E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

প্রযুক্তির গ্রাসে ফুটবল

ফুটবল কখনওই নিখুঁত ছিল না। ভুল পেনাল্টি, বিতর্কিত অফসাইড, রেফারির বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত নিয়ে তর্ক-মতভেদ-আলোচনা চলত। এখনও হয়।

কৌশিক ভৌমিক

শেষ আপডেট: ২১ অগস্ট ২০২৬ ০৬:২৭

এক সময় ফুটবলে প্রযুক্তি ব্যবহৃত হত না। ফাউল, অফসাইড, থ্রো-ইন, কর্নার, পেনাল্টি— সব ঠিক হত রেফারি ও লাইন্সম্যানের তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণে। তাঁদের বাঁশি-পতাকার যুগলবন্দিতে খেলা বইত স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দে। কিন্তু ১৯৬৬-র বিশ্বকাপে জিওফ হার্স্টের বিতর্কিত ‘ওয়েম্বলে গোল’, ১৯৮৬-তে মারাদোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ আর ২০১০-এ ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের ‘গোস্ট গোল’-এর মতো বিতর্ক মেটাতে মাঠে চালু হয় প্রযুক্তি। সেই প্রযুক্তির ‘ফাউল’-এই আজ ধরাশায়ী ফুটবল।

এর প্রমাণ মেলে এ বারের বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের দু’টি ম্যাচে। রাউন্ড অব সিক্সটিন-এ আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচে ভিডিয়ো অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজ়ের থেকে মিশরের মারওয়ান অ্যাটিয়ার বল দখলের প্রতিটি ফ্রেম দেখে এমন একটি ফাউল চিহ্নিত করেন, যা খেলার স্বাভাবিক গতিতে উপেক্ষিত হয়। ফলে, মিশরের দ্বিতীয় গোলটি বাতিল হয়। আবার কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড-নরওয়ে ম্যাচে বল স্পাইডারক্যামের তার ছুঁলেও বলের সেন্সরের ‘হার্টবিট’-এ স্পষ্ট ‘স্পাইক’ না মেলায় ভিএআর ‘ড্রপড বল’ না দিয়ে ইংল্যান্ডের গোল বহাল রাখে। প্রতি বিশ্বকাপে ম্যাচের তথ্যভান্ডার বানিয়ে ফুটবলকে নিখুঁত করতে ফিফা যে প্রযুক্তির নজরদারির উদ্যোগ করেছে, তাতেই ফুটবলের স্বাভাবিক শৈলী নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।

ফুটবল কখনওই নিখুঁত ছিল না। ভুল পেনাল্টি, বিতর্কিত অফসাইড, রেফারির বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত নিয়ে তর্ক-মতভেদ-আলোচনা চলত। এখনও হয়। ভুলের মধ্যে দিয়েও যে শৈল্পিক মাধুর্য জন্ম নেয়, তা প্রযুক্তির বোঝার ক্ষমতা নেই। অথচ, খেলোয়াড়দের বল নিয়ন্ত্রণ, গতি, ক্লান্তি, চোট— সবই এখন তথ্য। এর ভিত্তিতেই কোচরা খেলোয়াড় বদল ও খেলার পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করেন। প্রযুক্তি মাঠকে পরিণত করেছে হিসাব-নিকাশের স্প্রেডশিটে।

ফুটবলের অতিমানবিক যাত্রা শুরু ২০১৪-র ব্রাজ়িল বিশ্বকাপে ‘গোল-লাইন টেকনোলজি’ দিয়ে। চোদ্দোটি হাই-স্পিড ক্যামেরার নজরদারিতে বল গোললাইন পেরোলেই সেকেন্ডে সঙ্কেত পৌঁছত রেফারির স্মার্টওয়াচে। ২০১৮-র রাশিয়া বিশ্বকাপে আসে ‘ভিএআর’। তেত্রিশটি ক্যামেরার ফিড ভিডিয়ো রুমে পাঠানো হত। ভিএআর রেফারিরা অংশগুলি স্লো-মোশনে দেখে সিদ্ধান্ত জানাতেন। ২০২২-এর কাতারে যুক্ত হয় এআই-চালিত ‘সেমি-অটোমেটেড অফসাইড টেকনোলজি’। স্টেডিয়ামের ছাদে বসানো বারোটি ক্যামেরা খেলোয়াড়দের শরীরের ঊনত্রিশটি অংশ সেকেন্ডে পঞ্চাশ বার মেপে অফসাইডের ডিজিটাল রেখা টানত। পরিকাঠামো নিখুঁত করতে ২০২৬-এ ব্যবহার করা হল আরও উন্নত ‘কানেক্টেড বল টেকনোলজি’। বলের ভিতরের সেন্সর সেকেন্ডে পাঁচশো বার গতি, দিক ও স্পর্শের তথ্য পাঠায় ভিএআর রুমে। সঙ্গে যুক্ত হয় খেলোয়াড়দের ডিজিটাল অবতার, রেফারির কানে লাগানো ক্যামেরার তথ্য ও অত্যাধুনিক অ্যানালিটিক্স।

প্রযুক্তি থাকলে খামতিও অনিবার্য। ক্যামেরার ‘ফ্রেম-রেট লিমিটেশন’, সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তিকে ঘিরে জটিলতা— বিবিধ সমস্যা রয়েছে। প্রতি বিশ্বকাপেই প্রযুক্তির ফাটলগুলি প্রকট হয়েছে। ২০১৪-তে গোল-লাইন প্রযুক্তির প্রথম ব্যবহারেই ফ্রান্স-হন্ডুরাস ম্যাচে স্ক্রিনে প্রথমে ‘নো গোল’ দেখিয়ে পরে ‘গোল’ দেখায়। আবার, ২০২২-এ কাতারে জাপান-স্পেন ম্যাচে বল মাঠের বাইরে গিয়েছে মনে হলেও সামান্য অংশ সাইডলাইনের উপরে থাকায়, বৈধ ঘোষিত হয়।

ফুটবল সেকেন্ডের ভগ্নাংশে নেওয়া সিদ্ধান্ত ও শরীরের স্বতঃস্ফূর্ত গতির খেলা, যা অনুভব করা যায়। অথচ, প্রযুক্তির নজরদারির কোপ পড়ছে মানুষের অনুভূতির উপর, খর্ব হচ্ছে মাঠ রেফারিদের খেলা পরিচালনার স্বাধীনতাও। ভিএআর কক্ষের অবিরাম নির্দেশে মাঠ রেফারি-লাইন্সম্যানদের একক বিচারক্ষমতা আর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দুর্বল হয়ে পড়ছে। অন্য দিকে, ভিএআর-এর দীর্ঘ পর্যালোচনায় খেলোয়াড়দের ছন্দ ও গতি বিঘ্নিত হচ্ছে। দর্শকরাও বঞ্চিত হচ্ছেন। তাঁরা আতঙ্ক-অনিশ্চয়তা নিয়ে তাকিয়ে থাকেন ভিএআর স্ক্রিনের দিকে। ফলে বাড়ছে অসন্তোষ।

সমস্যা বিশ্বকাপেই আটকে নেই। লা লিগা, প্রিমিয়ার লিগের মতো ইউরোপের বড় টুর্নামেন্ট ও ইউরোর মতো আন্তর্জাতিক আসরেও ভিএআর বিতর্ক তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিও আছে এই প্রযুক্তিতে। গোটা পরিকাঠামো দখলে নিয়ে খেলার ফলাফল বা সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন নয়। তার প্রমাণ, ২০২২-এর কাতার বিশ্বকাপের সময় ‘ব্ল্যাকটেক’ নামের হ্যাকার দল ঢুকে পড়ে সম্প্রচারের দায়িত্বে থাকা কাতারের টেলিকম সংস্থার প্রক্রিয়ায়, যদিও তারা লাইভ সম্প্রচারে হস্তক্ষেপ করেনি। এ বারের বিশ্বকাপের আগে ‘বব দ্য হ্যাকার’ পরিচয়ের এক সাইবার গবেষক ফিফার এজেন্ট পোর্টালে খুঁত পান। সাধারণ পরিচয়পত্র দিয়ে নিবন্ধন করলেই যে কেউ ফিফার ক্লাউড পরিকাঠামোয় ঢুকে সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণকারী ড্যাশবোর্ড, ক্যামেরা ফিড ও লাইভ ম্যাচ ডেটা পর্যন্ত পৌঁছতে পারত। খবর প্রকাশ হতেই ফিফা নিজেদের ভুল শুধরে নেয়।

বিজ্ঞানকে ফুটবলের পরিপূরক হতে হবে, নিয়ন্ত্রক নয়। মাঠ-রেফারিদের সিদ্ধান্ত থাকুক মুখ্য। খেলার গতি পাক সর্বোচ্চ প্রাধান্য। নিখুঁত করার তাগিদে প্রযুক্তির যান্ত্রিকতা খেলার হৃদয়কেই গ্রাস করে নিলে, ফুটবল আর পেলের জনপ্রিয় করা ‘ও জোগো বনিতো’ অর্থাৎ ‘দ্য বিউটিফুল গেম’ থাকবে না। দর্শক ফুটবল খেলা দেখতে যান যান্ত্রিক কেরামতি উপভোগ করতে নয়, রক্ত-মাংসের মানুষের ভুল, জেদ, বীরত্ব আর আবেগের মহাকাব্যের সাক্ষী হতে। প্রযুক্তিতে লাগাম না টানলে ফুটবল হারাবে নিজের মাধুর্য। আগামী বিশ্বকাপগুলো নিখুঁত হবে ঠিকই, কিন্তু হয়ে উঠবে প্রাণহীন।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
football Technology

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy