E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

জাতিগঠনের অগ্রদূত

তাঁর একদা-ছাত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, এক দিকে তিনি যেমন সমগ্র জীবন ঈশ্বরের সেবায় নিবেদন করেছিলেন, অন্য দিকে তেমনই দেশের উন্নতির জন্য নিরন্তর নানা পরিকল্পনা প্রণয়ন করে গিয়েছেন।

সন্দীপন মিত্র

শেষ আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৫০

ভারতে ইংরেজি-শিক্ষিত একটি শ্রেণি গড়ে তুলেছিল ব্রিটিশরা, তাদের প্রশাসনিক প্রয়োজনে। এই শ্রেণি রক্ত ও বর্ণে ভারতীয় হলেও রুচি, মতামত, নৈতিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিতে ছিল ইউরোপীয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে পাশ্চাত্যের মুক্ত চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সহযোগিতায়, তারা সমাজ সংস্কারে সচেষ্ট হয়। শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে সেই একই গোষ্ঠীর মধ্যে বিপরীতমুখী এক প্রবণতা দেখা দেয়। সংস্কারের পরিবর্তে, তারা ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবনে মনোনিবেশ করে। এই কাজ করতে গিয়ে তারা অনেক সময় বিতর্কিত প্রথারও পক্ষ সমর্থন করে।

জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদরা দীর্ঘদিন ঊনবিংশ শতাব্দীকে এ ভাবেই দেখে এসেছেন। কিন্তু সূক্ষ্মতর বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয় যে ঐতিহ্য ও আধুনিকতা পরস্পরবিরোধী নয়, তেমনই সংস্কার ও পুনরুজ্জীবনকেও একে অপরের থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা যায় না। কারণ প্রতিটি সংস্কার-প্রক্রিয়ার মধ্যে পুনরুজ্জীবন-প্রক্রিয়ার লক্ষণ নিহিত ছিল, আবার প্রতিটি পুনরুজ্জীবন-প্রক্রিয়ার মধ্যে সংস্কার-প্রক্রিয়ার লক্ষণ নিহিত ছিল। তা ছাড়া এই উভয় প্রক্রিয়াই এমন সব স্ববিরোধে পূর্ণ ছিল যা ছিল তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আপতিক নয়। রাজনারায়ণ বসু (১৮২৬-১৮৯৯) এই যুগের অন্যতম বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ও চিন্তাধারা সমকালীন বৌদ্ধিক পরিবেশের যথার্থ দৃষ্টান্ত।

রাজনারায়ণ বসুর পূর্বপুরুষদের বাস ছিল গোবিন্দপুরে। দ্বিতীয় ফোর্ট উইলিয়াম নির্মাণের সময় বাস্তুচ্যুত হয়ে তাঁরা বাহির-শিমলা অঞ্চলে জমি পান। কয়েক প্রজন্ম পর পরিবারটির একটি শাখা অধুনা দক্ষিণ ২৪ পরগনার বোড়ালে চলে যায়, সেখানেই রাজনারায়ণের জন্ম। তাঁর পিতা নন্দকিশোর বসু কিছুকাল রামমোহন রায়ের সচিব হিসেবে কাজ করেন এবং পরে বিভিন্ন সরকারি পদে কর্মরত ছিলেন। সাত বছর বয়সে রাজনারায়ণকে তাঁর পিতা শিক্ষার জন্য কলকাতায় নিয়ে আসেন। ১৮৪০ সালে হেয়ার স্কুল থেকে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি হিন্দু কলেজে ভর্তি হন, সহপাঠী হিসেবে পান মাইকেল মধুসূদন দত্ত, প্যারীচরণ সরকার ও ভূদেব মুখোপাধ্যায়কে। ইংরেজি সাহিত্যের ধ্রুপদী ও ঐতিহাসিক গ্রন্থের গভীর অধ্যয়নে তিনি ইংরেজি ভাষায় বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন, পাশাপাশি বিশ্বের নানা ধর্ম নিয়েও পড়াশোনা করেন। এই চর্চা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয় এবং তাঁকে অজ্ঞেয়বাদী করে তোলে।

রাজনারায়ণ বসু ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। অধ্যক্ষ ডি এল রিচার্ডসন তাঁকে বিশেষ স্নেহ করতেন। কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি একাধিক বার বৃত্তি লাভ করেন। ১৮৪৫ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, অ্যাডাম স্মিথের দ্য থিয়োরি অব মোরাল সেন্টিমেন্টস (১৭৫৯) গ্রন্থটির উপরে বিশেষ পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের জন্য তাঁকে রৌপ্যপদক প্রদান করা হয়। তবে অসুস্থতার কারণে তিনি প্রায়ই কলেজে অনুপস্থিত থাকতেন। হিন্দু কলেজের তৎকালীন সচিব রসময় দত্তের উদ্দেশে লেখা তাঁর ছুটির একটি আবেদনপত্র আজও প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত আছে। অবশেষে ১৮৪৫ সালে তিনি কলেজ ত্যাগ করেন এবং চার বছর পর ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে সংস্কৃত কলেজে যোগ দেন।

১৮৫১ থেকে ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত রাজনারায়ণ বসু মেদিনীপুর জেলা স্কুলের, বর্তমানে মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলের, প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি শারীরিক শাস্তি রদ করে, শিক্ষক-ছাত্রের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে, পারস্পরিক মতবিনিময়-ভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতি গ্রহণ করে এবং বিতর্ক ও খেলাধুলাকে উৎসাহ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সর্বাঙ্গীণ বিকাশ নিশ্চিত করেন। তিনি চরিত্র গঠনমূলক শিক্ষার উপর জোর দেন। ছাত্রদের মনোযোগ ধরে রাখতে এমন বেঞ্চের ব্যবস্থা করেন যাতে পিছন দিকে হেলান দিয়ে বসা যায়। বিদ্যালয়ের বাইরেও তিনি মেদিনীপুরের জনজীবন সমৃদ্ধ করেন একটি বালিকা বিদ্যালয়, কর্মজীবী মানুষদের জন্য একটি নৈশ বিদ্যালয় এবং একটি সাধারণ গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করে, যা বাংলার প্রাচীনতম সাধারণ গ্রন্থাগার। তাঁর কাজে সরকার এতই মুগ্ধ হয়েছিল যে তাঁকে একাধিক বার পদোন্নতির প্রস্তাব দেওয়া হয়, কিন্তু তিনি মেদিনীপুরেই থেকে যান।

রাজনারায়ণ বসুর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ১৮৪৫ সালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ। তিনি আদি ব্রাহ্ম সমাজে যোগ দেন এবং দেবেন্দ্রনাথের কাছে সংস্কৃত শিখে প্রধান উপনিষদগুলির অনুবাদে হাত দেন। তিনি ব্রাহ্মধর্মকে হিন্দুধর্মের উচ্চতর রূপ বলে মনে করতেন এবং বিশ্বাস করতেন যে বেদান্তের আলোকে সমকালীন হিন্দুধর্মের সংস্কার প্রয়োজন। হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব (১৮৭৩) গ্রন্থে তাঁর যুক্তি ছিল, হিন্দুধর্ম শ্রেষ্ঠ, কারণ এতে ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে কোনও মধ্যস্থতাকারীর স্থান নেই, হিন্দুরা ঈশ্বরকে আত্মার আত্মা মনে করে এবং জীবনের প্রতিটি কাজের মধ্য দিয়ে তাঁর উপাসনা করে। জীবনের শেষ পর্বে তিনি হিন্দুদের মধ্যে প্রকৃত ধর্মীয় চেতনা পুনরুজ্জীবিত করে তাঁদের ঐক্যবদ্ধ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই লক্ষ্যেই অ্যান ওল্ড হিন্দু’জ় হোপ (১৮৮৮) গ্রন্থে তিনি একটি ‘মহা হিন্দু সমিতি’ গঠনের প্রস্তাব করেন।

রাজনারায়ণ বসুর সবচেয়ে বড় অবদান স্বদেশচেতনার প্রসার। ১৮৬৭ সালে তিনি ‘শিক্ষিত বাঙালিদের মধ্যে জাতীয় গৌরবেচ্ছা সঞ্চারিণী সভা সংস্থাপনের প্রস্তাব’ শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। এই প্রস্তাবে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশবাসীর মধ্যে স্বাজাত্যবোধ ও দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জাগাতে নবগোপাল মিত্র ঠাকুর পরিবারের পূর্ণ সহযোগিতায় হিন্দু মেলা প্রতিষ্ঠা করেন। এই মেলা প্রথমে চৈত্র মেলা নামে পরিচিত ছিল, কারণ এটি চৈত্র মাসের শেষ দিনে অনুষ্ঠিত হত। এর লক্ষ্য ছিল প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকলা ও বিজ্ঞান, সঙ্গীত ও চিকিৎসাশাস্ত্র, দেশীয় শিল্প এবং শরীরচর্চার পুনরুজ্জীবন। মেলার দ্বিতীয় অধিবেশনের জন্য সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেন ‘মিলে সবে ভারত-সন্তান, একতান গাও গান’, যা সে সময় জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে সমাদৃত হয়। হিন্দু মেলা থেকে গড়ে ওঠে ন্যাশনাল সোসাইটি ও ন্যাশনাল পেপার।

রাজনারায়ণ বসু ন্যাশনাল সোসাইটির বিভিন্ন অধিবেশনে তিনটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। তার মধ্যে একটিতে তিনি প্রশ্ন তোলেন, জ্ঞান অর্জনের জন্য আমাদের কেন ইংরেজির উপর নির্ভর করতে হবে? তিনি বাংলা ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষার চর্চার পক্ষে জোরালো মত প্রকাশ করেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন জাতীয় অগ্রগতি অনেকাংশে জাতীয় সাহিত্যের উপর নির্ভরশীল, আর জাতীয় ভাষার বিকাশ ছাড়া জাতীয় সাহিত্যের উন্নতি সম্ভব নয়। পরে ন্যাশনাল সোসাইটির উদ্যোগে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে জরিপবিদ্যা, ইঞ্জিনিয়ারিং, রসায়ন, সঙ্গীত, বন্দুক চালানো, অশ্বারোহণ ও ব্যায়াম শেখানো হত। হিন্দু মেলা-ই ব্রিটিশ ভারতের প্রথম উল্লেখযোগ্য জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক সংগঠন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (১৮৭৬) গঠনের পথ প্রশস্ত করেছিল। রাজনারায়ণ বসু ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন-এরও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।

১৮৭৬ সালে রাজনারায়ণ বসু কলকাতায় ‘সঞ্জীবনী সভা’ নামে একটি গোপন সমিতি গড়ে তোলেন। এই সমিতি দেশীয় পদ্ধতিতে দেশলাই কাঠি এবং দেশীয় তাঁতে বোনা কাপড় প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেয়। এখানে জাতীয় পোশাক কী হতে পারে, সে বিষয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর বিভিন্ন প্রস্তাব পেশ করেন। অনেক ইতিহাসবিদ সঞ্জীবনী সভাকে পরবর্তী কালে বিপ্লবীদের গড়ে তোলা গোপন সমিতিগুলির অগ্রদূত হিসেবে গণ্য করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনস্মৃতি (১৯১২) থেকে জানা যায়, এই সভায় বিভিন্ন বর্ণের মানুষ অবাধে মেলামেশা করতেন। রাজনারায়ণ বসুর সাংগঠনিক দক্ষতার আর একটি নিদর্শন, ১৮৭৫ সালের ১ জানুয়ারি তাঁর নিজের মহাবিদ্যালয়ের প্রথম পুনর্মিলনী আয়োজনে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা। এই উপলক্ষে তিনি কলেজের ইতিহাস নিয়ে একটি ভাষণ দেন, যা পরে ‘হিন্দু অথবা প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিবৃত্ত’ (১৮৭৬) শিরোনামে প্রকাশিত হয়। এটিই ছিল ওই প্রতিষ্ঠানের প্রথম ইতিহাস।

রাজনারায়ণ বসুকে স্মরণ করে তাঁর একদা-ছাত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, এক দিকে তিনি যেমন সমগ্র জীবন ঈশ্বরের সেবায় নিবেদন করেছিলেন, অন্য দিকে তেমনই দেশের উন্নতির জন্য নিরন্তর নানা পরিকল্পনা প্রণয়ন করে গিয়েছেন। তবে রবীন্দ্রনাথকে তাঁর প্রতি সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল তাঁর চরিত্রে পরস্পরবিরোধী বৈশিষ্ট্যের সহাবস্থান, যা ছিল সেই যুগের বৈশিষ্ট্য। এই বিষয়টি রাজনারায়ণের সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা ‘সেকাল আর একাল’-এ (১৮৭৪) সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। রচনাটি আদতে ন্যাশনাল সোসাইটিতে প্রদত্ত ভাষণ। রচনাটিতে তিনি দু’টি সময়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন। ১৬৯০ থেকে ১৮১৬ সাল পর্যন্ত ‘সেকাল’, যখন বাঙালিরা শারীরিক ও আধ্যাত্মিক ভাবে অধিকতর বলিষ্ঠ ও সুদৃঢ় ছিল, এবং ১৮১৬ থেকে ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত ‘একাল’, যখন অন্ধ অনুকরণের ফলে দেশীয় মূল্যবোধ ও জ্ঞানচর্চার ধারা দ্রুত পাশ্চাত্য শিক্ষা ও ভিক্টোরীয় নৈতিকতা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হচ্ছিল। গভীর আত্মসমালোচনামূলক এই রচনাটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল আধুনিক হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা এবং একই সঙ্গে যা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে তার জন্য গভীর বিষাদ, এমন এক স্ববিরোধিতা যা ‘ভারতীয় আধুনিকতা’র অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Renaissance

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy