সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে খাদ্য সুরক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে রাজ্যের হোটেল, রেস্তরাঁ এবং মিষ্টি বিপণিগুলির খাদ্যের গুণমান ও স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের যে ছবিটা সামনে এল, তা যেমন বিস্ময়কর, তেমনই উদ্বেগের। কলকাতার নামজাদা হোটেল, রেস্তরাঁ থেকে মফস্সলের সাধারণ খাবারের দোকানগুলি যে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ক্ষতিকর খাদ্যপণ্য তৈরি ও পরিবেশন করে আসছিল, খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিকদের পরিদর্শনে তা প্রমাণিত। দেখা গেছে, বহু বিপণিতে বিক্রির জন্য রাখা খাদ্যসামগ্রী খাওয়ার অনুপযুক্ত, রান্নাঘর ও ভাঁড়ারে মজুত রাশি রাশি পচা মাছ-মাংস; তেল, মশলা-সহ রান্নার উপকরণে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক, বাসনপত্র নোংরা, রান্নার জায়গা অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর।
পরিদর্শনকালে বহু ব্যবসায়ীর আচরণ দেখে মনে হয়েছে, ক্রেতার স্বাস্থ্য বা প্রচলিত আইন নিয়ে তাঁরা উদাসীন বা অজ্ঞ। অথচ ‘ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড অ্যাক্ট, ২০০৬’-এ জনসচেতনতার প্রসার, ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরির মাধ্যমে নিয়মিত ভেজাল পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে প্রচার, ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ ও শংসাপত্র প্রদান রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা হিসেবে স্বীকৃত। দূষণ ও ভেজালমুক্ত খাদ্যের অধিকারকে বাড়তি গুরুত্ব দিতে ‘ক্রেতা সুরক্ষা আইন, ২০১৯’-এর ২(২১) ধারায় ‘গুডস’-এর সংজ্ঞায় ‘খাদ্য’কে পৃথক ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োগ? দায়িত্ব পালনে সরকারি স্তরে সেই ‘কার গোয়ালে কে ধোঁয়া দেয়’ সংস্কৃতি!
খাস কলকাতায় ষাটেরও বেশি রেস্তরাঁ ও মিষ্টির দোকানের লাইসেন্স সাময়িক বাতিল, বেশির ভাগই যথেষ্ট জনপ্রিয়, ব্যয়সাধ্য়। শোধরানোর নোটিস পেয়েছে যারা, তাদেরও অনেকেই নামকরা। ফলে আসন্ন উৎসবের কথা ভেবে রেস্তরাঁ-বিলাসীরা যেমন উদ্বিগ্ন, তেমনই চিন্তার ভাঁজ অজস্র ব্যবসায়ী ও কর্মীর কপালেও। এই অবস্থায় অনেকেরই প্রশ্ন, খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জনগণের করের টাকায় পরিচালিত একাধিক সংস্থা, সেগুলিতে সরকার-পোষিত কর্মী ও তাঁদের হাতে উপযুক্ত আইনি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে এই প্রাণঘাতী আপস চলছে কেন?
খাদ্যে ভেজাল ও দূষণের ঘটনা নতুন নয়। ১৯৮৮-তে বেহালায় রেশন দোকান থেকে কেনা তেলে সাবান ও প্লাস্টিক শিল্পে ব্যবহৃত ট্রাই-অর্থো-ক্রেসাইল ফসফেট মেশানো সস্তার তেল খেয়ে প্রায় আড়াইশো মানুষ চিরতরে পঙ্গু হয়ে যান, মারা যান অনেকে। ঘটনায় অভিযুক্ত ১৬ জন গ্রেফতার হলেও আইনি জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতায় দশকের পর দশক মামলা ঝুলে থাকায় শাস্তি হয়নি কারও। সুপ্রিম কোর্ট ও জাতীয় ক্রেতা সুরক্ষা কমিশনে এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সূত্রে ক্ষতিগ্রস্তরা সামান্য ক্ষতিপূরণ পান।
২০১৮-য় ঘটে ভাগাড়ের মাংস-কাণ্ড। প্রথম নজরে আসে বজবজের কিছু মানুষের, মূলত তাঁদের চেষ্টায় আটক হয় ভাগাড়ের মাংস-সহ দুষ্কৃতী। তদন্তে উদ্ঘাটিত হয় অপরাধচক্র: ধাপা, ট্যাংরা, কল্যাণী, বারাসত, টালিগঞ্জ, মধ্যমগ্রাম-সহ রাজ্যের নানা ভাগাড় তথা ডাম্পিং গ্রাউন্ড থেকে সংগৃহীত মৃত পশুর মাংস নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশিয়ে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেজিং করে দিনের পর দিন বিভিন্ন হোটেল-রেস্তরাঁয় সরবরাহ করা হত। গ্রেফতার হয় ১২ জন। তবে ঘটনার মূলচক্রী-সহ ছয় জন প্রমাণাভাবে অল্পদিনেই বেকসুর খালাস পায়। পরে ২০১৯-এ বনগাঁ আদালতের রায়ে মাত্র দু’জনের পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও এক লক্ষ টাকা জরিমানা হয়; হাই কোর্টে এক জন অব্যাহতিও পায়।
এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল, খাদ্য সুরক্ষার বিষয়টি এ রাজ্যে কত অবহেলিত। অথচ কাগজে-কলমে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা যথেষ্ট সংহত। ‘ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড অ্যাক্ট, ২০০৬’ রূপায়ণের দায়িত্ব যৌথভাবে কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের। ‘ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড অথরিটি’ কেন্দ্রীয় ভাবে কেবল বার্ষিক টার্নওভার ৫০ কোটি টাকা বা তার বেশি কিংবা আমদানি-রফতানির সঙ্গে যুক্ত এমন প্রতিষ্ঠান ও পাঁচতারা হোটেলগুলির লাইসেন্স প্রদান, নবীকরণ বা বাতিল করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মী-প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতার দায়িত্বপ্রাপ্ত। অথচ কলকাতায় তাদের যে পূর্বাঞ্চলীয় অফিস, সেটির এক্তিয়ার পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, সিকিম এবং আন্দামান ও নিকোবর পর্যন্ত বিস্তৃত হলেও কর্মী-সংখ্যা নগণ্য।
পাঁচতারার কম মর্যাদার হোটেল-রেস্তরাঁ’সহ, বার্ষিক ৫০ কোটি টাকার নীচে টার্নওভার এমন খাদ্য-প্রতিষ্ঠানের তদারকির দায়িত্ব রাজ্য সরকারের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজ্যের এক ফুড সেফটি ডেজ়িগনেটেড অফিসার এ বিষয়ে জানালেন, নিয়ম অনুযায়ী রাজ্যের প্রতি ব্লকে এক জন করে ফুড সেফটি অফিসার থাকার কথা। অথচ বাস্তবে অন্তত দু’টি বা তিনটি ব্লক এবং একটি মিউনিসিপ্যালিটির দায়িত্বে রয়েছেন এক জন করে অফিসার। এই বিস্তীর্ণ এলাকার হোটেল, রেস্তরাঁ, মিষ্টির দোকান থেকে শুরু করে ফুটপাতে অস্থায়ী ব্যবসায়ীদের খাবারের গুণমান দেখা, লাইসেন্স দেওয়া ও নবীকরণ, আইনভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা ইত্যাদি বহুবিধ দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। অথচ তাঁর কোনও অধস্তন কর্মী নেই, নেই গাড়ি বা বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহের জন্য অগ্রিম অর্থের জোগান। পরিদর্শনকালে নিগৃহীত হওয়ার ঝুঁকিও প্রবল, ব্যবসায়িক সংগঠন ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বাধার মুখে পড়ার অভিজ্ঞতা কম-বেশি সব ফুড সেফটি অফিসারেরই হয়েছে।
রাজ্যে খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ হওয়া যেমন জরুরি, তেমনই পরিকাঠামোর উন্নয়ন ও উপযুক্ত কর্মী-বাহিনী গড়ে তোলাও আবশ্যক। অন্যথায় খাদ্যে দূষণ ও ভেজালের ‘ঐতিহ্য’ চলবেই, ভুগবেন নাগরিক।