মিড-ডে মিলের খাবার নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তার কেন্দ্রে আসলে ডিম বা নিরামিষ নয়; প্রশ্নটা আরও মৌলিক। একটি সরকারি পুষ্টি প্রকল্পের খাবারের তালিকা ঠিক হবে কোন যুক্তিতে? শিশুদের পুষ্টির প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে, না কি কোনও বিশেষ খাদ্যদর্শনের ভিত্তিতে? এর উত্তরই নির্ধারণ করবে, মিড-ডে মিলকে আমরা জনস্বাস্থ্যের কর্মসূচি হিসাবে দেখব, না কি সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ প্রচারের হাতিয়ার হিসাবে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মিড-ডে মিল থেকে ডিম বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ নিরামিষ খাবার চালু করা হবে। এই সিদ্ধান্তের সমর্থনে যে যুক্তিগুলি সামনে এসেছে, তার অন্যতম হল, এমন খাবার দেওয়া উচিত যা সকলের জন্য গ্রহণযোগ্য। বলা হচ্ছে, যারা নিরামিষই খায়, তাদের পক্ষে আমিষ খাওয়া সম্ভব নয়; কিন্তু আমিষাশীরা নিরামিষ খেতেই পারেন। ফলে, যেখানে সবার খাবারের ব্যবস্থা হচ্ছে, সেখানে নিরামিষই ভাল।
আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিটি আকর্ষণীয়। কিন্তু বাস্তবের পুষ্টিবিজ্ঞান এই সরলীকরণকে সমর্থন করে না। কারণ, এমন কোনও খাদ্য নেই, যা সকল শিশুর জন্য সমান ভাবে গ্রহণযোগ্য। ডিম, দুধ, সয়াবিন, ডাল, বাদাম— প্রায় প্রতিটি পরিচিত খাদ্যের ক্ষেত্রেই কোনও না কোনও শিশুর অ্যালার্জি, অসহিষ্ণুতা বা শারীরিক সমস্যা থাকতে পারে। অর্থাৎ, ‘সর্বজনীন খাবার’ বলে কিছু হয় না। বাস্তবেও কোনও সরকারি পুষ্টি প্রকল্প শতভাগ মানুষের উপযোগী মেনু তৈরির চেষ্টা করে না। লক্ষ থাকে এমন একটি খাবার নির্বাচন করা, যা অধিকাংশ শিশুর পুষ্টির চাহিদা পূরণ করবে। যাঁদের বিশেষ শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা করা হবে। জনস্বাস্থ্যের প্রায় সমস্ত কর্মসূচিতেই এই নীতি অনুসরণ করা হয়। মিড-ডে মিলও তার ব্যতিক্রম নয়।
জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার পঞ্চম দফার (এনএফএইচএস-৫) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে নিরামিষাশী মানুষের অনুপাত মোট জনসংখ্যার এক শতাংশেরও কম। তার মধ্যেও অনেকেই বয়স, স্বাস্থ্য বা ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে নিরামিষ খান, কিন্তু পরিবারের শিশুদের আমিষভোজী হতে বাধা দেন না। ফলে স্কুলপড়ুয়াদের মধ্যে ডিম খায় না, এমন শিশুর প্রকৃত অনুপাত আরও কম। অন্য দিকে, ডিমে অ্যালার্জি রয়েছে এমন শিশুর সংখ্যাও অত্যন্ত সীমিত। অর্থাৎ, ডিম-ভিত্তিক মেনুর ক্ষেত্রে বিকল্প খাবারের প্রয়োজন হবে অল্প সংখ্যকের জন্য।
নিরামিষ বিকল্পগুলির ক্ষেত্রেও কিন্তু একই প্রশ্ন প্রযোজ্য— কত শতাংশ ছাত্রছাত্রীর সেই খাবারে কোনও শারীরিক সমস্যা নেই? যদি পনিরকে প্রোটিনের প্রধান উৎস করা হয়, তা হলে ল্যাকটোজ় ইনটলারেন্স থাকা শিশুদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করতে হবে। পূর্ব ভারতের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ল্যাকটোজ় ইনটলারেন্সের হার তুলনামূলক ভাবে বেশি বলেই বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে। সয়াবিন বা রাজমার ক্ষেত্রেও অ্যালার্জির সম্ভাবনা একেবারে শূন্য নয়। অর্থাৎ, কোনও বিকল্পই সর্বজনীন নয়। প্রশ্ন তাই নিরামিষ বা আমিষ নয়— প্রশ্ন হল, কোন খাবারটি সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শিশুর জন্য বেশি কার্যকর।
সেখানেই ডিমের বিশেষ গুরুত্ব। পুষ্টিবিজ্ঞানে ডিমকে প্রায় সম্পূর্ণ খাদ্য বলা হয়। উচ্চমানের প্রাণিজ প্রোটিনের পাশাপাশি এতে রয়েছে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড, আয়রন, ভিটামিন এ, ডি, ই ও বি-১২, কোলিন এবং মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ডিএইচএ। শিশুর বৃদ্ধি, রক্তাল্পতা প্রতিরোধ এবং মানসিক বিকাশ— সব ক্ষেত্রেই ডিমের কার্যকারিতা সুপ্রতিষ্ঠিত। একই সঙ্গে এটি তুলনামূলক ভাবে সস্তা, সহজলভ্য, রান্না ও বিতরণে সুবিধাজনক এবং শিশুদের কাছে গ্রহণযোগ্য। জনস্বাস্থ্যের কর্মসূচিতে এই চারটি বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় বিরল।
এখানে খাদ্যাভ্যাসের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। মিড-ডে মিল কোনও পরীক্ষাগারের খাদ্যতালিকা নয়; এটি একটি সামাজিক কর্মসূচি। তাই স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে মেনু নির্ধারণ করলে তার গ্রহণযোগ্যতা কমে। তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশার মতো রাজ্যে নিরামিষভোজীর সংখ্যা কম হওয়ায় মিড-ডে মিলে ডিম দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও নিরামিষভোজী শিশুদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, সংখ্যাগরিষ্ঠের খাদ্যাভ্যাস সংখ্যালঘুর উপর চাপিয়ে দেওয়া নয়, আবার সংখ্যালঘুর খাদ্যাভ্যাসের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠের পুষ্টিও বিসর্জন দেওয়া নয়— বরং দুইয়ের মধ্যে বাস্তবসম্মত ভারসাম্য তৈরি করাই নীতির লক্ষ্য।
মিড-ডে মিলের উদ্দেশ্য কখনওই কোনও বিশেষ খাদ্যদর্শন প্রতিষ্ঠা করা নয়। এই কর্মসূচি চালু হয়েছিল শিশুদের অপুষ্টি কমানো, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো এবং শিক্ষার সঙ্গে ন্যূনতম পুষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। সেই উদ্দেশ্যের নিরিখেই মেনু বিচার হওয়া উচিত। কোনও খাদ্যকে ‘নৈতিক ভাবে শ্রেষ্ঠ’ বা ‘সবার জন্য গ্রহণযোগ্য’বলে ধরে নেওয়া— এমন এক অবাস্তব ধারণার উপরে ভিত্তি করে নীতি নির্মাণ করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিশুরাই। জননীতিতে মতাদর্শের জায়গা আছে, কিন্তু পুষ্টিবিজ্ঞানের জায়গা তারও আগে। শিশুদের পাতে কী পড়বে, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তা ঠিক করা উচিত।