E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

অন্নপূর্ণা শর্ত দেন না

একটি মেয়ের হয়ে অন্নপূর্ণা যোজনার আবেদনের ফর্ম ভরতে গিয়ে দেখা গেল, আবেদনকারী মহিলাটি সেখানে মুখ্য নন।

রূপালী গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:০৩
প্রাপ্য: অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পেয়ে বিডিও অফিসে বিক্ষোভ মহিলাদের। ২১ অগস্ট, ঘাটাল।

প্রাপ্য: অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পেয়ে বিডিও অফিসে বিক্ষোভ মহিলাদের। ২১ অগস্ট, ঘাটাল। কৌশিক সাঁতরা

দু’জনেই দেবী, সম্পর্কে মা-মেয়ে। অন্নপূর্ণা ও লক্ষ্মী। মা যদি অন্নদাত্রী হন তো মেয়ে সামগ্রিক ভাবে সম্পদের দেবী। সুতরাং মহিলাদের স্ব-নিযুক্তি এবং ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে যে পরিকল্পনা তাকে যদি ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ নাম দেওয়া হয় তাকে যথার্থ বলে মেনে নিতে কষ্ট হয় না। সরকার বদলের পর সেই প্রকল্প নাম বদলে অন্নপূর্ণার নাম নিলেও আপত্তির কিছু ছিল না। মেয়ের বদলে মায়ের নাম নিলে কোন মেয়েই বা অখুশি হয়!

কিন্তু একটি মেয়ের হয়ে অন্নপূর্ণা যোজনার আবেদনের ফর্ম ভরতে গিয়ে দেখা গেল, আবেদনকারী মহিলাটি সেখানে মুখ্য নন। পরিবারের কর্তার (হেড অব দ্য ফ্যামিলি) বিশদ পরিচয় দিয়ে আবেদনের শুরু; তার পর দেখা গেল পরিবারের অনেকের মধ্যে মহিলাটি স্রেফ কোনও এক জন, যিনি এই প্রকল্পের সুবিধা পেতে চান। অন্যদের বিষয়ে ধাপে ধাপে অনেক তথ্যের পাশে তাঁর নিজের বিষয়ে আলাদা করে তেমন কিছু জানাই হল না। ব্যাপারটা অদ্ভুত লেগেছিল, খারাপও। তবে তখনও খারাপ লাগা কিছু বাকি ছিল। যথাসময়ে সেই মেয়েটির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা না আসায় তাঁর অন্নপূর্ণা অ্যাকাউন্টে দেখতে গেলাম কিছু বিজ্ঞপ্তি এসেছে কি না। অ্যাকাউন্টে ঢুকতেই বড় বড় করে লেখা ‘ওয়েলকাম মহাদেব’ (নাম পরিবর্তিত)! ঘাবড়ে গিয়ে যখন ভাবছি ভুল করে কার অ্যাকাউন্টে ঢুকে পড়লাম, তখনই খেয়াল হল মেয়েটির স্বামী অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে পরিবারের কর্তার নামই তো মহাদেব! মানে নামে অন্নপূর্ণা যোজনা হলেও আসলে এটা মহাদেবের ঘরনির ঘর।

কিন্তু এহ বাহ্য। লক্ষ্মীর ভান্ডার নামে যে প্রকল্প চালু ছিল, প্রথম দিকে সেখানে কে পাবে না পাবে তার বিচার থাকলেও পরবর্তী কালে তা ২৫-৬০ বছর বয়সি সব মহিলার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। কারণ, দুঃস্থ মহিলাদের সাহায্যের পরিবর্তে এর লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল নারীর ক্ষমতায়ন। স্থায়ী কিছু উপার্জন নেই এমন যে কোনও মহিলাই এই অনুদানের যোগ্য হতে পারতেন, তাঁর পরিবারিক আয় এখানে বিবেচ্য হত না। যাঁরা দুঃস্থ, তাঁরা এই টাকায় সংসারের খরচ চালাবেন, যাঁরা ততটা দুঃস্থ নন তাঁরা ইচ্ছে হলে কয়েক মাসের টাকা জমিয়ে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করতে পারেন বা নিজের পছন্দের কিছু কিনতে পারেন। তখনও শোনা গিয়েছিল ‘যাদের দরকার নেই’ এমন অনেকে নাকি এই টাকা (মাসে ১৫০০) পাচ্ছেন। তাই পরবর্তী কালে লক্ষ্মীর হাত থেকে এই দায়িত্ব অন্নপূর্ণার হাতে যাওয়ার পর বড় হয়ে দেখা দিল ‘যোগ্যতা’-র প্রশ্ন। এখানে যোগ্যতা মানে আসলে আর্থিক মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকার পরিমাপ।

দেবী অন্নপূর্ণা এমন যোগ্য-অযোগ্য বিচার করে অন্ন বিতরণ করেন কি না জানা নেই, কিন্তু এই যোজনার জন্য যোগ্যতার বিচার বড়ই অস্বচ্ছ। ফলে আজ অবধি কারা, কেন পেয়েছেন এবং কারা, কেন পাননি ঠিক মতো কেউ জানেন না। এই মাসে যাঁরা পেয়েছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই যোগ্য বিবেচিত হয়েছেন— তা হলে এত দিন (পাঁচ মাস) কেন পাননি, সে কথার উত্তর তো নেই-ই, প্রশ্নটাও কেউ তুলতে সাহস পাচ্ছেন না, যদি এই টাকাও বন্ধ হয়ে যায়! সুতরাং, সরকারি এই অর্থ হস্তান্তর প্রকৃত বিচারে একটা ‘দান’-এ পরিণত হয়েছে, যার মধ্যে প্রাপকের কোনও অধিকার বা দাবির প্রশ্নই নেই— যা শুধুই দাতার দয়া ও ইচ্ছা-নির্ভর। এ সম্পর্ক রাষ্ট্র ও নাগরিকের নয়, রাজা ও প্রজার।

কে কত রোজগার করেন তাই দিয়ে তাঁর আর্থিক অবস্থানের এবং অনুদানের ন্যায্যতার (যোগ্যতা নয়) বিচার হয়। কিন্তু মহিলাদের ক্ষেত্রে যা নেই (স্থায়ী রোজগার), তা দিয়ে যদি সেই ন্যায্যতার বিচার করতে হয়, তা হলে এই রকমই হওয়ার কথা। পাঁচটি বাড়িতে কাজ করেন যে মহিলা, তিনি যদি এক বছর ধরে বেতনের এক অংশ জমিয়ে একটি স্মার্ট ফোন কেনেন বা ঘরে একটি এলইডি টিভি আনেন, তা হলে তাই দিয়ে তাঁর অনুদানের অন্যায্যতা বিচার করা যায় কি? সম্ভবত, এই রকম নানা ধরনের অনিশ্চয়তার জন্যই লক্ষ্মীর ভান্ডার ও কন্যাশ্রী প্রকল্প সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। কারণ একটি পরিবার কোন বয়সে তাঁদের বাড়ির মেয়েটির বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবেন সেটা যেমন তাঁদের আর্থিক অবস্থার উপরে সরাসরি নির্ভর করে না, তেমনই বাড়ির মহিলাটির হাতে ইচ্ছেমতো খরচ করার মতো সামান্য টাকাও থাকে কি না, সেটাও তাঁর পারিবারিক আয় বা সরাসরি স্বামীর রোজগারের উপর নির্ভর করে না। এটাই বাস্তব। তা হলে যোগ্যতার বিচার হবে কিসের ভিত্তিতে?

এইখানে এসে একটি সমান্তরাল প্রশ্ন মাথা তুলে দাঁড়ায়, আর এই প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি সরব সেই শ্রেণির নাগরিকেরা (মহিলারাও) যাঁরা নিজেরা এই অনুদানের আওতার বাইরে। প্রশ্নটা হল: নিয়মিত রোজগারহীন গৃহবধূরা আদৌ সরকারের কাছ থেকে টাকা পাবেন কেন? যে মহিলা ‘কিছু করেন না’, অর্থাৎ যে মহিলা সারা দিন শুধু সংসারের কাজ করেন, স্বামীকে কর্মস্থলে পাঠান, বাচ্চাদের দেখাশোনা করেন, দরকারে পরিবারিক দোকানে বসেন, মাঠে কাজ করেন, দিনের শেষে তাঁর হাতে ‘নিজস্ব’ টাকা তুলে দেওয়ার দায়িত্ব (যে টাকার কোনও হিসাব কাউকে দিতে হবে না) সরকার কেন নেবে? হলই বা সামান্য ৩০০০ টাকা (বা ১৫০০), নিজের ঘরের কাজের জন্য কেন টাকা পাবে! মানে যত ক্ষণ না খুব গরিব হচ্ছেন, তত ক্ষণ মহিলারা যে এই অনুদানের ‘যোগ্য’ নন, শিক্ষিত উপার্জনশীল মহিলারাও এই কথাই মনে করেন।

এ প্রশ্নের উত্তর সমাজবিজ্ঞানীরা নানা ভাবে দিয়েছেন। কিন্তু অন্তত যে রোজগেরে মহিলারা মনে করেন, ঘরের কাজের জন্য সরকার কেন টাকা দেবে— এই মুহূর্তে তাঁদের একটি কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে মাতৃত্বের জন্য তিন থেকে ছ’মাস সবেতন ছুটি মঞ্জুর হয়। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সন্তানের ১৮ বছর বয়স হওয়া অবধি এক জন মহিলা খেপে খেপে মোট দু’বছর সবেতন ‘চাইল্ড কেয়ার লিভ’ নিতে পারেন, এ সবই আসলে ‘মেয়েলি’ কাজ ও দায়িত্বের সরকারি স্বীকৃতি, যেটা তাঁরাও পাচ্ছেন। ঠিক যে কারণে বাচ্চার পরীক্ষার পড়া দেখানোর জন্য সরকার বেতন দিচ্ছে (এবং ঠিকই করছে), ঠিক সেই কারণেই ঘরের কাজের জন্যও সরকারের এই সামান্য পরিমাণ নগদ হস্তান্তর করার কথা ভাবা উচিত।

কিন্তু এই মুহূর্তে বর্তমান রাজ্য সরকার বোধ হয় এই ভাবনা থেকে সরে গিয়েছে। তাই অন্নপূর্ণা যোজনার ক্ষেত্রে মহিলাদের ‘যোগ্যতা’র প্রশ্ন এত বড় হয়ে উঠছে। নীতি নির্ধারণ করা সরকারের কাজ— সে বিষয়ে তাঁকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। সরকারের তহবিলে টাকা নেই বলে কেউ যেমন তাঁর বেতন এবং ডিএ-র দাবি থেকে সরে যাবেন না, ঠিক সেই ভাবেই এই সামান্য অর্থটুকুও ‘যোগ্যতা’-নির্বিশেষে মহিলাদের ন্যায্য প্রাপ্য এবং দাবি বলেই মেনে নিতে হবে। সরকারকেও, নাগরিকদেরও। গৃহশ্রমের মূল্যায়ন হওয়া ও মহিলাদের হাতে টাকা থাকা দেশের অর্থনীতির পক্ষে কতটা জরুরি, অর্থনীতিবিদরা সে কথা আরও সহজ ও ব্যাপক ভাবে বোঝান। আমরা শুধু চাই অন্নের পাশাপাশি শ্রমের দাবিও স্বীকৃত হোক, না হলে সেটা কোনও অন্নপূর্ণার পক্ষেই সম্মানজনক নয়।

রসায়ন বিভাগ, সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটি

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Lakkhir Bhandar Women Empowerment

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy