E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

শত্রুর নতুন নাম

এক জন নাগরিককে কত দূর অবধি সরকারের নীতির সমালোচক হিসাবে দেখা হবে, আর কোন পর্যায়ে গেলে তাঁকে কোনও চরমপন্থী মতাদর্শের প্রতিনিধি বলা হবে? প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পর ভারতীয় গণতন্ত্রকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে।

শুভময় মৈত্র

শেষ আপডেট: ২৫ অগস্ট ২০২৬ ০৬:২৪

আশিতম স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লা থেকে বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একটা নতুন শব্দ নিয়ে এলেন ভারতীয় রাজনীতির পরিসরে— ‘দিমাগি নকশাল’। এত দিন ছিল শুধু ‘আরবান নকশাল’— বিশেষণ পাল্টে ‘দিমাগি’ হওয়ায় তার কী চরিত্রবদল ঘটল, ভাষণে সে কথা জানাননি প্রধানমন্ত্রী। অবশ্য, ‘আরবান নকশাল’-এর সংজ্ঞা ঠিক কী, সে প্রশ্নের উত্তরও তাঁরা দেননি এত দিনেও। লাল কেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রী জানালেন, সশস্ত্র মাওবাদ মোটের উপরে নির্মূল হয়েছে দেশে। কিন্তু, ‘দিমাগি নকশাল’-রা আছে। অর্থাৎ, বন্দুকের নল হাতে অতি-বামপন্থী সশস্ত্র বিপ্লব হয়তো বিলীয়মান, কিন্তু মন বা মগজের গভীরে লুকিয়ে থাকা সেই মতাদর্শ নাকি এখনও রাষ্ট্রের গভীর চিন্তার কারণ। প্রধানমন্ত্রী আহ্বান জানিয়েছেন যে, তাদের চিহ্নিত করতে হবে, বিচ্ছিন্ন করতে হবে।

এক জন নাগরিককে কত দূর অবধি সরকারের নীতির সমালোচক হিসাবে দেখা হবে, আর কোন পর্যায়ে গেলে তাঁকে কোনও চরমপন্থী মতাদর্শের প্রতিনিধি বলা হবে? প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পর ভারতীয় গণতন্ত্রকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে। কারণ, তিনি কাউকে ‘শত্রু’ হিসাবে চিহ্নিত করে দিলে সেটা শুধু তাঁর মুখের কথায় আটকে থাকে না— গোটা গৈরিক বাস্তুতন্ত্র সেই শত্রুর নিধনে তৎপর হয়ে ওঠে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সারা রাত তাণ্ডব চালানো’র যে নিদান দিলেন বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়, অথবা ছ’বছর আগে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে রাতের অন্ধকারে ঢুকে পড়ে যে ভাবে তাণ্ডব চালিয়েছিল গৈরিক গুন্ডাবাহিনী, তাতে এই শত্রু নিধনের ছকই স্পষ্ট। কাজেই, কাকে বলে ‘দিমাগি নকশাল’, সেই সংজ্ঞা দেওয়া অথবা না-দেওয়া, তার ভিতরকার রাজনীতির চরিত্র পড়ে নেওয়া নিঃসন্দেহে নাগরিক সমাজের কর্তব্য।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, সংসদীয় গণতন্ত্রে সশস্ত্র বিপ্লব, হিংসা বা হানাহানির কোনও জায়গা নেই। সশস্ত্র অতি বাম মাওবাদী কিংবা অতি দক্ষিণপন্থী রণবীর সেনা, স্বাধীনতার পর থেকে কেউই এই দেশের বিস্তীর্ণ অংশে সংসদীয় গণতন্ত্রকে অতিক্রম করে দীর্ঘকালীন ক্ষমতা দখল করতে পারেনি। হয়তো বা পেশিশক্তির ভয় দেখিয়ে কিংবা আদর্শগত প্রভাব খাটিয়ে তারা সামান্য কিছু অঞ্চলে আধিপত্য দেখাতে পেরেছে কিছুটা সময়ের জন্যে, কিন্তু কখনওই তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফলে এক দিকে যেমন সশস্ত্র হিংসাশ্রয়ী মাওবাদীদের নির্মূল করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সাফল্যকে স্বীকার করা বিধেয়, ঠিক তেমনই সেই দমনের আইনসিদ্ধ পথের কথা খেয়াল রাখাও জরুরি। রাষ্ট্র সেই আইন ভাঙছে কি না, সে দিকে নজর রাখা গণতান্ত্রিক কর্তব্য। রাতের অন্ধকারে অভিযুক্তকে পুকুরপাড়ে নিয়ে গিয়ে দাবি করা যে, সে পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে পালাতে চেষ্টা করেছিল বলেই তাকে হত্যা করতে হল, একে গণতন্ত্রের পরাকাষ্ঠা বলা মুশকিল। চূড়ান্ত নৃশংসতার মাধ্যমে ভয় পাওয়াতে পারলেই যদি অপরাধপ্রবণতা কমে যেত, সে ক্ষেত্রে অনেক ধর্মীয় মৌলবাদ-পরিচালিত দেশে অপরাধীকে জনসমক্ষে মেরে ঝুলিয়ে দেওয়ার দৃষ্টান্তে শান্তিকামী রাষ্ট্রের পথ খুঁজে পাওয়া যেত— কিন্তু ইতিহাস সে কথা বলে না।

প্রশ্ন হল, সশস্ত্র মাওবাদ এবং ‘দিমাগি নকশাল’ কি একই বিষয়? ঠিক কাদের দিকে ইঙ্গিত করছেন প্রধানমন্ত্রী? তারা রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়ায় ঢুকে পড়েছে, এমন অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এমন মানুষ কি সিঁধ কেটেছেন বিজেপির মধ্যেই? এ রকম উদাহরণ আছে যে, অতি বাম ভাবনার মানুষ এখন বিজেপির বড় নেতা। তা হলে কি এমনটা ধরে নিতে হবে যে, তাঁরা বহু দিন ধরে চক্রান্ত করে বিজেপিতে ঢুকে পড়েছেন এবং সেই সুযোগে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণকে গুলিয়ে দিচ্ছেন? আমলাদের মধ্যে অথবা বিচারবিভাগে অতি বাম মতাদর্শ প্রকট হয়ে উঠেছে, এমন কোনও প্রমাণ কিন্তু আমরা সাম্প্রতিক অতীতে পাইনি। তা হলে প্রধানমন্ত্রী কাদের কথা বলছেন?

এটা অস্বীকার করা যায় না যে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাথায় বসে থাকা লোকজনের মধ্যে এমন মানুষ থাকার সম্ভাবনা কিছুটা বেশি— কারণ, লেখাপড়ার যে কোনও আলোচনাতেই যুক্তি-প্রতিযুক্তি আসে পর্যায়ক্রমে। আসে বিকল্প ভাবনা। সুতরাং দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশ্ন করতে চাওয়া ‘বেয়াড়া’ ছাত্র এবং তাদের ভাবনাকে উস্কে দেওয়া অধ্যাপককুলের মধ্যে ‘দিমাগি নকশাল’ থাকতেই পারেন। কিন্তু মনের মধ্যে গনগনে মাওবাদ নিয়ে তাঁরা সরকারের নিয়োগপদ্ধতির মধ্যে দিয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পরামর্শদাতা কমিটিতে ঢুকে পড়ে দেশের বারোটা বাজাচ্ছেন, এবং সরকার সমস্তটা বুঝে চোখ বন্ধ করে আছে— এমনতর ভাষ্য শুনলে আরশোলাও মুচকি হেসে ফেলতে পারে। আরও বড় প্রশ্ন হল, মনের মধ্যে অতি বামপন্থা গজগজ করলে যেমন তা প্রধানমন্ত্রী এবং সমস্ত দেশবাসীর শঙ্কার কারণ হয়, ঠিক একই মুশকিল হতে পারে অতি দক্ষিণপন্থা মগজে জারিত হলে— তাদের দিমাগের ঠেকা নেওয়া হবে কোন শব্দবন্ধে?

একটু গভীরতর ভাবনায় বলতেই হয় যে, কোনও মতাদর্শের সঙ্গে লড়াই করতে গেলে বন্দুকের পাশাপাশি শিক্ষা, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক ন্যায় এবং রাজনৈতিক সংলাপও দরকার। তবে সে আলোচনায় না গিয়ে অন্য একটি প্রশ্ন তোলা যাক, তা হল আদতে কি অতি দক্ষিণপন্থা এবং অতি বামপন্থা একে অপরের পরিপূরক? ঠিক যেমন এক ধর্মের মৌলবাদীদের প্রয়োজন অন্য ধর্মের মৌলবাদীদের? আমাদের দেশে কি অতি দক্ষিণপন্থার উন্মেষের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে, যার জন্যে শুধু অতি বামপন্থার জুজু নয়, বরং একই সঙ্গে তাকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তোলা দরকার?

রাজনীতি তো সম্ভাবনার শিল্প। সংসদীয় গণতন্ত্রে যে দলগুলি সরকারের নিয়মমাফিক চলে, তাদের বিধায়ক বা সাংসদদের এক সঙ্গে আলোচনা করতে হয় উন্নয়নের নানা বিষয় নিয়ে। সেখানে বিজেপি বা সিপিএমের মতো মতাদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল যেমন থাকে, তেমনই থাকে আপ বা টিভিকে-র মতো কর্মসূচিভিত্তিক দলও। হিন্দু রাষ্ট্রবাদ বা বামপন্থী মতাদর্শের ক্ষেত্রে মানুষের মনের মধ্যে ভাবনা কতটা একপেশে হবে, তার সে রকম কোনও বিজ্ঞানসম্মত সূচক নেই।

একই সঙ্গে সেই ভাবনা যদি প্রত্যক্ষ ভাবে হিংসাশ্রয়ী কোনও কাজে উৎসাহ না দেয়, সে ক্ষেত্রে ফুটোস্কোপ ছাড়া মন্ত্রী-সান্ত্রিরা বুঝবেনই বা কী করে যে, মন বা মগজে কে কী ভাবছেন? মনের ছবি তোলার মতো যন্ত্র না থাকলে যে কোনও বিরোধিতাকেই ‘মাওবাদ’ বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। একাধিপত্যবাদী রাজনীতি ঠিক এ ভাবেই শত্রু চিহ্নিত করতে করতে চলে। ভারত ইদানীং সেই চলনের সঙ্গে পরিচিত।

সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হল মতের বহুত্ব। কিন্তু গণতন্ত্রের দুর্বলতার শুরু যখন সেই বহুত্বকে দু’টি চরম মেরুতে ঠেলে দেওয়া হয়। তখন রাজনীতি আর প্রশ্নের উত্তর খোঁজে না, বরং শত্রু খোঁজে। নাগরিক তখন আর নাগরিক থাকেন না, হয়ে যান কোনও একটি শিবিরের লোক। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক অভিধানে তাই ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’, ‘আরবান নকশাল’, ‘ডিপ স্টেট’ ইত্যাদি শব্দবন্ধের পাশাপাশি ‘দিমাগি নকশাল’ নিজের জায়গা করে নেয়।

প্রতিযুক্তিতে তাই এই প্রশ্ন থাকবেই যে, ঐক্যবদ্ধ ভারতে মধ্যপন্থী ভাবনার বিকাশ থামিয়ে দেওয়ার জন্যই কি অতি দক্ষিণপন্থা আন্তরিক ভাবে অতি বামপন্থার উত্তরণ কামনা করছে?

ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, কলকাতা

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Narendra Modi indian politics Naxals Urban naxals

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy