E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

নাম বাতিলের খেলা কত দিন

নির্বাচন কমিশন তড়িৎ-গতিতে ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কাজ করলেও, নিজেদের ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে তাদের গতি থাকে যেন ‘গরুর গাড়ি’র মতো ধীর।

সুমন সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:১৮

এসআইআর নিয়ে গোটা দেশ যখন উত্তাল, তখন আরও এক বার মনে করিয়ে দেওয়া যাক, এ রাজ্যে ঠিক কী হয়েছিল। সেই ধাপগুলিতেই ধরা পড়বে, কী ভাবে সাধারণ মানুষকে ‘অ-নাগরিক’ করে তোলা হল।

প্রথমে বিএলও’দের মাধ্যমে এনুউমারেশন ফর্ম বিলি করা হল। বলা হল, যাঁরা এই ফর্ম ভর্তি করবেন না, তাঁদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় থাকবে না। আরও বলা হল, নিজের, বা পরিবারের যে কোনও ব্যক্তির নাম যদি ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় থাকে, তা হলে আর কোনও প্রমাণের দরকার নেই। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার স্বয়ং সাংবাদিক সম্মেলন করে এই কথাগুলো বলেছিলেন।

তার পর এক মাস ধরে এই ফর্ম দেওয়া এবং জমা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলার পরে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হল। সেখানে দেখা গেল, প্রায় ৫৭ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেছে। বলা হল, এঁদের মধ্যে কেউ মারা গেছেন, কেউ অন্য রাজ্যে অন্য জায়গায় স্থায়ী ভাবে স্থানান্তরিত হয়েছেন, আবার কেউ নিজের বিধানসভা কেন্দ্র থেকে অন্য বিধানসভায় নিজের নাম তুলে নিয়ে গেছেন, অথবা কারও নাম একাধিক জায়গায় ছিল তাই বাদ দেওয়া হয়েছে। যদিও তখন অনেকেই অভিযোগ করেন যে, ওই তালিকায় ভুল আছে, বহু জীবিত মানুষের নাম মৃতের তালিকায় চলে গেছে ইত্যাদি। কমিশনের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হল যে, চূড়ান্ত তালিকা ত্রুটিমুক্ত হবে, সমস্ত যোগ্য ভোটারের নাম থাকবে।

এর পর হঠাৎই বলা হল, খসড়া তালিকায় বহু ত্রুটি পাওয়া গেছে। যাঁদের ক্ষেত্রে এই ত্রুটি আছে, তাঁদের শুনানিতে ডাকা হবে। যাঁদের ডাকা হবে, তাঁরা তাঁদের নথিপত্র দিয়ে যদি তাঁদের পরিবারের যোগসূত্র প্রমাণ করতে পারেন, তা হলে তাঁদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় আসবে। এই সময়েই শোনা যায়, একটা নতুন শব্দবন্ধ— ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ বা ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’। কোনও ব্যক্তির যদি নামের বানানে ভুল থাকে, যদি কারও বাবা-মায়ের সঙ্গে বয়সের ফারাক ১৫ বছরের কম হয়, কারও যদি দুইয়ের অধিক ভাইবোন থাকে, এবং তাঁদের নিয়ে যদি নির্বাচন কমিশনের মনে সন্দেহ হয়, তা হলে তাঁদের শুনানিতে ডাকা হবে। অর্থাৎ, নাগরিককে যথেচ্ছ সন্দেহ করার অধিকার গ্রহণ করল নির্বাচন কমিশন।

অনেকেরই হয়তো মনে পড়বে, তখন এই পত্রিকার পাতায় ছাপা হয়েছিল অশীতিপর, প্রতিবন্ধী (হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে) বহু মানুষের ছবি— যাঁরা যেখানে যা কাগজ আছে, সব নিয়ে হাজির হয়েছিলেন নির্বাচন কমিশনের শুনানিতে। ভোটাধিকার রক্ষার তাগিদে। বহু সম্পাদকীয়, বহু উত্তর-সম্পাদকীয় নিবন্ধ ছাপা হয়েছিল— কিন্তু, এ রাজ্যের বিরোধী একটি রাজনৈতিক দলেরও মনে হয়নি যে, এই বিষয়টা বন্ধ করা জরুরি। হয়তো তারা ভেবেছিল, এই প্রক্রিয়ায় ক্ষতি হবে শুধু তৎকালীন শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের। তৃণমূল সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিল, কিন্তু তাতে খুব লাভ হয়নি। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার সময়ে দেখা গেল, প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেছে। শীর্ষ আদালত জানাল, যাঁদের নাম বাদ গেছে, তাঁরা এই নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না— কিন্তু, তাঁদের চিন্তার কারণ নেই, তাঁরা পরের ভোটে নিশ্চিত ভোট দিতে পারবেন। সম্প্রতি যে দু’টি বিধানসভা আসনে পুনর্নির্বাচন হল, সেখানেও অবশ্য এসআইআর-এ বাদ পড়া মানুষদের ভোট দেওয়া হল না। তবে, বড় বড় গণতন্ত্রে এমন ছোটখাটো ঘটনা তো হতেই পারে, তাই না?

সাম্প্রতিক একটি হলফনামায় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ৩৭ লাখেরও বেশি আপিল এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে; এর মধ্যে ২২ লাখেরও বেশি আপিল করেছেন ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিরা, যাঁরা নিজেদের নাম পুনর্বহাল করতে চান। এ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া ১,২৬,১৯৪টি আপিলের মধ্যে ১,১৩,৯৪৩টির ক্ষেত্রে ভোটার তালিকায় নাম পুনরায় যুক্ত করা হয়েছে। অথচ বর্তমান গতিতে এই বিপুল সংখ্যক বকেয়া আপিল নিষ্পত্তি করতে প্রায় বারো বছর সময় লেগে যেতে পারে। নির্বাচন কমিশন তড়িৎ-গতিতে ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কাজ করলেও, নিজেদের ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে তাদের গতি থাকে যেন ‘গরুর গাড়ি’র মতো ধীর। এখন তো আমরা জানি যে, গত ১৪ মাসে অন্তত ১০ বার মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে এই বিষয়গুলো নিয়ে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনের মতপার্থক্য হয়েছে— তা সত্ত্বেও এসআইআর-এর প্রক্রিয়া অব্যাহত থেকেছে।

কেন্দ্রীয় শাসকদের পক্ষে যাঁরা ভোট দেবেন না বলেই অনুমান করা চলে, ভোটার তালিকা থেকে যদি তাঁদের বেছে বেছে বাদ দেওয়া যায়, তা হলে তাঁদের ক্ষোভ নিয়ে ভাবার আর প্রয়োজন পড়ে না— কারণ, তাঁদের ক্ষোভ ব্যালট বাক্স অবধি পৌঁছবে না। কিন্তু, এই খেলা কত দিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে, তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।

রাজধানীতে প্রবল বিক্ষোভ এবং তাতে শাসকের ভয় কিন্তু অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
SIR Election Commission

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy