সুকুমার রায় লিখেছিলেন, “আজকে তোকে সেই কথাটা বোঝাবই বোঝাব—/ না বুঝবি তো মগজে তোর গজাল মেরে গোঁজাব”। পশ্চিমবঙ্গ-সহ ভারতের নানা রাজ্যের স্কুল-কলেজে ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে ‘নমো সেবা’ শীর্ষক নাটকটি অভিনয় করানোর যে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে, অনেকেরই অভিযোগ, এই উদ্যোগ আদতে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তথা ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্যক্তি নরেন্দ্র মোদীর সাফল্যকেন্দ্রিক প্রচারকে ছাত্রছাত্রীদের মগজে গজাল মেরে গোঁজানোর শামিল।
সম্প্রতি স্কটিশ চার্চ কলেজের ছাত্রছাত্রীরা ওই নাটকটিতে অভিনয় করতে অস্বীকার করেছিল। শিক্ষায় উৎকর্ষের সঙ্গে এই কলেজটি নাট্যচর্চারও উজ্জ্বল ঐতিহ্যের বাহক। রাজ্যের তথা দেশের একাধিক বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব এই কলেজেরই প্রাক্তনী। সুতরাং এই প্রতিবাদকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উপেক্ষা না করে, প্রচ্ছন্ন ব্যক্তিপূজার বার্তাবাহী নিম্নমানের স্ক্রিপ্ট, অশুদ্ধ সংলাপ এবং ধর্মীয় স্লোগান-সহ যে বিষয়গুলি নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে, সুস্থ সংস্কৃতির স্বার্থে সরকারি স্তরে তা পুনর্বিবেচিত হওয়া উচিত। স্কুল-কলেজের স্বাভাবিক পঠনপাঠন এবং আসন্ন পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটার কথা ভেবে সময় পরিবর্তনও দুঃসাধ্য ছিল না। কিন্তু এ বিষয়ে শাসকের অবস্থান অনড়।
শাসকের এ-হেন আচরণ বেদনাদায়ক হলেও বিরল নয়। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যাবে, ক্ষমতার দর্পে বহু শাসকই ইতিহাসে পাকাপাকি ঠাঁই পাওয়ার বাসনায় একতান্ত্রিক ঢঙে ব্যক্তিকীর্তিকে রাষ্ট্রীয় ভাষ্যের মোড়কে উপস্থাপিত করেছেন এবং তার জন্যে বিরুদ্ধ-কণ্ঠরোধে বল প্রয়োগ, জনস্বার্থের সঙ্গে আপস, এমনকি জনগণের করের টাকায় পরিচালিত নানা রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে কুণ্ঠিত হননি। উদাহরণ হিসেবে বিশ্বের ইতিহাসে কুখ্যাত, জার্মানির অ্যাডলফ হিটলারের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। তাঁর শাসনে সে দেশের রাজনীতি-নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ এবং গণমাধ্যমও হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক তথা ব্যক্তি-প্রচারের মাধ্যম। দেশ এবং কাল ভিন্ন হলেও সোভিয়েট ইউনিয়নের জোসেফ স্তালিন, ইটালির বেনিটো মুসোলিনি, ইরাকের সাদ্দাম হুসেনরা ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন স্বৈরাচারী হিসেবে।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি অবশ্য ভারতীয় রাজনীতিতেও বিরল নয়। ইন্দিরা গান্ধীর প্রধানমন্ত্রিত্বকালে ১৯৭৪-৭৫ সালে, বিশেষ করে ১৯৭৫-এর জরুরি অবস্থার সময় ‘ইন্ডিয়া ইজ় ইন্দিরা, ইন্দিরা ইজ় ইন্ডিয়া’ স্লোগানটি কেবল ব্যক্তিভজনা হিসেবে নিন্দিতই হয়নি, তাঁর সাফল্য ও কৃতিত্বের উপরেও ছায়া ফেলেছিল। তামিলনাড়ুতে এম জি রামচন্দ্রন ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সরকারি প্রকল্পকে ব্যবহারের যে ধারা প্রবর্তন করেছিলেন, তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে জয়ললিতা তা বহুধাবিস্তৃত করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধেও বার বার অনুরূপ প্রবণতার অভিযোগ উঠত।
অনেকেরই প্রশ্ন, সাফল্যের শিখরে থাকা নরেন্দ্র মোদীকে কেন্দ্র করে এমন দৃষ্টিকটু এবং আগ্রাসী প্রচারের প্রয়োজন কেন হল? তিনি স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী, নানা জনমত সমীক্ষা ও আন্তর্জাতিক রেটিং অনুযায়ী জনপ্রিয়তমও বটে। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে চালু হয়েছে একাধিক যুগান্তকারী প্রকল্প। তাঁরই আমলে ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’-র হাত ধরে ইউপিআই এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বেনজির প্রসারের কল্যাণে বিশ্বের দরবারে ভারত আজ ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম মডেল হয়ে উঠেছে। প্রতিরক্ষা উৎপাদনে দেশীয় সংস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে দেশের আত্মনির্ভরতা বেড়েছে।
অনেকেই মনে করছেন, তা সত্ত্বেও নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্বকালে গৃহীত বেশ কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং ঘটনার প্রেক্ষিতে জনগণের ক্ষোভ ও অসন্তোষের মেঘ তাঁর এই গগনচুম্বী সাফল্যের উপরে ছায়া ফেলতে শুরু করেছে। বর্তমানে দেশের একটা বড় অংশের মানুষ কর্মহীনতায় ভুগছেন। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের বেকারত্বের হার যে ক্রমবর্ধমান, সরকারি পরিসংখ্যানেই তার ইঙ্গিত মিলেছে। ২০১৬ সালে নোটবন্দির মাধ্যমে কালো টাকা উদ্ধারের যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা পূরণ হয়নি, তদুপরি ওই ঘটনায় কোটি কোটি নাগরিকের দুর্ভোগ এবং বেশ কিছু মানুষের মৃত্যু আজও মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। আয়বৈষম্য বৃদ্ধিতে দেশের আর্থিক বিকাশের সুফল নির্দিষ্ট একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। কৃষির সঙ্কট, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দামে লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, শিক্ষার মানের অবনতি, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সঙ্কোচন, দুর্নীতি-জনপ্রীতি ও জনসমর্থনে ফাটল ধরানোর উপাদানের তালিকাটি সুদীর্ঘ। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর রিপোর্টে প্রকাশ, নারীদের বিরুদ্ধে হিংসা, গার্হস্থ নির্যাতন, ধর্ষণ ও ইভ টিজ়িং নিয়মিত ঘটেই চলেছে। এটা যেমন উদ্বেগের, তেমনই নিগৃহীতা নারী সম্পর্কে কট্টরপন্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ক্ষমতাশালী নিগ্রহকারীকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভাবে আড়াল করার চেষ্টা জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। তবে সবচেয়ে ভীতির কারণ হয়ে উঠেছে জেন জ়ি-র ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। এই আবহে ‘নমো সেবা’-র মাধ্যমে তরুণ শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্ক প্রক্ষালন শাসকের কাছে জরুরি বইকি!