ভারতের ইতিহাসে অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ফোনটি করা হয়েছিল ১৯৯৫ সালের ৩১ জুলাই। কলকাতা থেকে নয়াদিল্লির ‘সঞ্চার ভবন’-এ ফোনটি করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। উল্টো দিকে ছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় যোগাযোগ মন্ত্রী সুখরাম। এটিই ছিল দেশের প্রথম মোবাইল কল। এর দু’সপ্তাহ পরে, স্বাধীনতা দিবসে দেশে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য চালু হল ইন্টারনেট পরিষেবা।
আর এই শতকের শুরু থেকে ঘরে ঘরে মোবাইল পৌঁছে যেতে থাকল। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বিপুল পরিবর্তন এল। সরকারি পরিষেবায় দালাল-চক্রের অবসান, যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপুল উন্নতি, ওয়েব সার্চ করে নিমেষে বিশ্বের তথ্যভান্ডার হাতের মুঠোয় উঠে আসা ইত্যাদি।
ডিজিটাল ডিভাইড বা ইন্টারনেট থাকা ও না-থাকার ব্যবধানও ক্রমশ প্রকট হল। ২০১৫ সালেও দেশে মাত্র দশ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করতেন। এখন অবশ্য মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারে ভারত উন্নত দেশগুলির প্রায় সমতুল— একশো কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। তবে বিশ্বে দু’শো কোটিরও বেশি মানুষ এখনও ইন্টারনেটের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এঁরা ক্রমশ আরও পিছিয়ে পড়ছেন।
২০০৫ সালে জ্যান ফন ডেইক তাঁর গ্রন্থ দ্য ডিপেনিং ডিভাইড: ইনইক্যুয়ালিটি ইন দি ইনফর্মেশন সোসাইটি-তে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যেও দ্বিতীয় স্তরের ডিজিটাল ডিভাইড নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর মতে, এর পিছনে চারটি কারণ রয়েছে। এক, ইন্টারনেট ব্যবহার করতে অনিচ্ছা বা ভীতি; দুই, যথাযথ বাহ্যিক পরিকাঠামো— যেমন ইন্টারনেট সংযোগের স্পিড, ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনের গুণমান ও ক্ষমতা, সফটওয়্যার সাবস্ক্রিপশন ইত্যাদি— নাগালের বাইরে থেকে যাওয়া; তিন, ইন্টারনেট ব্যবহার করার প্রয়োজনীয় দক্ষতা; এবং চার, ইন্টারনেট ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় সময়। ডেইক ও পরবর্তী গবেষকরা দেখিয়েছেন, এই চারটি বিষয় আবার লিঙ্গ, জাতি, বয়স, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান এবং সর্বোপরি শিক্ষার উপরে বিপুল ভাবে নির্ভরশীল। যেমন, ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ)-এর বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, গোটা পৃথিবীতেই পুরুষরা মহিলাদের থেকে অনেক বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। তেমনই, গ্রামে ও শহরেও বিরাট পার্থক্য। অর্থাৎ, প্রাক্-ইন্টারনেট যুগের বিভিন্ন অসাম্য এই যুগেও প্রতিফলিত হচ্ছে। কেউ কেউ একে অ্যাডভার্স ডিজিটাল ইনকর্পোরেশন বলেছেন— মানুষকে ইন্টারনেটে যুক্ত করে রাষ্ট্র ও কিছু প্রতিষ্ঠান তাঁদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করছে।
চেনা প্রযুক্তির দুনিয়া এখন ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বিপুল বিনিয়োগ-নির্ভর এই মহাশক্তিশালী প্রযুক্তি এখনও মুষ্টিমেয় দেশের ও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের করায়ত্ত। বিপুল আর্থিক অসাম্য ছাড়াও সামরিক ক্ষেত্রেও তা অশনিসঙ্কেত। এআই ব্যবহারের খরচও (টোকেন কস্ট) ক্রমশ বাড়ছে। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্যও চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো এআই চ্যাটবটগুলি বেশ কিছু সুযোগসুবিধা ক্রমশ বিনামূল্যে পরিষেবা থেকে পেড সাবস্ক্রিপশন-এ সরিয়ে নিচ্ছে।
অসাম্য ও পক্ষপাতের সূত্রপাত অবশ্য এআই-এর গঠনেই। এই প্রযুক্তি মূলত অতীতের তথ্যনির্ভর। এক বিপুলায়তন ই-কমার্স সংস্থার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এআই ব্যবহার করে দেখা গিয়েছে যে, সমযোগ্যতার মহিলা ও কৃষ্ণাঙ্গদের তুলনায় পুরুষ ও শ্বেতাঙ্গদের অনেক বেশি নিয়োগ করা হচ্ছে। আমেরিকায় বিচারব্যবস্থায় ব্যবহৃত একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার সিস্টেম অডিট করে দেখা গিয়েছিল যে, কৃষ্ণাঙ্গ অপরাধীদের শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় দ্বিগুণ অপরাধপ্রবণ বলা হচ্ছে।
এই মুহূর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলে তৈরি হওয়া সমস্যাগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল বিপুল কর্মহানি। একটি প্রসিদ্ধ পরামর্শদাতা সংস্থার সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০৩০-এর মধ্যে পৃথিবীতে চল্লিশ থেকে আশি কোটি মানুষের কর্মচ্যুতি হতে পারে— অবশ্য, সংস্থাটির মতে, এঁদের একটা অংশই নতুন কোনও কাজের সুযোগ পেতে পারেন। বহু ক্ষেত্রেই কর্মীদের দিয়ে এআই-এর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে শেষ পর্যন্ত তাঁদেরই সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। গভীরতর অসাম্য ও সামাজিক অস্থিরতার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠছে।
ইন্টারনেট বা এআই, উভয় ক্ষেত্রেই সমাধান হতে পারে ইন্টারনেটকে জল বা বিদ্যুতের মতো অত্যাবশ্যক পরিষেবা হিসাবে গণ্য করে প্রয়োজন অনুসারে ভর্তুকি দেওয়া, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পাবলিক ওয়াইফাই-এর ব্যবস্থা করা, ওপেন-সোর্স সফটওয়্যারের উপরে জোর দেওয়া, যাতে এআই-এর কোড ইন্টারনেটে পাওয়া যায়, গবেষক ও ছোট প্রতিষ্ঠানগুলি তা স্বল্পমূল্যে ব্যবহার করতে পারে। এ ছাড়া, এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারের জন্য সরকারের নিজস্ব এআই ডেটা সেন্টার ওকম্পিউটিং পাওয়ার (কম্পিউট) গড়ে তোলা। সর্বোপরি, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার, তবে সবার আগে প্রয়োজন নেতা ও প্রশাসকদের সদিচ্ছা।
নয়তো অদূর ভবিষ্যতেই দেখা যেতে পারে সেই ভয়ঙ্কর ছবি— কয়েকটি সুসজ্জিত সুখী পল্লিতে মুষ্টিমেয় মানুষ, আর তার বাইরে অগণিত রুগ্ণ দরিদ্র অভুক্ত জনতা।