ফর্টি নাইন— এই ছিল সঙ্কেত। অনুশীলন সমিতির সদস্যরা এই সংখ্যা-সঙ্কেতে মিলিত হতেন নিজেদের কার্যালয়ে। ৪৯ নম্বর কর্নওয়ালিস স্ট্রিট ছিল তার ঠিকানা। ১২৪ বছর আগে, ১৯০২ সালের ২৪ মার্চ, দোল পূর্ণিমার দিন কলকাতায় স্থাপিত হয় ‘অনুশীলন সমিতি’। রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন: “বঙ্গদেশের বিপ্লববাদের প্রথম ও প্রধান প্রতিষ্ঠান ছিল ‘অনুশীলন সমিতি’।... বিপ্লবাত্মক কার্য ছাড়াও এই সমিতির সদস্যদের চরিত্র গঠনের— অর্থাৎ শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনের যে আদর্শ ও তদনুযায়ী ব্যবস্থা ছিল তাহা আজকাল অনেকেরই জানা নাই।” সমিতির প্রতিষ্ঠা ও সূত্রপাত অধুনা বিস্মৃত বিপ্লবী সতীশচন্দ্র বসুর (ছবি) হাত ধরে।
দুর্বলতার অপবাদ ঘুচিয়ে বাঙালিকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে— এই মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে সতীশচন্দ্র স্বদেশসেবার কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন। পড়তেন এখনকার স্কটিশ চার্চ কলেজে। তারই প্রাঙ্গণে ব্যায়ামাগার খোলেন। শরীরচর্চার কাজে কলেজ কর্তৃপক্ষের প্রশ্রয় ছিল, অধ্যক্ষ ওয়েন সাহেবের বিশেষ স্নেহভাজন ছিলেন সতীশ। ব্যায়ামশালাটি পরে অনুশীলন সমিতির একটি কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অনুশীলন তত্ত্বে আদর্শ মানুষ হয়ে ওঠার যে নির্দেশ আছে, সতীশচন্দ্র অনুশীলন সমিতির ভিত্তিস্বরূপ সেই নির্দেশসমূহ প্রতি শব্দে মেনে চলতেন। সমিতি মূল প্রেরণা নিয়েছিল বঙ্কিমচন্দ্রের ধর্মতত্ত্বের শেষ উপদেশ থেকে— ‘সকল ধর্মের উপর স্বদেশপ্রীতি, ইহা বিস্মৃত হইয়ো না।’ সংগঠনের সদস্য বিপ্লবী জীবনতারা হালদারের স্মৃতিচারণ: “অনুশীলন সমিতির সভ্যরাই প্রকৃত বীরোচিত সুরধ্বনির সহিত জাতীয় সঙ্গীত ‘বন্দে মাতরম্’ গান করিতেন। ইহাই ছিল সকল প্রেরণার উৎস।”
প্রথম পর্বে সমিতির নাম ছিল ‘ভারত অনুশীলন সমিতি’। ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্র এই সংগঠনে যুক্ত হয়ে নাম-সংক্ষিপ্ত করে রাখেন ‘অনুশীলন সমিতি’। তাঁর সংযোগ সমিতির আর্থিক চিন্তা দূর করে। তিনি ছাড়াও অর্থনৈতিক দায়ভার বহন করেছেন সুরেন্দ্রনাথ হালদার, চিত্তরঞ্জন দাশ, জ্ঞানেন্দ্রনাথ রায়, রাসবিহারী ঘোষ, সারদাচরণ মিত্র প্রমুখ। অহেতুক অর্থখরচ সতীশচন্দ্র বসু পছন্দ করতেন না। তাই ক্লাব-সংস্কৃতির অনুকরণে সে-কালে অনেক সংগঠন নিজেদের ইউনিফর্ম ইত্যাদি চালু করলেও অনুশীলন সমিতি সে সব থেকে দূরেই ছিল। দাদাভাই নওরজি হাওড়া স্টেশনে এসেছেন, তাঁকে অভ্যর্থনা করে কলকাতায় নিয়ে আসা হল। সতীশচন্দ্রের নির্দেশে সমিতির সদস্যরা পায়ে কালো মোজা ও মাথায় সাদা উড়ানির পাগড়ি পরেছিলেন, আর কোনও বাহুল্য ছিল না।
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে অনুশীলন সমিতি ও সতীশচন্দ্র বসুর কর্মোদ্যমে জোয়ার এল। কলকাতার বিভিন্ন পল্লি, শহরের উপকণ্ঠ এবং বাংলার গ্রামে গ্রামে সমিতির শাখা প্রতিষ্ঠা, তাদের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা, ‘সতীশবাবু ইহাতেই মনপ্রাণ নিয়োজিত করিলেন এবং অতীব দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সহিত কেন্দ্রগুলি পরিচালনা করিতে লাগিলেন’। শারীরিক ও আত্মিক উন্নতির জন্য শৃঙ্খলা রক্ষার প্রতি তাঁর সজাগ নজর কোনও বজ্র-আঁটুনির বেষ্টনী দেয়নি। বরং স্নেহের বন্ধনে সবাইকে আকৃষ্ট করে রাখতে জানতেন তিনি।
ছোট একটি কাঠের টুলের উপর বসে আছেন রবীন্দ্রনাথ। সেই ‘ফর্টি নাইন’ বাড়ির কাছে মদন মিত্র লেনের ক্রীড়া প্রাঙ্গণে গেয়ে চলেছেন নতুন লেখা গানগুলি— ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’, ‘নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়’, ‘আমার সোনার বাংলা’, গভীর মনোযোগে শুনছেন অনুশীলন সমিতির সভ্যবৃন্দ। সতীশচন্দ্রের অন্যতম সহকারী যতীন্দ্রনাথ শেঠের স্মৃতিচারণে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ একাধিক বার সমিতির সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন, ‘সমিতির সভ্যদিগকে তাহাদের ব্রতে উৎসাহিত করিবার জন্য উক্ত গানগুলি মুখ্যত রচিত হয়’। জোড়াসাঁকো শিবকৃষ্ণ দাঁ লেনের শিবমন্দির প্রাঙ্গণে অনুশীলন সমিতির একটি শাখা খোলা হয়েছিল। সেইখানে সদস্য হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বয়স তখন প্রায় পনেরো। যতীন্দ্রনাথ এক বার তাঁর সঙ্গে ঠাকুরবাড়ি গিয়েছিলেন, উদ্দেশ্য, সমিতির বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা। বিশ্বকবি তাঁকে বলেছিলেন: “তোমাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তোমাদের মনকে জাগাবার জন্য কতকগুলি গান রচনা করব ও শোনাব।” সেই স্মৃতিচিত্র অমলিন হয়ে আছে শেফালিকা শেঠ রচিত সঙ্গীত শাস্ত্র কণিকা গ্রন্থের মুখবন্ধে, যতীন্দ্রনাথের লেখনীতে।
ব্রিটিশ শাসক সমিতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। তা সত্ত্বেও সতীশচন্দ্র ও অন্য সঙ্গীরা গোপনে চালিয়ে গিয়েছেন সংগঠনের কাজ। সতীশচন্দ্রের উপর নেমে আসে অমানুষিক পুলিশি নির্যাতন। সরল, অমায়িক, অনাড়ম্বর জীবনে অভ্যস্ত মানুষটি মধুর স্বভাবের জন্য ছিলেন সকলের প্রিয়পাত্র। সার্ধশতবর্ষে উপনীত এই বিপ্লবী ১৯৪৮-এর ৯ অক্টোবর প্রয়াত হন। তাঁর স্মৃতিসভার প্রতিবেদনে সেই বছর ২১ নভেম্বর আনন্দবাজার পত্রিকা-য় লেখা হয়েছিল: “অনুশীলন সমিতি ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনিকে দেশে জনপ্রিয় করে এবং প্রতাপাদিত্য উৎসবের অনুষ্ঠান করিয়া দেশের সুপ্ত চৈতন্যকে জাগ্রত করিবার চেষ্টা করে।... মানুষকে মানুষরূপে ফুটাইয়া তোলা সতীশবাবুর তপস্যা ছিল।... দেশের প্রতি গভীর ভালবাসা তিনি আমাদিগকে শিখাইয়া ছিলেন।”