E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

এই বিসর্জনের দায় কার

আসলে বিপর্যয় আটকানোর জন্য না আছে আমাদের প্রস্তুতি, না মানসিকতা; এবংসমাজের সব ক্ষেত্রেই। প্রস্তুতি থাকলেই যে বিপর্যয় সব সময় আটকানো যাবে এমনও নয়। কিন্তু প্রস্তুতি যে বিপর্যয়ের তীক্ষ্ণতা কমাতে পারে সেটা স্বীকৃত।

জয়ন্ত বসু

শেষ আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৫১

বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মা দুর্গা চললেন কৈলাসে, ফিরে আসবেন আগামী বছর; কিন্তু স্রেফ ঠাকুর দেখতে গিয়ে চোরবাগান পুজোমণ্ডপে বিসর্জন হয়ে গেলেন সরকারি হিসেব অনুযায়ী যে উনিশ জন মানুষ, যাঁরা তাঁদের পরিবার, আপনজনের কাছে আর কোনও দিনই ফিরবেন না! এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার দায়িত্ব কার বা কাদের; তা নিয়ে কাটাছেঁড়া চলছে। সরকার অনুসন্ধানী কমিটি তৈরি করেছে, যেমন সব সরকারই কোন বিপর্যয়ের পর করে থাকে; কিন্তু তার থেকে বিশেষ কাজের কাজ হয়, এমনটা মন্ত্রীসান্ত্রিরাও মনে মনে বিশ্বাস করেন না।

আসলে বিপর্যয় আটকানোর জন্য না আছে আমাদের প্রস্তুতি, না মানসিকতা; এবংসমাজের সব ক্ষেত্রেই। প্রস্তুতি থাকলেই যে বিপর্যয় সব সময় আটকানো যাবে এমনও নয়। কিন্তু প্রস্তুতি যে বিপর্যয়ের তীক্ষ্ণতা কমাতে পারে সেটা স্বীকৃত। প্রসঙ্গত ভুজ ভূমিকম্পে প্রায় কুড়ি হাজার মানুষ মারা গেলেও, ক্যালিফোর্নিয়ার প্রায় একই তীব্রতার ভূমিকম্পে তিন জন মানুষ মারা গিয়েছিলেন। দুর্গাপুজোর মতো যে ধর্মীয় সামাজিক উৎসব দেখতে লক্ষ লক্ষ মানুষ কলকাতা তথা রাজ্যে আসেন, সেখানে সেই প্রবল ভিড়ে যে একটা অন্তর্নিহিত বিপন্নতা থাকবে সেটা বলা বাহুল্য।

প্রশ্ন হল, তার প্রস্তুতি হিসেবে আমরা কী করি। সাধারণ ভাবে আইনশৃঙ্খলা সামলাতে রাস্তায় প্রচুর পুলিশ থাকলেও মণ্ডপের মধ্যে বিপর্যয় রুখতে যে কোনও বিশেষ কোনও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রোটোকল কলকাতা পুলিশের আছে এমনটা শোনা যায়নি। পুজোর আগে পুলিশের বড়কর্তারা পুরসভা ও অন্য কিছু দফতরের কর্মীদের নিয়ে, মিডিয়ার ক্যামেরা সঙ্গী করে, কিছু পুজোমণ্ডপে ‘ভিজিট’ করেন বটে, তবে সেটা দেখনদারি বেশি, কার্যকরী কম। মনে রাখতে হবে কলকাতা পুজোর, বা বলা ভাল প্যান্ডেলের, চরিত্র ইংরেজি ভাষায় ‘অ্যাপলস অ্যান্ড অরেঞ্জেস’। কী ভাবে চোরবাগান, কাশী বোস লেন, নলিন সরকার স্ট্রিটের সরু গলিতে হওয়া পুজোর সঙ্গে অপেক্ষাকৃত চওড়া রাস্তায় হওয়া একডালিয়া এভারগ্রিন, শিবমন্দির বা ত্রিধারার পুজো বা সুরুচি বা ম্যাডক্স স্কোয়ারের মতো মাঠে হওয়া পুজোর নিরাপত্তার মডেলকে এক ছাঁচে ফেলা যাবে?

রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হওয়ার পর বিভিন্ন বড় পুজোর দায়িত্বে থাকা কমিটিতে তার প্রতিফলন ঘটেছে, চোরবাগানেও। এখন একটা বড় পুজো শুধুমাত্র পুজো নয়, বহু ক্ষেত্রেই তা রাজনৈতিক ব্যক্তি ও তাদের সমর্থিত দলের এলাকা দখলের হাতিয়ার। বাম আমলে যে-হেতু ধারে, ভারে ও পকেটের জোরে দুর্গাপুজো এত বড় হয়নি, এবং বামপন্থীরা ঘোষিত ভাবে পুজো থেকে দূরে থাকতেন, তাই এই প্রবণতা কম ছিল। কিন্তু তৃণমূল আমল থেকেই চক্রবৃদ্ধি হারে পুজোর রাজনীতিকরণ বাড়তে থাকে এবং বিজেপির আমলে যে সে প্রবণতা দ্রুততর সেটা বলা বাহুল্য। বিশেষ করে, তাঁরা সদ্য ক্ষমতায় এসেছেন এবং স্বাভাবিক ভাবেই সামাজিক প্রভাব দ্রুত বাড়াতে চান আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে। কিন্তু পুজো ঘিরে এই টি-টোয়েন্টি খেলতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই, যেমন চোরবাগানের ক্ষেত্রে, পুজো পরিচালন কমিটিতে প্রচুর রদবদল হয়েছে। বহু বছর ধরে যে সব মানুষ পুজো পরিচালনা করতেন, তাঁরা বাদ পড়ে গেছেন। পাশাপাশি কাউন্সিলররা না থাকার কারণে, পুরসভা সম্পূর্ণ কতিপয় অফিসার-ভিত্তিক হয়ে পড়েছে। পুলিশ প্রশাসনে প্রচুর রদবদল ঘটেছে। চোরবাগানের ঘটনার পর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পুজো সামলাতে অভিজ্ঞ কিছু বদলি হয়ে যাওয়া আইপিএস-কে ফেরানো থেকে সেটা স্পষ্ট!

পুজোর সময় সমাজের সর্বস্তরে কুর্নিশ পাওয়া পুলিশি মডেলের কেন্দ্রে ছিল শৃঙ্খলাকে কঠোর ভাবে রূপায়ণ করা, এতটাই যে অনেকে মজা করে বলতেন গোটা বছরটাতেই পুজো চললে ভাল! এ বারে রাস্তা ছেয়ে গেছিল অনভিজ্ঞ অল্পবয়সি ভলান্টিয়ারে, ফলে মানুষ ‘ওয়াক অ্যাজ় ইউ লাইক’ মোডে হেঁটেছেন, ট্র্যাফিক থামিয়ে সেলফি তুলেছেন, গাড়িদের অবস্থাও তথৈবচ। দশমীর দিন বাগবাজার, কুমোরটুলি বা মায়ের ঘাটের মতো উত্তর কলকাতার বিসর্জন ঘাটগুলিতে যে বিশৃঙ্খলা চোখে পড়েছে তার তুলনা মেলা ভার।

এই সবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে থিমের নামে নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করা। সব থিমশিল্পী ও পুজোই চায় অন্য রকম ভাবনার প্রয়োগ করতে যাতে ভিড়ের হিসেবে সে এক নম্বর হতে পারে। কলকাতার পুজোর মতো সংখ্যায় এবং গুণমানে পাবলিক আর্ট পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় বলে মনে হয় না। কিন্তু থিমের ভাবনার সঙ্গে স্থানকালপাত্রের সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। এমনও থিম করা উচিত নয়, যা পুজোর বিপন্নতাই বাড়িয়ে তুলবে। বেশ কিছু বছর আগে একটি কালীপুজোর প্যান্ডেলে দেখেছিলাম কী ভাবে সরু এবড়ো-খেবড়ো গলির মধ্যেসামনের জনকে দেখা যায় না, এমন আলোয় জঙ্গলের থিম করা হয়েছে আর হাজার হাজার মানুষ সেখানে ঢুকছেন।

থিমশিল্পীদের সঙ্গে আত্মবিশ্লেষণ প্রয়োজন প্রশাসন থেকে শুরু করে আমাদের সবারও। পুজোর পাশাপাশি ভাবা প্রয়োজন আমাদের বস্তি থেকে বহুতলগুলির, শপিং মল থেকে সিনেমা হলগুলোর বিপর্যয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে। মাঝেমধ্যেই যে একটা করে চোরবাগান হয় না এটাই আমাদের ভাগ্য। চোরবাগান ঘটনা সকলের চোখ খুলে দিক, এটাই এখন আশা।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Stampede Durga Puja West Bengal government WB Police

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy