E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

বিজ্ঞান পড়লে ভূগোল ফ্রি

যে বাড়িতে কোচিং চলে, তার গ্যারাজটিতে কোনও গাড়ি নেই, সারি সারি বেঞ্চ পাতা। ঘুলঘুলিহীন দশ ফুট বাই দশ ফুট ঘরে জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে পর্দা টাঙিয়ে চলছে পড়াশোনা। গরম থেকে বাঁচার জন্য প্রত্যুষে ক্লাসের নির্দেশ এসে লাভ কী হল তা হলে?

সন্দীপন নন্দী

শেষ আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২৬ ০৭:০৯

চারতলা ফ্ল‍্যাটবাড়ির ছাদ থেকে নীচ পর্যন্ত একখানা ঢাউস ফ্লেক্স ঝুলছে। ফুটবল বিশ্বকাপের মরসুমে মনে হয়, মেসি কিংবা নেমারের ছবি বুঝি। কাছে যেতে ভুল ভাঙে। গত মাধ‍্যমিকে অমুক কোচিং সেন্টার থেকে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া দুই ছাত্রের মুখ, নীচে বড় অক্ষরে লেখা “গ্যারান্টি আমার বিশ্বাস তোমার।” পাশে শিক্ষকের হাসিমুখের ছবি।

যে বাড়িতে কোচিং চলে, তার গ্যারাজটিতে কোনও গাড়ি নেই, সারি সারি বেঞ্চ পাতা। ঘুলঘুলিহীন দশ ফুট বাই দশ ফুট ঘরে জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে পর্দা টাঙিয়ে চলছে পড়াশোনা। গরম থেকে বাঁচার জন্য প্রত্যুষে ক্লাসের নির্দেশ এসে লাভ কী হল তা হলে? দুপুরের গরমে ঘেমেনেয়ে ক্লাস করছে ছোটরা, নানা কিসিমের প্রাইভেট পাঠশালায়। সরকারি শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশন বন্ধ করার সরকারি নির্দেশিকা আসার পর বালুরঘাটের পথে দেখা গিয়েছিল ছাত্রছাত্রীদের অভিনব মিছিল— স্কুলশিক্ষকের কাছে প্রাইভেটে পড়ার দাবিতে। এক ছাত্র বক্তব‍্যও রাখে মাইকে— যোগ্য বেকারদের চেয়ে স্কুলশিক্ষকের উপর তার বেশি ভরসা। সে স্কুলশিক্ষকদের কাছেই প্রাইভেটে পড়তে চায়।

নামী শিক্ষক, দামি কোচিং সেন্টার, ঘরের এক কোণে সরস্বতী ঠাকুরের উঁচু মূর্তি, তার পাশে নোটবইয়ের গোছা— পশ্চিমবঙ্গের জেলা শহরে স্কুলশিক্ষার চেহারা ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। বড় ব্র্যান্ডের কোচিং-এর শাখা তো খুলছেই, স্থানীয়রাও ‘ব্র্যান্ড’ হয়ে উঠতে নানা বিপণন কৌশল নিচ্ছে। যেমন ‘প্যাকেজ’ ব্যবস্থা— একটি কোচিং সেন্টারে সায়েন্স গ্রুপ পড়ার টাকা দিলে ভূগোল, ইতিহাসের পাঠ ফ্রি। কোথাও বা শিক্ষক স্বামীর কাছে ইংরেজি-বাংলা ও শিক্ষিকা স্ত্রীর কাছে বিজ্ঞান পড়লে এক মাসের বেতন মকুব। ‘অফার’ আসে নানা ভাবে। এক অভিভাবক তাঁর কন্যার জন‍্য ফিজ়িক্স গৃহশিক্ষকের সন্ধান পেয়েছিলেন। “দক্ষিণা কত স‍্যর?” প্রশ্ন করলে শিক্ষকের সটান জবাব, “ব্যাচ প্রতি দশ হাজার টাকা। আপনি যত বেশি ছাত্রছাত্রী জোগাড় করতে পারবেন, আপনার ভাগ তত কমবে।” অভিভাবক থেকে পিতার ভূমিকা নিমেষে হয়ে গেল দালালের। এমন নানা আকর্ষণের মুখে অভিভাবকরা দিশাহারা। কখনও এক ঠিকানায়, কখনও অন্য ঠিকানায় স্কুলব্যাগের ভিড় বাড়ে। কোথাও তিন মাসের বেতন অগ্রিম জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কোনও শিক্ষক বেতন পেতে দেরি হলে মাসের দশ তারিখে চিঠি পাঠান ছাত্রছাত্রীর বাড়িতে।

এত সব কিছুর মধ্যে কানের কাছে ফিসফিস করে যায় প্রশ্ন, “পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি?” দু’এক প্রজন্ম আগেও স্কুলের পড়াশোনার সঙ্গে বাড়তি লেখাপড়ার ব্যবস্থা বলে গণ্য হত কোচিং ব্যবস্থা। ক্রমে লেজই হয়ে উঠেছে কুকুর— শিক্ষক যদি জিজ্ঞেস করেন, “স্কুল আসিসনি কেন?” নির্লিপ্ত পড়ুয়া উত্তর দেয়, “প্রাইভেট ছিল।” কেন, তা জানা-ই। সরকারি স্কুলে নাম লিখিয়ে পড়াশোনার জন্য পড়ুয়ারা যায় কোচিং সেন্টারে। শিক্ষকের ঘাটতি, শিক্ষকদের দায়বদ্ধতার অভাব, এমন নানা কারণে সরকারি স্কুলগুলি সমালোচিত হয়। কিন্তু আড়ালে থেকে যায় কোচিংগুলি।

শিক্ষার মান, শিশুর নিরাপত্তা, শিশুর স্বাস্থ্য— এ সব কি সুরক্ষিত কোচিং সেন্টারে? ২৭ জুলাই, ২০২৪ দিল্লিতে একটি নামী ব্র্যান্ডের কোচিং সেন্টারের বেসমেন্ট-এর ক্লাসরুমে জল ঢুকে যায়। তিন জন শিক্ষার্থী প্রাণ হারায়, কোনও মতে বাঁচে বাকিরা। জানা যায়, বেসমেন্ট-এ ক্লাস করানোর অনুমোদন ছিল না দমকল বিভাগ থেকে। রাজ্যসভায় প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড় কোচিং সেন্টারগুলিকে ‘গ্যাস চেম্বার’ বলে অভিহিত করেন। এই ঘটনার পর রাজস্থানের কোটায় পুরসভার তরফে কোচিং সেন্টারগুলির পরিদর্শন হয়, নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়ে অনেক কথা হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের জেলা শহরগুলিতে কোচিং সেন্টার কোথায় চলছে, কত জন ছাত্রছাত্রী কী পরিবেশে কত ক্ষণ কাটাচ্ছে, কেউ জানে না। গ্যারাজ যখন ক্লাসরুম, তখন সেখানে শৌচাগারের ব্যবস্থা থাকার সম্ভাবনা কতটুকু?

শিক্ষাব্যবস্থা এখন দাঁড়িয়ে রয়েছে এক অদ্ভুত দোটানায়। এক দিকে শিক্ষা নীতি, স্কুলের পরিকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকের ডিএ নিয়ে অজস্র আলোচনা, বিপুল বরাদ্দ। অন্য দিকে শিক্ষার মূল কেন্দ্র সরে যাচ্ছে স্কুল থেকে। সে সব কোচিং, টিউশনে পাঠদানের বালাই নেই, শিক্ষকের যোগ্যতার কড়াকড়ি নেই, পরিকাঠামোর পরিদর্শন নেই। উত্তর ২৪ পরগনার একটি স্কুলের শিক্ষক বললেন, আধা-সামরিক বাহিনী তাঁদের স্কুল দখল করে ছিল ৭২ দিন। সব ছুটি মিলিয়ে বছরে বড় জোর ১০০ দিন ক্লাস হয়। সরকারি স্কুলই যেন ঠেলে দিচ্ছে বেসরকারি ক্ষেত্রের দিকে।

এরই মধ্যে শোনা যায় বিকল্পের কথা। কলকাতার এক নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শেষের পর সিনিয়র দাদা-দিদিরা জুনিয়রদের ক্লাস নেয়। শেলি থেকে জীবনানন্দ, কিটস থেকে বায়রন বড়দের মুখ থেকে মুগ্ধ হয়ে শোনে ছোটরা। আশা জাগে। শর্ত একটাই— প্রাইভেট পড়া নৈব নৈব চ। আবার দক্ষিণবঙ্গের এক আশ্রমিক স্কুল বিশেষ পরীক্ষার মাধ‍্যমে তিন রকম ছাত্রদের পৃথক করে, দক্ষতার স্তর অনুসারে স্কুলেই তাদের বিশেষ কোচিং-এর ব‍্যবস্থা করেছে। সাফল‍্য এসেছে হাতে হাতে। অনেক স্কুলে অবশ্য উৎসাহী শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা নেতিবাচক। ক্লাসের সময়ের পরে স্কুলেই দরিদ্র ছাত্রদের পড়াতে চাইলে স্কুল কর্তৃপক্ষ রাজি হননি। বাড়তি সময় স্কুল খুলে রাখার দায়িত্ব কে নেবে? তাই অগণিত ছাত্রছাত্রীর এখন ভরসা কোচিং। জেলা শহরের অলিগলিতে দেখা যায়, দলে দলে পড়ুয়া আসছে, আর বিশালাকার এক বস্তায় জুতো চটি ভরে একে একে ঘরে প্রবেশ করেছে। এটাই এ রাজ্যের শিক্ষাব‍্যবস্থার ছবি।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Education system Coaching Centres School students

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy