সম্ভবত স্বল্পস্থায়ী হবে না।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Students Protest Generation Z Central Government Indian Education System

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy