পেরুদেশের আশানিঙ্কা, কুকামা জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষদের ভারী আশ্চর্য এক ভাবনা আছে। তারা মনে করে, জগতের সব জীব কোনও না কোনও এক দিন মানুষ ছিল। তাই সকলেই তাদের পূর্বপুরুষ। তাদের লোককথা অনুযায়ী, আমাজ়ন অরণ্যের হুলবিহীন মৌমাছি আসলে ছিল এক মেয়ে। সে কাসাভা দিয়ে চমৎকার মাসাটো বানাতে পারত। মাসাটো খুব গুরুত্বপূর্ণ পানীয়। বড় বড় উৎসব, অনুষ্ঠান, অতিথি সৎকার মাসাটো ছাড়া হয় না। সদাহাস্যমুখ প্রাণোচ্ছ্বল মেয়েটির মাসাটো-খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল দিগ্বিদিক। লোকে বলতে লাগল, তার মাসাটো শুধু খেতে সুস্বাদু নয়, অফুরান, যে যতই পান করুক তা ফুরায় না।
সৃষ্টির দেবতা আভিরেরি শুনতে পেলেন। তিনি অরণ্য ও বন্যপ্রাণ সৃষ্টি করেছেন। কৌতূহলবশত তিনি এক দিন এলেন মাসাটো পান করতে। এসে দেখলেন, যা শুনেছিলেন তা সত্যি। মাসাটো শেষই হয় না। তৃপ্ত এবং চমৎকৃত আভিরেরি তখন এই অন্তহীন মিষ্টি পানীয় বানাতে থাকা মেয়েটিকে মৌমাছি বানিয়ে দিলেন। এই গল্প আশানিঙ্কা, কুকামা মানুষেরা বলে গিয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। আদর করে তারা এই খুদে হুলবিহীন মৌমাছিকে ডাকে ‘অ্যাঞ্জেলিতা’ নামে। তারা উৎসবে, চিকিৎসায়, নানা খাবারে অ্যাঞ্জেলিতার মধু ব্যবহার করে থাকে। ক্রমে তারা জানতে পারে, আমাজ়নের বহু প্রজাতির উদ্ভিদের গুরুত্বপূর্ণ পরাগমিলনকারী এই মৌমাছিরা। যে উরুকুম গাছের ফল তারা প্রাকৃতিক রং হিসাবে নানা খাবারে, হাতে বোনা পবিত্র পোশাক কুশমায় ব্যবহার করে, তার বিস্তারেও এই মৌমাছিদের অবদান আছে। বিশ্বে কম-বেশি পাঁচশো প্রজাতির হুলবিহীন মৌমাছি আছে। তার মধ্যে ১৭৫টা প্রজাতি আছে পেরুতে।
এক দিন ইউরোপ থেকে বণিক ও শাসকেরা এসে উপস্থিত হল। তাদের হাতে কেবল মানদণ্ড নয়, মৌমাছির বাক্সও ছিল। বিদেশি মৌমাছিরা ঢুকল দেশে। তাদের নাম এপিস মেলিফেরা। তারা অনেক মধু দিতে পারে। ক্রমে জঙ্গলের বাইরের মানুষদের কাছে মধুব্যবসার খাতিরে বিদেশি মৌমাছি জনপ্রিয় হল। স্বাধীন দেশে সরকারি স্বীকৃতিও পেল তারা। কিন্তু শুরু থেকে যে দেশীয় মৌমাছিরা জনজীবন, চাষবাস ও জঙ্গলকে এগিয়ে নিয়ে গেছে, তারা পেল না কিছুই। এক দিকে নিষিদ্ধ কোকেন, পাম চাষ আর উন্নয়নের দোহাই দিয়ে জঙ্গল কাটা, অন্য দিকে এই বিদেশি মৌমাছিদের প্রবল উপস্থিতি ও আক্রমণের যুযুধান চাপে শান্ত হুলবিহীন মৌমাছিরা হারিয়ে যেতে লাগল। যেমন— মৌপালক এলিজ়াবেথের হুলবিহীন মৌমাছিরা প্রায়ই আক্রান্ত হত বিদেশি মেলিফেরা মৌমাছিদের দ্বারা। চাষবাসের ক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে হলেও তার সংগৃহীত মধুতে পাওয়া যেতে লাগল কীটনাশক। বোঝা গেল, কীটনাশকের ব্যবহার এত বেড়েছে যে, তা গভীর অরণ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। অভিজ্ঞ মানুষেরা বললেন, আগে কিছুটা হেঁটে গেলেই জঙ্গলে অ্যাঞ্জেলিতার দেখা মিলত। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে তাদের খুঁজতে হয়।
এমতাবস্থায় এই পেরু থেকেই বিদেশে পড়তে যাওয়া কেচুয়া জনজাতিভুক্ত গবেষক রোসা এস্পিনোজ়া কোভিডকালে গবেষণা শুরু করলেন হুলবিহীন মৌমাছির নানা প্রজাতির মধু নিয়ে। রোসা এক জন প্রশিক্ষিত কেমিক্যাল বায়োলজিস্ট। তিনি তাঁর দেশের জনচিকিৎসায় এর ব্যবহার ও মধুর ঔষধি গুণ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। এই কাজে তাঁকে বিস্তারিত ভাবে সাহায্য করেন হুলবিহীন মৌমাছি বিশেষজ্ঞ কুকামা গবেষক সিজ়ার দেলগাদো। রোসা এই মধুতে উপস্থিত উপাদান দেখে আশ্চর্য হন। তিনি জানতে পারেন, এই মধু গভীর ক্ষত, পুড়ে যাওয়া দেহাংশ, নানা সংক্রামক ব্যাধি, সাধারণ সর্দিকাশি থেকে ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া, আর্থ্রাইটিস ইত্যাদি নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়।
ক্রমশ তিনি মধু থেকে মৌমাছিদের খোঁজে এসে উপলব্ধি করলেন, ব্যাপক অরণ্যছেদন, দূষণ, কীটনাশকের উপস্থিতি, বিদেশি মৌমাছিদের আক্রমণে এই হুলবিহীন মৌমাছির প্রজাতিরা হারিয়ে যেতে বসেছে। তাদের বিলুপ্তপ্রায় লাল তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা ও দেশের জাতীয় মৌমাছি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তিনি বাধার সম্মুখীন হন। জানা যায়, এ সব করতে হলে যে তথ্য লাগবে, তা নেই। তথ্য দিয়ে নিজেদের দেশের প্রাচীন মৌমাছিদের সুরক্ষা, অধিকার, সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রোসা এর আগে পানামার লেদারব্যাক কচ্ছপদের আইনি অধিকার নিয়ে লড়ে যাওয়া ক্যালি ভিলেনটার্ফের সংস্পর্শে এসে জেনেছিলেন, দেশের নদী জঙ্গল পাহাড় বা নানা জীবের সুরক্ষার জন্য কী ভাবে কাজ করতে হয়। নিজের দেশের মৌমাছিদের ক্ষেত্রেও তাই করলেন। অভিজ্ঞ গবেষক সিজ়ার দেলগাদো, আর্থ ল সেন্টার-এর লাতিন আমেরিকার কর্ণধার কনস্ট্যানজ়া প্রিয়েতো, আপু সিজ়ার রামোস-এর মতো জনজাতিভুক্ত নেতা, প্রকৃতির সুরক্ষার জন্য লড়তে থাকা অসংখ্য আশানিঙ্কা ও কুকামা মেয়েদের নিয়ে আটশো বর্গকিলোমিটার অরণ্য ঘুরে হুলবিহীন মৌমাছিদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট তৈরি করলেন।
সেখানে মূলত তুলে আনা হল দেশের এই মৌমাছিদের বাস্তুতান্ত্রিক গুরুত্ব, বিভিন্ন জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে তাদের গভীর সম্পর্ক, সামাজিক সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ও বর্তমান বিপন্নতার কথা। এর পাশাপাশি দাবি জানানো হল, তাদের আইনি অধিকারের। এই আইন অনুযায়ী, পেরুর সমস্ত হুলবিহীন মৌমাছি সুস্থ সবল দূষণবিহীন বাসস্থান, প্রজন্ম ও কলোনি গড়ার অধিকার পাবে, তাদের জীবন অতিবাহিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার করতে পারবে, যে কোনও সমস্যায় প্রয়োজন হলে তারা আদালতে মামলা করতে পারবে এবং তাদের বন্ধু জনজাতিভুক্তরা, যেমন— আশানিঙ্কা, কুকামারা তাদের হয়ে মামলা লড়বে। কোনও রকম দূষণ, কীটনাশক প্রয়োগ, গাছ কাটা, নিষিদ্ধ চাষ, বাইরে থেকে আনা কোনও ইনভেসিভ প্রজাতির ব্যবহার একেবারে চলবে না।
শেষ পর্যন্ত গত বছর ডিসেম্বর মাসে এই সব দাবি মেনে পৃথিবীতে প্রথম বার কোনও পতঙ্গ, কোনও মৌমাছির আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হল। লরেটো প্রদেশের দুটো মিউনিসিপ্যালিটিতে কেবল নয়, সারা দেশে যাতে এই আইন চালু করা যায়, তার জন্য ইতিমধ্যেই ক্যাম্পেন শুরু হয়েছে এবং আট মাস আগেই প্রায় চার লক্ষ সই এর পক্ষে সংগৃহীত হয়ে গিয়েছিল। এখন ইকোয়েডর, বলিভিয়া, চিলি, ব্রাজ়িলের মতো আরও নানা দেশ পেরুর এই ঘটনায় অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের দেশের মৌমাছিদের নিয়ে এমন কথা ভাবছে।
বিশ্বব্যাপী ‘ক্যাপিটালোসিন’-এর দাপটে জলবায়ু পরিবর্তনের এই সঙ্কটময় দিনে ফুল ও মৌমাছির সম্পর্ক যেখানে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, যেখানে পাহাড় জঙ্গল নদী সব তুলে দেওয়া হচ্ছে উন্নয়নের নামে শিল্পপতিদের হাতে, যেখানে প্রায়ই লক্ষ লক্ষ গাছ কাটা পড়ছে আর অনেক মানুষ এই বিধ্বংসী উন্নয়নের পক্ষে সওয়াল করছেন, সেখানে রোসা, আপু, প্রিয়েতোদের নেতৃত্বে কুকামা ও আশানিঙ্কা নারী-পুরুষদের এই নাছোড় লড়াই ও দেশের মৌমাছিদের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা মানবমনের প্রকৃত সৌন্দর্য ও ভালবাসার প্রতীক হয়ে বহু মানুষকে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে।