সব যৌন-নির্যাতনের ঘটনা কি আমাদের সমান ভাবে নাড়া দেয়? প্রতিটি ঘটনার পরেই কি আমরা সমান ভাবে প্রশ্ন তুলি, প্রতিবাদ করি, শাস্তির দাবি জানাই? বাস্তব বলছে, তা করি না। ‘আরও একটি ধর্ষণ’, ‘নারীরা নিরাপত্তাহীন’, ‘কঠোর শাস্তি চাই’— এই পরিচিত প্রতিক্রিয়াগুলির আড়ালে একটি অস্বস্তিকর সত্য চাপা পড়ে যায়। সব যৌন-হিংসার ঘটনা আমাদের কাছে সমান ভাবে দৃশ্যমান নয়। সব ভুক্তভোগী সমান ভাবে শোকযোগ্যও নন।
আইনের চোখে প্রত্যেক যৌন-হিংসাই সমান গুরুতর অপরাধ। কিন্তু সমাজ ঘটনাকে শুধু অপরাধ হিসাবে দেখে না; তার সামাজিক অর্থও নির্ধারণ করে। সেই অর্থ নিরপেক্ষ নয়। তাই কোনও ধর্ষণের ঘটনা দীর্ঘ দিন জনস্মৃতিতে থেকে যায়, কোনওটি কয়েক দিনের মধ্যেই হারিয়ে যায়। কোনও ঘটনায় রাষ্ট্র তৎপর হয়, সংবাদমাধ্যম ধারাবাহিক প্রচার চালায়, জনরোষ তৈরি হয়; আবার অধিকাংশ ঘটনাই নীরবে পরিসংখ্যানের অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। যৌন-হিংসার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরেই। সেই রাজনৈতিক জীবনই অনেক সময় নির্ধারণ করে, ঘটনাটি ইতিহাসে জায়গা পাবে, না কি বিস্মৃত হবে।
এখানেই ক্ষমতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতা শুধু শাস্তি দেয় না; কী গুরুত্বপূর্ণ, কোন ঘটনাকে সমাজ গুরুত্ব দেবে, কোনটিকে উপেক্ষা করবে, সেই জ্ঞানও তৈরি করে। দৃশ্যমানতা তাই স্বতঃস্ফূর্ত নয়, সামাজিক ভাবে নির্মিত। ফলে কিছু ভুক্তভোগী হয়ে ওঠেন ‘জাতির কন্যা’; তাঁদের যন্ত্রণা জাতীয় বিবেককে নাড়া দেয়। অন্য দিকে, বহু মানুষ কেবল একটি এফআইআর নম্বর বা আদালতের মামলা হিসাবেই থেকে যান। অপরাধ একই রকম গুরুতর হলেও, সমাজের প্রতিক্রিয়া এক রকম থাকে না। এই পার্থক্যই ভাবায়, ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আমরা কি সত্যিই সবাইকে সমান চোখে দেখি?
এই বিভাজন কেবল রাষ্ট্র তৈরি করে না। সমাজ ও সংবাদমাধ্যমও তার সক্রিয় নির্মাতা। সমাজ এক ধরনের ‘আদর্শ ভুক্তভোগী’-র কল্পনা করে নেয় এবং সমস্ত সহানুভূতি তাঁর উপরে কেন্দ্রীভূত করে। কিন্তু যৌনকর্মী, দলিত, আদিবাসী, ট্রান্সজেন্ডার বা সমাজের প্রান্তিক মানুষের উপরে একই ধরনের যৌন-হিংসা অনেক সময় সেই জনরোষ সৃষ্টি করতে পারে না। ভুক্তভোগীর সামাজিক অবস্থান, শ্রেণি, ভাষা, শিক্ষা কিংবা নগরকেন্দ্রিক পরিচয়— সবই আমাদের সহানুভূতির মাত্রাকে প্রভাবিত করে। ফলে সমাজে এক অদৃশ্য শ্রেণিবিন্যাস তৈরি হয়, যেখানে কিছু মানুষের যন্ত্রণা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, আর অন্যদের যন্ত্রণা অদৃশ্য থেকে যায়।
আধুনিক সংবাদমাধ্যম এই বৈষম্যকে আরও জটিল করে। আজ বাস্তবতার সঙ্গে দৃশ্যমানতার সম্পর্ক গভীর। যা সম্প্রচারিত হয়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে যৌন-হিংসার ঘটনাও সংবাদ-অর্থনীতির অংশ হয়ে পড়ে। প্রতি দিন অসংখ্য অপরাধের মধ্যে সংবাদ হয়ে ওঠে সেই ঘটনাই, যার মধ্যে নাটকীয়তা আছে, রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে, অথবা জনমনের আবেগকে নাড়া দেওয়ার ক্ষমতা আছে। অনিচ্ছাকৃত ভাবেই তৈরি হয় এক ধরনের নৈতিক বাজার, যেখানে যৌন-হিংসার ঘটনাগুলিরও যেন আলাদা বাজারদর তৈরি হয়। এই বাজারে সব ভুক্তভোগীর কণ্ঠস্বর সমান জোরে শোনা যায় না।
এই বাস্তবতা আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। কারণ, আলোচিত প্রতিটি ঘটনার পরে আমরা প্রায়শই শাস্তির মাত্রা নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু খুব কমই প্রশ্ন করি— কেন এই হিংসা বার বার ফিরে আসে? কেন নারীর শরীরই পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার প্রদর্শনের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে? আরও বড় প্রশ্ন, কেন কিছু ভুক্তভোগীর প্রতি সমাজের সহানুভূতি এত বেশি, আর অন্যদের ক্ষেত্রে এত কম? যে সমাজ নিজের সহানুভূতিরও সমবণ্টন করতে পারে না, সেখানে শুধু কঠোর শাস্তি দিয়ে সমাধান অসম্ভব।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে যৌন-হিংসাকে শুধু নারী-নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসাবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি গণতন্ত্রেরও প্রশ্ন। কারণ, গণতন্ত্র শুধু ভোট, নির্বাচন বা আইনের সমতার উপরে দাঁড়িয়ে থাকে না; নাগরিকের সমান মর্যাদাবোধের উপরেও দাঁড়িয়ে থাকে। যদি কিছু মানুষের উপরে হওয়া অপরাধ বেশি দৃশ্যমান হয়, কিছু মানুষের মৃত্যু বেশি শোকযোগ্য হয়, আর কিছু মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রায় অনুপস্থিত থাকে, তা হলে ন্যায়বিচারের সামাজিক ভিত্তিই অসম হয়ে পড়ে। আইনের বই সকলের জন্য সমান হতে পারে, কিন্তু সামাজিক বিবেক যদি সমান না হয়, তা হলে গণতন্ত্রও অসম থেকে যায়।
যৌন-নির্যাতন তাই কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়। এটি আমাদের সমাজের নৈতিক মানদণ্ড, সংবাদমাধ্যমের অগ্রাধিকার, রাষ্ট্রের সংবেদনশীলতা এবং গণতন্ত্রের চরিত্র— সব কিছুকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। আদালতের রায়ে বিচার সম্পূর্ণ হয় না। প্রকৃত ন্যায়বিচার তখনই সম্ভব, যখন সমাজ প্রতিটি যৌন-হিংসাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখার নৈতিক ক্ষমতা অর্জন করবে। যে দিন কোনও ভুক্তভোগীর সামাজিক পরিচয় নয়, কেবল তাঁর উপরে সংঘটিত অন্যায়ই আমাদের সমান ভাবে নাড়া দেবে, সে দিনই গণতন্ত্র তার নৈতিক অর্থে পরিণত হবে। সেই পরিণতির অভাবই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক ব্যর্থতা।
মানবীবিদ্যা বিভাগ, সোয়াস, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন