E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

নিষেধের জালে পথের দাবী

আজ থেকে একশো বছর আগে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় এই বই— ৩১ অগস্ট, ১৯২৬ (১৩৩৩ সালের ১৭ ভাদ্র)। আপাতনিরীহ একটা পিচবোর্ডের মলাটে সাদা কাগজের উপর লাল কালিতে লেখা ছিল বইয়ের নাম, নীচে লেখকের নাম। তার পর প্রকাশক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নাম।

পায়েল বসু

শেষ আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:৪৫

ইতিহাস পরীক্ষায় একটা ছোট প্রশ্ন থাকত। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কোন উপন্যাস ব্রিটিশ আমলে ‘নিষিদ্ধ’ হয়েছিল? উত্তর, পথের দাবী। ‘নিষিদ্ধ’ শব্দে একটি দুর্জ্ঞেয় রহস্য আছে। পরে জেনেছি, বিশ্বের বহু মহৎ সৃষ্টি রাজশক্তির কোপে পড়ে নিষিদ্ধ তকমা পেয়েছে। হোমারের ওডিসি বা বাংলার নীলদর্পণ-এর অনুবাদ, বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম্ গানের গ্রামোফোন রেকর্ড বা ক্ষুদিরামের ফাঁসির পর ‘বিদায় দে মা’ পাড়ের স্বদেশি ধুতি! প্রতি ক্ষেত্রে রাজশক্তি কোনও না কোনও কারণে সিঁদুরে মেঘ দেখেছিল। শরৎচন্দ্রের পথের দাবী উপন্যাসটি প্রকাশমাত্র ব্রিটিশরাজের চক্ষুশূল হয়েছিল। অথচ বইটিতে ব্রিটিশ শোষণের ধারাবাহিক কোনও ফর্দ নেই। তা হলে সেটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল কেন?

আজ থেকে একশো বছর আগে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় এই বই— ৩১ অগস্ট, ১৯২৬ (১৩৩৩ সালের ১৭ ভাদ্র)। আপাতনিরীহ একটা পিচবোর্ডের মলাটে সাদা কাগজের উপর লাল কালিতে লেখা ছিল বইয়ের নাম, নীচে লেখকের নাম। তার পর প্রকাশক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নাম। ৪২৬ পৃষ্ঠার ৩ টাকা মূল্যের এই বইটি ছাপা হয়েছিল ৩০০০ কপি। বিষয়ের কারণে প্রকাশক পাওয়া নিয়ে লেখক সংশয়ে ছিলেন। সে কারণেই উপন্যাসটি শেষ না করে ফেলে রেখে দিয়েছিলেন। ঘটনাচক্রে শরৎচন্দ্রের শিবপুরের বাড়িতে পড়ার টেবিলের উপর আলগোছে পড়ে থাকা হাতে লেখা পাণ্ডুলিপির কয়েকটি পাতা উমাপ্রসাদের নজরে আসে। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র উমাপ্রসাদের আগ্রহে তিন বছর তিন মাস ধরে বঙ্গবাণী পত্রিকাতে পথের দাবী ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়।

লেখক এবং প্রকাশক জানতেন, উপন্যাসটি বই আকারে প্রকাশিত হলেই আর রক্ষে থাকবে না! ব্রিটিশ বিরোধিতার কারণে শাস্তি পেতে হবে। শেষ পর্যন্ত বইটি বেরোলে রাতারাতি সব কপি বিক্রি হয়ে যায়। পুলিশের নাগাল থেকে দূরে রাখতে প্রকাশক এবং লেখকের বিপ্লবী বন্ধুরা বইয়ের অনেক কপি বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেন।

১৯২৬ অর্থাৎ প্রকাশের বছরেই পুলিশ কমিশনার বই থেকে আপত্তিকর অনুচ্ছেদগুলি সরকারি দফতরে পেশ করেন। ‘বিষাক্ত সৃষ্টি’ বলে একে দাগিয়ে দেন চিফ সেক্রেটারি। অ্যাডভোকেট জেনারেল মনে করেন বইটি সত্যই দেশদ্রোহ-কর! রিপোর্টে বলা হয়, বইটির আসল উদ্দেশ্য হল ইংরেজ সরকারের প্রতি ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা জাগানো। সব্যসাচীর মতো নায়কচরিত্র তেতে-থাকা বাংলার তরুণ প্রজন্মের বারুদে আগুন দেবে। সুমিত্রার উস্কানিমূলক সংলাপ মারাত্মক আকার নেবে। প্রকাশের পাঁচ মাস পর ১৯২৭ সালে বইটি নিষিদ্ধ হয়।

প্রসঙ্গত, বাংলায় বিপ্লবী কাজকর্ম চলছে বিশ শতকের প্রথম দশক থেকেই। ১৯০৮ সালে ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়, তার আগেই তো বাংলা জুড়ে বিপ্লবীদের উপস্থিতি সকলে বুঝতে পারছেন। সশস্ত্র আন্দোলনকে প্রতিরোধ করতে ব্রিটিশ সরকার ক্রমে রাওলাট আইন এনেছে— যার ফলে ঘটেছে জালিয়ানওয়ালা বাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ড। শরৎচন্দ্র এক সময় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন এবং সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে বাংলায় কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলনের পথে চলেছিলেন, স্বাভাবিক ভাবেই সেই শরৎচন্দ্রের মনে বিপ্লবীদের কার্যকলাপের প্রতি একটা আবেগগত টান ছিল। এর থেকেই শুরু হয় পথের দাবী লেখা।

ডাক্তার সব্যসাচীকে দিয়ে শরৎচন্দ্র বলিয়ে নেন— বিপ্লব মানেই মারামারি, রক্তারক্তি নয়। বিপ্লব মানে বড় মাপের পরিবর্তন। বিপ্লব কথাটার অর্থ এখানে রাজনৈতিক, এবং সামাজিক। কে এই সব্যসাচী? পরাধীন দেশের এই রাজবিদ্রোহী যে ঠিক কী এবং কী নন, তা যেন রহস্যেই মোড়া থাকে উপন্যাসে। কিন্তু সব্যসাচীর সেই জাতীয়তাবাদে যে শরৎচন্দ্রের নিজের জাতীয়তাবাদের ভাবনাগুলি প্রকাশিত হয়েছে, তা নিয়ে সংশয় থাকে না। মুক্তির পথ চাই বলেই ‘বিপ্লব’-এর কথা হয়ে ওঠে ‘পথের দাবী’।

উপন্যাসটিতে জাতিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তীব্র ভাষায় প্রকাশিত। ভারতীয়-ইউরোপীয় বিরোধ, ভারতীয়দের প্রতি আদালতের অবিচার, ইউরোপীয় কলকারখানার মালিকদের অত্যাচার, শোষণ, দেশের মানুষের চরম আর্থিক দুর্দশা— বড্ড বেশি স্পষ্টতায় ফুটিয়ে তোলা হয়।

এই সব্যসাচীর মধ্যে কি বাঙালির সে দিনের আদর্শ বিপ্লবী নায়ক সুভাষচন্দ্রের হদিস মেলে? খুব ভুল হবে না এ কথা বলা। ১৯২৪-২৫ সালের সব্যসাচীর মধ্যে যেন ১৯৪০-৪৫ সালের নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ছায়া। শরৎচন্দ্র বলতেন, যে দিন ভারতের স্বাধীনতার জন্য আমরণ যুদ্ধ আরম্ভ হবে, সে দিন বাঙালি নিশ্চয় নেতা হিসাবেই এগিয়ে আসবে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শরৎচন্দ্রের স্নেহভাজন সুভাষচন্দ্র। আবার, একই সঙ্গে, ছদ্মবেশী গিরিশ মহাপাত্র ওরফে সব্যসাচীকে বহু ক্ষেত্রে মনে হয় ঠিক যেন রাসবিহারী বসু। বিপ্লবীদের আদল আর মধ্যবিত্ত বাঙালির কল্পনা মিশিয়ে সাহসী ও ক্ষমাশীল ‘আদর্শ বিপ্লবী’ হিসেবে সব্যসাচী চরিত্রটির নির্মাণ। তাঁর ‘পথের দাবী’ সংগঠন মানুষের বাধাহীন পথের অধিকারে বিশ্বাসী। কারণ কোনও মানুষ অপরের জন্য নির্বিবাদে পথ ছেড়ে দেয় না— তা দাবি করে আদায় করতে হয়।

শেষ পর্যন্ত বইটির উপর নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। ১৯৩৯ সালে উপন্যাসের দ্বিতীয় সংস্করণের নাট্যরূপ দেওয়া হয়। তবে নাট্যাভিনয়ের উপরও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। স্বাধীনতার পরে বইটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ পায়। আর কোনও নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল রইল না তার উপর। সেই বেড়াজাল জমানো রইল অন্য অনাগত লেখালিখির জন্য।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Sarat Chandra Chattopadhyay Pather Dabi British rule

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy