সম্প্রতি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বেশ কিছু ঘটনায় পুলিশ-হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের কোমরে দড়ি বেঁধে, হাতকড়া লাগিয়ে, হাফপ্যান্ট-গেঞ্জি পরিহিত অবস্থায় রাস্তায় হাঁটানো হয়েছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকেরা অভিযুক্তদের দিকে ডিম ছুড়েছেন, কটূক্তি করেছেন। কোথাও কোথাও পুলিশের উপস্থিতিতে অভিযুক্তদের চড়-থাপ্পড়ও মারা হয়েছে। সমাজমাধ্যমে, সংবাদে সেই হেনস্থার ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। এ সব দৃশ্য প্রশ্ন তুলেছে, অপরাধ পুনর্নির্মাণ বা অপরাধস্থল পুনর্গঠনের নামে রাষ্ট্র কি নিজের হেফাজতে থাকা মানুষদের এ ভাবে বিপন্ন করতে পারে? তাঁদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে পারে?
পুলিশের ভূমিকায় আদালত যে অসন্তুষ্ট, তা স্পষ্ট। ৫ জুন কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত এবং বিচারপতি স্মিতা দাস পুলিশের উদ্দেশে বলেছেন, “আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা করুন। অপরাধ প্রমাণিত হলে ফাঁসি দিন। তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু গ্রেফতারের নামে কারও সামাজিক সম্মান নষ্ট করা (পাবলিক শেমিং) করা যাবে না।” তার পরেও ‘নিট’ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কলকাতায় গণবিক্ষোভে (২৪ জুলাই) অংশগ্রহণকারীদের বেশ কয়েক জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পাঁচ জন মুসলিমকে অপরাধ পুনর্নির্মাণের জন্য খালি পায়ে, হাফপ্যান্ট-পরা অবস্থায় জনসমক্ষে রাস্তায় হাঁটানো হয় ২৭ জুলাই। যা আদালতের নির্দেশের অবমাননা বলেই গণ্য হওয়ার কথা। অথচ, ওই পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা করা হয়নি। এই কি আইনের শাসন?
সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হয়, কলকাতার জনবিক্ষোভে যা কিছু ঘটেছে তার দৃশ্য তো পাওয়া যাবে শহরে লাগানো অসংখ্য সিসিটিভি-তে, পুলিশের বডি ক্যামেরায়, সংবাদমাধ্যম এবং সমাজমাধ্যমে প্রচারিত অগুনতি ভিডিয়োতে। পুলিশও জানিয়েছে যে, অভিযুক্তদের আটক করা হয়েছে ভিডিয়ো দেখেই। দ্বিপ্রহরের ভিড়ে-ভরা ধর্মতলায় অভিযুক্তদের নিয়ে এসে পুলিশ বাড়তি সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করতে পারবে, তার সম্ভাবনা কতটুকু? প্রশ্ন জাগে, এ কি আদালতের জন্য প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা, না কি পুনর্নির্মাণকে ব্যবহার করে কোনও রাজনৈতিক বয়ানের দৃশ্যায়ন? না হলে বেছে বেছে শুধু মুসলমান অভিযুক্তদেরই কেন ‘পাবলিক শেমিং’ করা হচ্ছে? হাতকড়া পরিয়ে, কোমরে দড়ি বেঁধে, হাফপ্যান্ট এবং খালি পায়ে অভিযুক্তদের হাজার হাজার মানুষের সামনে দিয়ে হাঁটানো কার্যত বিচারের আগেই সর্বসমক্ষে অভিযুক্তদের ‘অপরাধী’ বলে দেখানোর চেষ্টা। এই কি পুলিশের দায়িত্বশীলতার প্রকাশ?
শীর্ষ আদালতের নির্দেশ হল, যে বন্দিদের হিংস্র হয়ে ওঠার ইতিহাস রয়েছে, বা পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাঁদের ছাড়া কাউকে কোমরে দড়ি বা হাতকড়া পরানো যাবে না। ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া কারও কোমরে দড়ি, হাতকড়া পরানো যাবে না। সংবিধানের ২১ নম্বর ধারায় প্রতিটি মানুষকে, এমনকি বিচারাধীন বা সাজাপ্রাপ্ত বন্দিরাও, মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকারী।
ভারতীয় সাক্ষ্য অধিনিয়ম (২০২৩) অনুসারে, সাত বছর বা তার বেশি সাজা হতে পারে যে সব অপরাধের জন্য, সেগুলির ক্ষেত্রে অবশ্যই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ডাকতে হবে এবং তদন্তকারী দলকে ঘটনাস্থলে যেতে হবে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সময়, স্থান এবং ঘটনাগুলির পৌর্বাপর্য যাচাই করতে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে। খুন, ধর্ষণ, গণধর্ষণ ডাকাতি, সশস্ত্র লুটপাট, বা মুক্তিপণের জন্য অপহরণ, এ সব অপরাধে সাত বছর বা তার বেশি সাজা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী এবং সংবাদের দর্শকরা যত দূর দেখেছেন, তাতে ধর্মতলায় সে দিন এই ধরনের কোনও ঘটনা ঘটেইনি। তবে এ সব গুরুতর অপরাধের বাইরেও পুলিশ ঘটনার পুনর্নির্মাণ করায় আইনি বাধা নেই। সাধারণত উচ্চস্তরের পুলিশ আধিকারিকদের নির্দেশ অনুসারে তদন্তকারী অফিসার (আইও) পুনর্নির্মাণ করে থাকেন। তবে গণবিক্ষোভ প্রদর্শনের ঘটনার ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে ‘পুনর্নির্মাণ’-এর নজির নেই, এমনই জানা যাচ্ছে পুলিশমহল থেকে।
ধর্মতলায় যা ঘটল প্রকাশ্য দিবালোকে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার গণধর্ষণ কাণ্ডে আবার তা-ই ঘটল রাতের অন্ধকারে, ঝড়-জলের মধ্যে। প্রধান অভিযুক্তকে অপরাধস্থল পুনর্নির্মাণের জন্য নিয়ে গেল পুলিশ, এবং তিনি তথাকথিত ‘এনকাউন্টার’-এ মারা গেলেন। এর ক’দিন পরে কিন্তু একই অভিযোগে অভিযুক্ত অন্যদের পুলিশ ঘটনাস্থলে নিয়ে গেল দিনের বেলায়। এমন সিদ্ধান্তের পিছনে যুক্তি কী? ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা, ২০২৩ অনুসারে অপরাধ পুনর্নির্মাণের পুরো সময়টাই ভিডিয়ো কিংবা অডিয়ো-ভিডিয়ো রেকর্ড করা বাধ্যতামূলক। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ঘটনায় ‘এনকাউন্টার’-এ অভিযুক্তের প্রাণনাশের মতো গুরুতর ঘটনা ঘটে যাওয়া সত্ত্বেও পুলিশ এখনও ভিডিয়ো প্রকাশ করতে পারেনি।
ভারতীয় সংবিধানের ২০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তিকেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যায় না। তাই পুলিশ অভিযুক্তকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যেতে পারলেও তাঁকে জোর করে নিজের অপরাধ স্বীকার করতে, অপরাধের দৃশ্যের অভিনয় করে দেখাতে, বয়ান দিতে বাধ্য করতে পারে না। ডি কে বসু বনাম পশ্চিমবঙ্গ সরকার মামলায় (১৯৯৭) এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। অন্যথা হলে তা আদালতের নির্দেশ অমান্য করা হবে এবং বন্দির মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হবে।
পুলিশ-প্রশাসনের হাতে সংবিধান, আইন, অনেক ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু তা যথেচ্ছ ব্যবহারের জন্য নয়। অপরাধস্থলের পুনর্নির্মাণের নামে মানবতার যে অসম্মান হচ্ছে, তার প্রতিবাদ জরুরি।