E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

কথা যখন কাঠগড়ায়

খুনের মামলায় অভিযুক্তের ফোন পুলিশ পরীক্ষা করবে অবশ্যই, আইনের শর্ত মেনেই। কিন্তু তথ্য সংগ্রহ করার অধিকার থেকে সেই তথ্যের অর্থ একতরফা ভাবে স্থির করার অধিকার জন্মায় না।

মঈনউদ্দিন

শেষ আপডেট: ২১ অক্টোবর ২০২৬ ০৫:৩৯

কাউকে ‘খুনি’ প্রমাণ করা কঠিন। খারাপ মানুষ প্রমাণ করা তুলনায় সহজ, বিশেষত তাঁর ব্যক্তিগত কথাবার্তা হাতে থাকলে। আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই এমন কিছু বাক্য আছে, অপরাধের অভিযোগ উঠলে যে বাক্যগুলির অর্থ বদলে যায়। মানুষটি কী করেছেন, সেই প্রশ্নের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে অন্য একটি প্রশ্ন: তিনি আসলে কেমন মানুষ? বেঙ্গালুরু ও পুণেতে একাধিক খুনের তদন্তে অভিযুক্তদের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কথোপকথন সম্প্রতি সংবাদে এসেছে। এই কথোপকথন থেকে কী প্রমাণ করা যায়, আর তার বাইরে আমরা কী ধরে নিচ্ছি, সেই তফাতটি এখন জরুরি।

বেঙ্গালুরুতে তিনটি খুনের ঘটনায় পুলিশের দাবি, অভিযুক্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে লঙ্কাগুঁড়ো ও ভিনিগার দিয়ে হামলা চালানোর বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন। ঘটনাস্থলে ওই মিশ্রণের একটি বোতলও মিলেছে, যা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রশ্নের সঙ্গে অপরাধের প্রস্তুতির কোনও যোগ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখাই পুলিশের কাজ। ব্যক্তিগত কথোপকথন যদি অপরাধের প্রস্তুতির অংশ হয়ে থাকে, তবে গোপনীয়তার যুক্তিতে সেই তদন্ত বন্ধ রাখা চলে না।

এক পুলিশকর্তার বক্তব্য, অভিযুক্ত খুনের শাস্তি বা কাজটি ন্যায়সঙ্গত কি না, এআই চ্যাটবটের কাছে তা জানতে চাননি। কিন্তু এই না-জানতে চাওয়া থেকেই কি তাঁকে বিবেকহীন বলে ধরে নেওয়া যায়? যন্ত্রের কাছে বিবেকের কথা না-তোলা কি বিবেকহীনতার প্রমাণ? এই অনুপস্থিতিকেই যদি চরিত্রের প্রমাণ বলে গণ্য করা হয়, তবে নাগরিককে নিজের প্রতিটি আলাপে ভবিষ্যতের বিচারের জন্য সচ্চরিত্র হওয়ার প্রমাণ রেখে যেতে হবে। ক্রোধ প্রকাশ করলে তার পাশে অনুশোচনা, কৌতূহল দেখালে তার পাশে নৈতিকতার ঘোষণা জুড়ে দিতে হবে। তা কি কখনও সম্ভব?

পুণেতেও কেতন আগরওয়ালকে খুনের অভিযোগ তাঁর বাগ্‌দত্তার বিরুদ্ধে। পুলিশের দাবি, কেতনের মৃত্যুর পরে কী ভাবে শোক প্রকাশ করবেন, তা নিয়ে তিনি এআই-এর সাহায্য চেয়েছিলেন। তার আগে, ঝগড়ার পরে কেতনের মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে বার্তা লিখতেও চ্যাটজিপিটি-র সাহায্য নিয়েছিলেন তিনি। এই দু’টি তথ্য পাশাপাশি রাখলে কপটতার একটি গল্প তৈরি করা যায়: যাঁর শোক সাজানো, তাঁর অনুতাপও ধার করা। কিন্তু অনুভূতি প্রকাশের ভাষা ধার করার অর্থ কি অনুভূতিটিও ধার করা? নিজের শোক জানাতে অন্যের কবিতা ব্যবহার করার ঘটনা আমাদের অচেনা নয়। তা হলে এই ক্ষেত্রে ভাষার ঋণকেই অনুভূতির অসারতার প্রমাণ বলে ধরে নেওয়া হবে কেন?

নিজের ভাবনা স্থির হয়নি বলেই আমরা অনেক সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিই। যন্ত্র একটি প্রস্তাব দেয়, আমরা তাতে আপত্তি জানাই, অন্য ভাবে বলতে বলি, কখনও বা প্রস্তাবটি বাতিল করে দিই। কথোপকথনের প্রতিটি বাক্য তাই আমাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নয়; এমনকি নিজের মুখে বলা প্রতিটি কথাও সিদ্ধান্তের ঘোষণা নয়। কোনও প্রস্তাব দেখা, তা গ্রহণ করা এবং সেই অনুযায়ী কাজে নামা— তিনটি পৃথক ঘটনা। রাগের মাথায় একটি বার্তার খসড়া লিখে, পরে সেটি পড়ে আর না-পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই আছে। বার্তাটি না-পাঠানোর সিদ্ধান্তটি বাদ দিয়ে দিলে সেখানে শুধু আমার ক্রোধই ধরা পড়বে, সংযমের পরিচয় মিলবে না।

চিঠি বা ডায়েরি পড়ে মানুষের মনের হদিস পাওয়ার চেষ্টা নতুন নয়। ফোনের বার্তা কিংবা ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজার ইতিহাসের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন ওঠে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কথোপকথনে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর একটি বিষয়: সেখানে মানুষের নিজের কথার পাশাপাশি যন্ত্রের তৈরি ভাষাও থাকে। কিন্তু তথ্যের পরিমাণ বাড়লেই মানুষটিকে আরও নির্ভুল ভাবে জানা যায়, এমন বিশ্বাসের কোনও নিশ্চিত ভিত্তি নেই। কথা বলতে বলতে যে মানুষটি নিজের মত বদলাচ্ছেন, সংশয় কাটানোর চেষ্টা করছেন, কখনও নিজের বক্তব্য থেকেই পিছিয়ে আসছেন, তাঁকে কয়েকটি বাক্যের মধ্যে স্থির করে দেওয়ার অধিকার কার হাতে থাকবে?

খুনের মামলায় অভিযুক্তের ফোন পুলিশ পরীক্ষা করবে অবশ্যই, আইনের শর্ত মেনেই। কিন্তু তথ্য সংগ্রহ করার অধিকার থেকে সেই তথ্যের অর্থ একতরফা ভাবে স্থির করার অধিকার জন্মায় না। পুণের ঘটনায় ক্ষমা চেয়ে বার্তা লেখার খসড়ার সঙ্গে বিরোধের কোনও যোগ থাকলে তা খতিয়ে দেখা জরুরি। কিন্তু সেটি যদি কেবল অভিযুক্তকে ‘কপট’ প্রমাণ করার উপকরণ হয়ে ওঠে, তা হলে প্রশ্ন উঠবেই: অপরাধের সঙ্গে এই কথার সম্পর্ক কোথায়? ফৌজদারি বিচারে অভিযুক্তের মন্দ চরিত্র সাধারণত প্রাসঙ্গিক নয়। তাঁর ব্যক্তিগত কথাবার্তা আমাদের অস্বস্তিতে ফেলেছে বলে সেই নিয়মের ব্যতিক্রম হতে পারে না। কোন কথা কী ভাবে অপরাধের অভিযোগ প্রমাণ করে, তা দেখানোর দায় রাষ্ট্রের। নিজের চরিত্রের পক্ষে সওয়াল করে রাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট রাখার দায় অভিযুক্তের নয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি নথি বা ছবি আদালতে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সীমা টানা হয়েছে। গত বছর লস অ্যাঞ্জেলেসের দাবানলে বারো জনের মৃত্যু হয়। আগুন লাগানোর অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতারের পরে সাংবাদিক বৈঠকে সরকারি কৌঁসুলিরা জ্বলন্ত বন ও পালাতে থাকা মানুষের ছবি দেখান। তাঁদের দাবি ছিল, দাবানলের কয়েক মাস আগে অভিযুক্ত চ্যাটজিপিটি-কে দিয়ে ছবিগুলি আঁকিয়েছিলেন। কিন্তু বিচার শুরু হওয়ার আগেই বিচারক ছবিগুলি বাদ দেন। অভিযুক্তের আইনজীবীর মতে, ছবিগুলি মামলার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক ছিল না। রাষ্ট্রের হাতে কোনও উপাদান রয়েছে বলেই সেটি আদালতে ব্যবহারযোগ্য হয়ে যায় না।

তবে আদালতে কোনও তথ্য ব্যবহারের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা হয় বলে অপ্রয়োজনীয় তল্লাশির ক্ষতি মুছে যায় না। প্রয়োজন ছাড়া ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশ করাটাই কি অধিকার লঙ্ঘন নয়? কোন তথ্য তদন্তের জন্য কতটা প্রয়োজন, কম তথ্য সংগ্রহ করেও একই উদ্দেশ্য পূরণ করা সম্ভব কি না, যাচাই করা প্রয়োজন নয় কি?

কোনও কথা এক বার ‘খবর’ হয়ে ছড়িয়ে পড়লে তা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। গত জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যগুলিকে সংবাদমাধ্যমে পুলিশের তথ্য প্রকাশের বিষয়ে নীতি তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছে। সেই নীতিতে অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তিগত কথোপকথন প্রকাশের উপর পুলিশের জন্য স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকা দরকার। সংবাদমাধ্যমেরও নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত: এই কথাটি কি অপরাধটি বুঝতে সাহায্য করছে, না কি অভিযুক্ত মানুষটিকে অপছন্দ করতে শেখাচ্ছে? প্রথমটি তদন্ত ও বিচার সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করতে পারে; দ্বিতীয়টি প্রমাণের আগেই চরিত্রের বিচারে মানুষকে শামিল করে।

নিহতের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের দায় সত্য উদ্‌ঘাটন করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। সেই দায় পালনে অপরাধের সঙ্গে অভিযুক্তের কথাবার্তার যোগ দেখাতে হয়; তাঁর গোটা চরিত্রের বিচার করার প্রয়োজন নেই। এমনকি অপরাধ প্রমাণিত হলেও মানুষের কিছু কথা ব্যক্তিগতই থাকবে। সেই অধিকারকে কি অস্বীকার করা চলে?

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Government police investigation Artificial Intelligence

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy