পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চল বিষয়ে একেবারে অনভিজ্ঞ নই। কিন্তু এই কথাটা আমার কাছে একেবারেই নতুন: “টাকার দরকার নেই, মেয়েরা হাতে টাকা পেয়ে বিগড়ে যাচ্ছে।” কথাটি জানতে পারলাম সুজিত মাঝি ও বড়ো বাস্কের করা বেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব দলিত স্টাডিজ়-এর একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা থেকে। কিছু পুরুষের আশঙ্কা, মেয়েদের এই ‘বিগড়ে যাওয়া’-র পরিণাম ‘সংসার উচ্ছন্নে যাওয়া’। অথচ তাঁদের বাড়ির মেয়েদের হাতে আসা টাকা খরচ হচ্ছে সংসারের কাজেই, মেয়েদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে নয়। তা হলে আপত্তি কোথায়? সে কথায় যাওয়ার আগে সমীক্ষার প্রেক্ষাপটের কথা বলি।
সমীক্ষার ক্ষেত্র বীরভূমের বোলপুর-শ্রীনিকেতন ও নানুর ব্লকের পনেরোটি গ্রাম। নমুনা: সাধারণ জাতি (প্রায় সবটাই হিন্দু মধ্যবর্ণ বা ‘মিডল কাস্ট’), মুসলমান, দলিত ও আদিবাসী— এই চার গোষ্ঠীর ৫০ জন করে মোট ২০০ মহিলা। সেই সঙ্গে সমীক্ষকরা কথা বলেছেন প্রায় ৩০ জন পুরুষের সঙ্গেও। নমুনা ছোট; পরিসংখ্যানগত পদ্ধতির কঠোর শর্তগুলিও পুরোপুরি মানা সম্ভব হয়নি। তাই সমীক্ষকরা ফলাফলগুলিকে বৃহত্তর বাস্তবের ছবি হিসাবে নয়, কিছু প্রবণতার ইঙ্গিত হিসাবে দেখছেন। পুরুষদের সঙ্গে কথাবার্তাও হয়েছে আটপৌরে ভঙ্গিতে। তবে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও সাধারণ মানুষের কথাবার্তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এর পর্যবেক্ষণগুলি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে।
সমীক্ষার নানা দিকের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে শুরুতে বলা ওই কয়েক জন পুরুষের প্রতিক্রিয়া। তাঁদের অধিকাংশই ব্রাহ্মণ-বৈদ্য-কায়স্থের বাইরে হিন্দু মধ্যবর্ণের মানুষ; অল্প কয়েক জন মুসলমান বড় চাষি। তাঁদের আপত্তির তাৎপর্য স্পষ্ট হয় মেয়েদের হাতে আসা টাকার খরচের ধরন দেখলে। সমীক্ষায় মধ্যবর্ণের মেয়েদের ক্ষেত্রে এই টাকার বেশির ভাগটাই খরচ হয় বাচ্চাদের প্রাইভেট টিউশনে; বাকিটা গৃহস্থালিতে। অর্থাৎ, পরিবারের প্রয়োজন মেটাতেই। তবু আপত্তি। এতে মনে হয়, সমস্যাটা কেবল কোন খাতে টাকা খরচ হচ্ছে তা নিয়ে নয়— খরচ করার সিদ্ধান্ত কে নিচ্ছেন, তা নিয়েও। পুরুষের দেওয়া টাকা খরচ করা আর নিজের নামে পাওয়া টাকা খরচ করার মধ্যে টাকার অঙ্কের বাইরেও একটি ফারাক আছে।
পরিবার সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণাটিকেও এই অভিজ্ঞতা প্রশ্ন করে। বাড়ি পাকা, জমি আছে, চাষে মজুর লাগানো হয়— এ সব থেকে পরিবারের সচ্ছলতার আন্দাজ পাওয়া যায়। কিন্তু পরিবারের সম্পদ আর নারীর নিজস্ব সামর্থ্যকে এক করে দেখলে এই পার্থক্য হারিয়ে যায়। সমীক্ষায় তুলনামূলক সচ্ছল কয়েকটি পরিবারের পুরুষদের কথাতেই মেয়েদের উপরে কর্তৃত্ব শিথিল হওয়ার আশঙ্কা উঠে এসেছে।
মধ্যবর্ণের এই পুরুষদের প্রতিক্রিয়া বাংলার সামাজিক ইতিহাসের আলোয় আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। হিতেশরঞ্জন সান্যালের অসামান্য গবেষণা বাংলায় সামাজিক গতিময়তার ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি, নবশাখ নামে পরিচিত নয়টি জাতির সামাজিক উত্তরণের সঙ্গে আর্থিক উন্নতির কত গভীর সম্পর্ক ছিল। আর্থনীতিক শক্তি অর্জনের সুবাদে কিছু জাতি জল-অচল থেকে জলচল হয়ে ওঠে। যাঁদের হাতের জল আগে ব্রাহ্মণ গ্রহণ করতেন না, আর্থিক সবলতা তাঁদের সেই অপমানজনক অবস্থান থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে সাহায্য করে। এই অপমানের চরিত্র জানে ভুক্তভোগী। অর্থ যে শুধু ভোগের উপায় নয়, সামাজিক মর্যাদা অর্জনেরও শক্তি— এই ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়। সেই সমাজের কিছু পুরুষ যখন নারীর উপরে নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায় আর্থিক লাভও ছাড়তে চান, তখন প্রশ্ন জাগে: “মেয়েদের বিগড়োতে না দেওয়া” তাঁদের কাছে কতটা জরুরি?
অন্য দিকে, সমীক্ষায় মুসলমান, দলিত ও আদিবাসী পরিবারগুলিতে এই টাকার অনেকটাই যাচ্ছে ‘একটু ভাল করে খেতে’। টাকা খরচের ধরনে এই গোষ্ঠীগত পার্থক্য সামাজিক ও আর্থিক বৈষম্যেরও ইঙ্গিত দেয়: কোথাও সন্তানের লেখাপড়ায় খরচের সুযোগ, কোথাও পেটের চাহিদা মেটানোর একটু অবকাশ।
এই প্রেক্ষাপটেই সমীক্ষার আর একটি তথ্য খুবই উদ্বেগজনক। লক্ষ্মীর ভান্ডার-এর টাকা চার গোষ্ঠীর প্রায় সকলের কাছে পৌঁছলেও অন্নপূর্ণা যোজনায় বহু মহিলা বাদ পড়েছেন— আদিবাসীদের অর্ধেকের বেশি, মুসলমানদের প্রায় সিকিভাগ। অথচ মধ্যবর্ণের হিন্দু মহিলাদের মধ্যে এই সহায়তা পেয়েছেন প্রায় ৮৯%। ছোট এই নমুনা থেকে গোটা রাজ্যের হিসাব করা যাবে না। তবু যাঁদের সামর্থ্য যত কম, তাঁদেরই বেশি বাদ পড়ার ইঙ্গিতটি উপেক্ষা করা চলে না— যে যত দুর্বল তাকে ততটাই বঞ্চিত রাখাটা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
সহায়তা পাওয়ার এই ব্যবধানের পাশাপাশি আছে অধিকারবোধের তফাত। সমীক্ষায় মধ্যবর্ণের মহিলারা প্রকল্পের সুবিধা অন্যদের তুলনায় বেশি পেয়েছেন; নগদ সহায়তাকে তাঁদের বেশির ভাগই অধিকার বলেও মনে করেছেন। অন্য তিন গোষ্ঠীর প্রায় সকলের কাছে তা সরকারের দয়া। এই ব্যবধানকে প্রান্তিকদের চেতনার ঘাটতি বলে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানানোর সুযোগ ও অভিজ্ঞতার অসমতাও এখানে বিবেচ্য। আবার মধ্যবর্ণের মহিলাদের মধ্যে অধিকারের বোধ তুলনায় বেশি হলেও, ওই গোষ্ঠীর কিছু পুরুষের কথাতেই কর্তৃত্ব হারানোর আশঙ্কা প্রকট। নারীর অধিকারবোধ ও পুরুষের আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা একই পরিবারের মধ্যে পাশাপাশি থাকতে পারে। সমাজের এই জটিল বুনন বোঝাটাও একটা জরুরি তৎপরতা (‘অ্যাকশন’)।
এখান থেকে একটি আপাতসঙ্গত প্রস্তাব আসতে পারে: সচ্ছল মধ্যবর্ণের মহিলাদের বাদ দিয়ে কেবল প্রান্তিক মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। বঞ্চিত প্রান্তিক মহিলাদের অন্তর্ভুক্তির দাবি অবশ্যই জোরালো ভাবে তুলতে হবে। কিন্তু তার জন্য প্রথম অংশটিকে বাদ দেওয়ার যুক্তি নেই। সচ্ছল পরিবারের মেয়েটির পুরুষের অধীনতা পরিবারের পাকা বাড়ি দিয়ে মাপা যায় না। একটি বঞ্চনা দূর করার যুক্তি দিয়ে অন্য একটি বঞ্চনাকে আড়াল করা চলে না।
বরং এই অভিজ্ঞতা নগদ সহায়তাকে সর্বজনীন করার যুক্তিই জোরদার করে। সব মহিলাকে এর আওতায় আনার দাবি তুলতে হবে, পূর্ণ মানুষ হিসাবে তাঁদের স্বীকৃতি ও অধিকারের ভিত্তিতে। সর্বজনীনতা অবশ্য শুধু ঘোষণায় প্রতিষ্ঠিত হয় না। বাদ পড়া মহিলাদের খুঁজে বার করা, আবেদনে সাহায্য করা এবং অভিযোগের নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা— এ সবই সংগঠিত গণ-তৎপরতা (‘পাবলিক অ্যাকশন’)-এর বিষয়। এই গণ-তৎপরতায় সরকার, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের নিজস্ব ভূমিকা আছে: প্রকল্প রূপায়ণ থেকে তার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ও নজরদারি পর্যন্ত। আদিবাসী, দলিত ও মুসলমান মহিলাদের ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ জরুরি। সকলের জন্য কাগজে-কলমে দরজা খোলা থাকলেও দীর্ঘ দিনের সামাজিক বঞ্চনা যাঁদের সুযোগ ও সামর্থ্য সীমিত করেছে, তাঁদের পক্ষে সেই দরজা দিয়ে ঢোকা সমান সহজ নয়।
নগদ হস্তান্তর পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্বে আঘাত করতে পারে, কিন্তু সেই কর্তৃত্ব ভাঙার জন্য তা একক ভাবে যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা ও কাজের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবিকেও গণ-তৎপরতার কেন্দ্রে আনতে হবে। প্রশ্ন তুলতে হবে: শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক পরিষেবা সর্বজনীন ভাবে নিশ্চিত করার দায়িত্ব যেখানে সরকারের, সেখানে মানুষকে টাকা খরচ করতে হবে কেন? কেন নগদ সহায়তার টাকা দিয়ে প্রাইভেট টিউশন বা ওষুধের খরচ মেটাতে হবে? এই খরচগুলি পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি সরকারি পরিষেবার ঘাটতির প্রশ্নও সামনে আনে।
সেই ঘাটতি দূর করার দাবি এবং নগদ সহায়তার পরিধি বাড়ানোর দাবি পরস্পরের পরিপূরক। এত সামান্য অর্থও যদি পুরুষের একচ্ছত্র কর্তৃত্বে টান ফেলে, তবে তার পরিধি সঙ্কুচিত করব কেন? যে পুরুষ মেয়েদের অধীন রাখতে টাকা ছাড়তে রাজি, তিনি নিজের অজানতেই মেয়েদের হাতে টাকা থাকার গুরুত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছেন। গণ-তৎপরতার কাজ সেই স্বীকারোক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া, বঞ্চিতদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং সব মেয়ের পূর্ণ মানুষ হিসাবে অধিকার প্রতিষ্ঠার দিকে এগোনো।