উচ্চশিক্ষার সঙ্গে বৈষম্যের সম্পর্কটি জটিল। একটি কলেজ ডিগ্রি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। কিন্তু উচ্চশিক্ষার পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে যে সব অসুবিধা বা বঞ্চনা, সেগুলিকে আমরা কী ভাবে চিহ্নিত করব? একটি বাধা অবশ্যই বর্ণবৈষম্য। ভারতে জাতিভিত্তিক সংরক্ষণের উদ্দেশ্য শিক্ষায় দীর্ঘ দিনের অসম সুযোগের মোকাবিলা করা। আর একটি সঙ্কট পরিবারের দারিদ্র। অপর একটি বিষয় তুলনায় কম আলোচিত: শিক্ষার্থীর পরিবারে আগে কখনও কেউ কলেজ পাশ করেছেন কি না। প্রশ্নটি জরুরি, কারণ উচ্চশিক্ষার সুযোগ যদি উচ্চশিক্ষিত পরিবারগুলির সন্তানদের মধ্যেই আবদ্ধ থাকে, তা হলে অসাম্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে চলবে। তাই উচ্চশিক্ষা কতটা বিস্তৃত হচ্ছে, তা বুঝতে গেলে পারিবারিক শিক্ষাগত ইতিহাসও দেখতে হবে। প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সংখ্যাবৃদ্ধি সামাজিক ন্যায়ের নিরিখে এক প্রধান বিবেচ্য।
ধরা যাক, দুই শিক্ষার্থীর পরিবারের বর্তমান আয় প্রায় সমান। এক জনের বাবা-মা বা দাদা-দিদিদের কেউ কলেজে পড়েছেন। অন্য জন নিজের পরিবারের প্রথম সদস্য, যিনি কলেজে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কাগজে তাঁদের আর্থিক অবস্থায় বিশেষ ফারাক দেখা না গেলেও, উচ্চশিক্ষার জগতে পথ খুঁজে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের অবস্থান এক নয়। যে পরিবারে আগে কেউ কলেজে গিয়েছেন, সেখানে অনেক ধরনের তথ্য সহজেই পরের প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়— কোন কলেজ ভাল, কোন বিষয় পড়লে কী সুযোগ, পড়াশোনায় সমস্যায় পড়লে কার কাছে যেতে হয়, ইত্যাদি। উচ্চশিক্ষার একটি অলিখিত জগৎ রয়েছে। প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়ার কাছে তার হদিস কমই থাকে।
প্রথম প্রজন্মের কলেজ-পডুয়াদের বিশেষ উৎসাহ দিলে কি বাড়তি ফল পাওয়া যায়? তামিলনাড়ুর একটি নীতি তা বোঝার সুযোগ দেয়। ২০১০ সালে রাজ্যটি ‘ফার্স্ট জেনারেশন গ্র্যাজুয়েট স্কলারশিপ’ চালু করে। যে সব পরিবারের কোনও সদস্য আগে কলেজ পাশ করেননি, সেখান থেকে এঞ্জিনিয়ারিং, মেডিসিন এবং কৃষিশিক্ষার পেশাগত পাঠক্রমে ভর্তি হলে টিউশন ফি মকুব করা হয়। সরকারি বা বেসরকারি, যে কোনও প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলে সম্পূর্ণ টিউশন ফি দিচ্ছে সরকার। এই প্রকল্পে ব্যয় রাজ্যের মোট উচ্চশিক্ষা ব্যয়ের প্রায় ১০-১৫ শতাংশ। ভর্তিতে সংরক্ষণ নয়, কেবল ফি মকুব। তাই এই নীতি জাতি বা আয়ভিত্তিক আসন-সংরক্ষণের পাশাপাশি চলতে পারে।
‘জার্নাল অব ইকনমিক বিহেভিয়র অ্যান্ড অর্গানাইজ়েশন’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন দেখাচ্ছে যে ওই স্কলারশিপ চালু হওয়ার পরে প্রথম প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের প্রযুক্তিগত বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার বেড়েছে। প্রযুক্তিগত বিষয় বেছে নেওয়া, এবং ডিগ্রি সম্পূর্ণ করার হারও বেড়েছে। স্কলারশিপের প্রভাবেই এটা সম্ভব হচ্ছে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। যাঁরা এই নীতির আওতায় পড়েছিলেন, তাঁদের কর্মজীবনের শুরুর পর্যায়েও ছাপ পড়ছে— ২৫-২৯ বছর বয়সিদের মধ্যে নিয়মিত বেতনের চাকরিতে কর্মরতদের হার বেড়েছে। কৃষি থেকে পরিষেবা ক্ষেত্রের দিকে তাঁরা সরে এসেছেন। বিশেষ প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োজন, এমন কাজে অংশগ্রহণ বেড়েছে। তাঁদের পরিবারের মাথাপিছু মাসিক ব্যয়ও বেড়েছে। পাশাপাশি, কাজ খুঁজছেন এমন তরুণের সংখ্যাও বেড়েছে।
এই স্কলারশিপ প্রকল্পটি কিন্তু বই, পরীক্ষার ফি, যাতায়াত, থাকা প্রভৃতি খরচ দিচ্ছে না। গবেষণায় প্রকাশ, এই খরচগুলি মেটাতে শিক্ষাঋণের ব্যবহার বেড়েছে, যার বড় অংশ এসেছে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে। অর্থাৎ সরকারি আর্থিক সহায়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ এক সঙ্গে প্রযুক্তিগত উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের পথ সহজ করতে পারে।
তামিলনাড়ুর অভিজ্ঞতা দেখায়, পারিবারিক শিক্ষাগত বঞ্চনা দূর করতে হলে আরও আসন সংরক্ষণ তৈরি করা আবশ্যক নয়। প্রচলিত সংরক্ষণ ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রথম প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের জন্য কোর্স ফি মকুব অতিরিক্ত সহায়তা হিসেবে কাজ করতে পারে। অন্য কোনও রাজ্য এই ধরনের নীতি চালু করার কথা ভাবলে, সেখানকার পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখতে হবে। প্রথম প্রজন্মের পরিচয় কী ভাবে নির্ধারণ ও যাচাই করা হবে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। কোর্স ফি-র বাইরের খরচ মেটাতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-ঋণের সহজলভ্য হওয়া চাই। পাশাপাশি, ভাল প্রযুক্তিগত প্রতিষ্ঠান কতটা নাগালের মধ্যে, সেখানে নিরাপদ যাতায়াত ও থাকার সুযোগ আছে কি না— এগুলিও নির্ণয় করবে কারা এই নীতির সুবিধা নিতে পারবেন।
উচ্চশিক্ষার সুযোগ কতটা বাড়ছে, তার পাশাপাশি দেখতে হবে সেই সুযোগের নাগাল কারা পাচ্ছেন। যে পরিবারে আগে থেকেই কলেজশিক্ষার অভিজ্ঞতা আছে, সেই অভিজ্ঞতা পরের প্রজন্মের পথ সহজ করতে পারে। আবার, যে পরিবারে আগে কেউ কলেজের ডিগ্রি পাননি, সেখানে প্রথম এক জনের ডিগ্রি অর্জন শুধু সেই পরিবারের শিক্ষাগত ইতিহাসই বদলায় না; এমন আরও পরিবারের শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের পথ সহজ হয়। তাই উচ্চশিক্ষায় কাদের সহায়তা প্রয়োজন, তা ভাবার সময়ে পরিবারের শিক্ষাগত ইতিহাসকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
পাবলিক পলিসি , আইআইএম ব্যাঙ্গালোর