E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

‘ভূতলের স্বর্গখণ্ডগুলি’

ব্যক্তিগত আক্রমণ, সমালোচনা আর নিন্দায় রবীন্দ্রনাথও অস্থির হয়েছেন। কোন নিরাসক্তির মন্ত্রে ক্রোধকে তিনি জয় করেছিলেন অক্রোধের শক্তিতে, যা হয়তো বা শুধুই সংযম বলে ভ্রম হয়?

নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৯ অগস্ট ২০২৬ ০৬:১২
নির্দ্বিধ: বন্ধন-মাঝে মুক্ত, রবীন্দ্রনাথ।

নির্দ্বিধ: বন্ধন-মাঝে মুক্ত, রবীন্দ্রনাথ। —শম্ভু সাহার তোলা ছবি, বিশ্বভারতীর সংগ্রহ থেকে।

এক বর্ষারাতের সমাপনে নিজের গানে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘এই ঘাসের ঝিলিমিলি,/ তার সাথে মোর প্রাণের কাঁপন এক-তালে যায় মিলি’। আর এক বর্ষণমুখর দিনের আবেশে মগ্ন কবি তাঁর অন্য এক গানে বলছেন, ‘মন চায়, হৃদয় জড়াতে কার চিরঋণে।’ মর্তের প্রেমে বিভোর কবি এখানে কি তাঁর পার্থিব বন্ধনের ইঙ্গিতই দিয়ে গেলেন না? ১৯৪১-এর ২৫ জুলাই শেষ বার শান্তিনিকেতন ছেড়ে কলকাতায় রওনা হওয়ার মুহূর্তে তাঁর চোখের কোণে কেন জল দেখেছিলেন সমাগতরা!

ইন্দিরাদেবীকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, পৃথিবী যে সৃষ্টিকর্তার একটা ফাঁকি এবং শয়তানের একটা ফাঁদ তা না মনে করে এ’কে বিশ্বাস করে... মানুষের মতো বেঁচে এবং মানুষের মতো মরে গেলেই যথেষ্ট’। কড়ি ও কোমল-এর ‘প্রাণ’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই’। ‘স্বর্গ হইতে বিদায়’ রবীন্দ্রনাথের আর একটি পদ্য যেখানে ‘সুখহীন, শোকহীন হৃদিহীন’ দেবলোকের ‘সুখস্বর্গভূমি’ থেকে ‘ধরিত্রীর অন্তহীন জন্মমৃত্যুস্রোতে’, ‘শত শত গৃহচ্যুত হতজ্যোতি নক্ষত্রের মতো’ অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষণে কবির উপলব্ধি, ‘স্বর্গে তব বহুক অমৃত,/ মর্ত্যে থাক সুখে দুঃখে অনন্তমিশ্রিত প্রেমধারা—/অশ্রুজলে চিরশ্যাম করি/ ভূতলের স্বর্গখণ্ডগুলি।’ জন্ম-মৃত্যু, হর্ষ-বিষাদ, বিরহ-মিলন, বৈভব ও রিক্ততা, পুষ্প ও কণ্টক, আলো ও ছায়ার মায়ায় রবীন্দ্রনাথ ‘ভূতলের স্বর্গখণ্ডগুলি’ চর্মচক্ষু ও হৃদয় দিয়ে যেমন আবিষ্কার করেছিলেন, তেমনই উপভোগও। মৃত্যু নিয়ে তিনি সংশয়াতীত ছিলেন না, কিন্তু পৃথিবীকে ভালবাসার প্রশ্নে কোনও দ্বিধার অবকাশ রাখেননি। যেমন বলেছিলেন, ‘বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি, সে আমার নয়।/ অসংখ্য বন্ধন-মাঝে মহানন্দময়, লভিব মুক্তির স্বাদ’, তেমনই তাঁর আর এক অকপট স্বীকারোক্তি, ‘আমি যে বেসেছি ভালো এই জগতেরে;/ পাকে পাকে ফেরে ফেরে/ আমার জীবন দিয়ে জড়ায়েছি এরে’।

স্বামী মেধসানন্দ, নিবৃত্তিমার্গের বিপ্রতীপে প্রবাহিত রবীন্দ্রনাথের এই জীবন-সরণিটিকে চিহ্নিত করেছিলেন প্রবৃত্তিমার্গ হিসেবে। তিনি লিখছেন, “বহিঃসৌন্দর্যের দ্বারপথ দিয়ে অন্তঃসৌন্দর্যের অন্তঃপুরে অভিসার, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আনন্দের মধ্যে দিয়ে ইন্দ্রিয়াতীত আনন্দের অভীপ্সা, বন্ধনের মধ্য দিয়ে বন্ধনাতীতের স্বাদলাভ— এই তাঁর ভাব ও সাধনা” (‘রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মচেতনা ও শ্রীরামকৃষ্ণ প্রসঙ্গ’)। প্রাচীন ভারতের তিনটি মহাসম্পদ রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মচেতনা ও জীবনদর্শনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল: বেদের নির্যাস উপনিষদ, মহাভারতের আকর গীতা এবং ত্রিপিটকের সার ধম্মপদ। এই তিন অনন্য উত্তরাধিকারেই আসক্তির ঊর্ধ্বে উঠে মুক্তিলাভের পথের সন্ধান পাওয়া যায়।

স্বদেশের পরাধীনতার গ্লানি, স্বজনবিয়োগ এবং দুঃখের আবর্তেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমাজগঠন, প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, বিশ্বভ্রমণ ও সৃষ্টির বিচিত্র ধারা অব্যাহত রেখেছেন। কর্মযোগী ঋষির মতোই সঞ্চিত সর্বস্ব নিয়ে আনন্দের সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলছেন, ‘বাঁধন যত ছিন্ন কর আনন্দে’। এই আহ্বানের ভিত্তি তাঁর সেই উপলব্ধি, ‘এই কথাটা ধরে রাখিস— মুক্তি তোরে পেতেই হবে’।

মৃত্যু ও পার্থিব আসক্তির ঊর্ধ্বে ওঠার কথা সবিশেষ জোর দিয়ে বলে গেলেও রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগত জীবনে কি সত্যিই দুঃখ ও মৃত্যুকে আনন্দে স্বীকার করে, জীবনের যাবতীয় আসক্তিকে সীমাহীন নির্লিপ্ততায় দূরে রাখতে পেরেছিলেন? ‘আমার যে সব দিতে হবে সে তো আমি জানি—/ আমার যত বিত্ত, প্রভু, আমার যত বাণী’, এই চরম সত্যকে অনুভব করেও, এক জন কবির মূল সম্পদ বাণীটুকুও যে এক দিন সমর্পণ করে যেতে হবে তা উপলব্ধি করেও তিনি গাইতে চেয়েছিলেন, ‘নিত্য যাহার থাকি কোলে/ তারেই যেন যাই গো ব’লে—/ এই জীবনে ধন্য হলেম তোমায় ভালোবেসে’।

তাঁর নানা রচনায় উল্লেখ করেছেন ঈশোপনিষদের সেই শ্লোকটির প্রসঙ্গ, যেখানে জগৎসংসারের উপর এক চরমসত্তার সর্বময় প্রভাব বর্ণনা করে ত্যাগের ভিতর দিয়ে ভোগের কথা বলা হয়েছে। এই মন্ত্রই মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন আশ্রমের জন্মের প্রেরণা হয়েছিল। প্রশ্ন জাগে, রবীন্দ্রজীবনে ত্যাগের আদর্শটা কোথায়? কোনও নির্দিষ্ট ঠিকানা, নির্দিষ্ট বেদনা বা মুহূর্তকে, নির্দিষ্ট প্রবৃত্তি, আহরণ বা সৃষ্টিধারা আঁকড়ে না ধরে ক্রমাগত এগিয়ে চলাই ছিল তাঁর ত্যাগের আদর্শ। ‘ত্যাগ’ প্রবন্ধে লিখেছেন, শিশু পূর্ণতরভাবে তার মা’কে পায় নাড়ির বাঁধন কাটার পরই। লিখেছিলেন, “পূর্ণতারূপে লাভ করার জন্যেই আমাদের ত্যাগ... যিনি মুক্ত হয়েছেন, তিনিই জগৎকে পান।” এই ভাবনারই অনুরণন ধ্বনিত তাঁর গানে, ‘মাটির বুকের মাঝে বন্দী যে জল মিলিয়ে থাকে, মাটি পায়না তাকে’। ভূগর্ভের জলকে মাটি ত্যাগের ভিতর দিয়ে বাষ্পরূপে মুক্তি দিলেই বৃষ্টিধারার স্পর্শে তার প্রকৃত পাওয়া হয় তাকে। ত্যাগ-নির্ভর পূর্ণতার জীবনসাধনায় মর্তের বাঁধন ছিন্ন করার পন্থা নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন গীতার কর্মযোগ, ‘যে যোগে আমরা অনাসক্ত হয়ে কর্ম করি’। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, “সংসারের মধ্যে একটি ত্যাগের ধর্ম আছে, তার বিধান অমোঘ। সে আমাদের কোথাও দাঁড়াতে দিতে চায়না; সে বলে কেবলই ছাড়তে হবে এবং এগোতে হবে।” ত্যাগকে তিনি দারিদ্রের রিক্ততা হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন পূর্ণতার সুযোগ হিসেবে।

দুঃখের আঘাতে ‘সুখকর’-এর থেকে দূরে সরার ভীতি তাঁকে গ্রাস করেনি। পার্থিব যন্ত্রণা রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি ও জীবনসাধনাকে শুদ্ধ করেছিল, দুঃখকে তিনি ভূমার প্রেক্ষিতে বিচার করে সুখের মতোই ‘কল্যাণকর’ মনে করেছিলেন। গেয়েছিলেন, ‘নয়নের জল গভীর গহনে আছে হৃদয়ের স্তরে,/ বেদনার রসে গোপনে গোপনে সাধনা সফল করে।’

কিন্তু দুঃখের কাছে, তাঁর জীবনদর্শনের বিপরীত অনুভবে, কখনওই কি হার মানেননি কবি? জীবনস্মৃতি-তে স্বীকার করেছেন, মা ও নতুন বৌঠান কাদম্বরীর মৃত্যুর পর জীবনের আসক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। সেই শূন্যতা অতিক্রম করতে তাঁর সহায়ক হয়েছিল প্রকৃতি: “এই দুঃসহ দুঃখের ভিতর দিয়া আমার মনের মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে একটা আকস্মিক আনন্দের হাওয়া বহিতে লাগিল, তাহাতে আমি নিজেই আশ্চর্য হইতাম।” কন্যা মীরার শোচনীয় পরিণয় পরিণামে এতটাই বিপর্যস্ত ছিলেন কবি যে রথীন্দ্রনাথকে এক চিঠিতে লিখলেন, মীরার বিয়ের রাত্রে স্নানের ঘরে যে গোখরো সাপটা তাকে দেখে ফণা তুলেছিল, তার কামড়েই তার মৃত্যু হলে ভাল হত সে দিন। তাঁর মুক্তির পথের অন্তরায় হয়ে, স্বজনের যন্ত্রণার কঠিন বন্ধনই কি তাঁর কণ্ঠে প্রকাশ করেছিল এই অসহায় উচ্চারণ?

আর একবার বৈঠকখানায় বিছের দংশন যন্ত্রণা-কাতর রবীন্দ্রনাথ কী ভাবে নিজের শরীর থেকে আত্মাকে বিশ্লিষ্ট করেছিলেন, সে-কথা লিখেছিলেন স্ত্রী মৃণালিনীকে এক চিঠিতে, “আমার দেহকে আমার আপনার থেকে বাইরের জিনিস বলে অনুভব করতে চেষ্টা করলুম... শরীরে কষ্ট হতে লাগল অথচ সেটা আমার মনকে এত কম ক্লিষ্ট করলে যে আমি সেই যন্ত্রণা নিয়ে ঘুমতে পারলুম। তাঁর থেকে আমি যেন মুক্তির একটা নতুন পথ পেলুম।” ব্যক্তিগত আক্রমণ, সমালোচনা আর নিন্দায় রবীন্দ্রনাথও অস্থির হয়েছেন। কোন নিরাসক্তির মন্ত্রে ক্রোধকে তিনি জয় করেছিলেন অক্রোধের শক্তিতে, যা হয়তো বা শুধুই সংযম বলে ভ্রম হয়? রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, তাঁর ‘কর্তব্যবুদ্ধি’ আসলে তাঁর ‘সৌন্দর্যবোধ’। “যখন বাইরের সঙ্গে মন কলহ করতে উদ্যত হয় হয় তখন সেই ইতরতায় আমি নিজেকে অসুন্দর দেখি। তাতেই কষ্ট পাই” (‘পথে ও পথের প্রান্তে’)। সুন্দরের বন্ধন, এখানে যেন তাঁকে দিয়ে গেল জাগতিক ক্রোধ এবং বিদ্বেষে অনাসক্ত হওয়ার ইন্ধন।

‘আপনার’ থেকে নিজেকে মুক্ত করার, ক্ষুদ্র ‘আমি’র ঊর্ধ্বে বড় ‘আমি’কে খুঁজে পাওয়ার ভাবনা রবীন্দ্রনাথের চিন্তার জগৎ আচ্ছন্ন করেছিল। তিনি তাঁর জীবনপথে যার অন্বেষণ করেছিলেন তা ছিল ‘ক্ষণিক পৃথিবীর জিনিসকে’ অতিক্রম করে আত্মার মুক্তি। সে কারণেই হয়তো এ কথা বলেছিলেন, “আমার মধ্যে বন্ধনের জোর বেশি বলেই আমার মধ্যে মুক্তির আগ্রহ এত বেশি প্রবল।” বন্ধনের জোরেই তিনি মর্তের প্রেমে ব্যাকুল হয়েও চরমতম সত্য, পরমতম সত্তাকে পাওয়ার পূর্ণতার ভিতর দিয়ে মুক্তির অভিসারী হয়েছিলেন। একটি পৃথিবীকেই রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন তার ‘বাঁধন ছেঁড়ার সাধন’-কে চরিতার্থ করার প্রয়োজনে। তাঁর নিজের বিশ্বাসে গেয়েছিলেন, ‘যদি তোমার দেখা না পাই প্রভু এবার এ জীবনে, তবে তোমায় আমি পাইনি যেন সেই কথা রয় মনে।/ যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই শয়নে স্বপনে।’

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Rabindranath Tagore

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy