সোমনাথ মান্ডি, কানাই বাউরি, অক্ষয় দাস, রবি মুর্মু, কালা টুডু। কেবল নাম নয়, এগুলি এক-একটি পরিবারের উজাড় হয়ে যাওয়ার কাহিনি, গোটা এক অঞ্চলের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার ইতিহাস। সে অঞ্চল পুরুলিয়া, যেখানে রূপমুগ্ধ আমরা দেখি অরণ্যানী ও পাহাড়ের পটচিত্র।
রূপ যেমন চোখ ঝলসায়, মুগ্ধতাও সে-রকম অন্ধত্ব নামিয়ে আনে। আমরা দেখেও দেখি না, রূপের আড়ালে কতখানি মৃত্যুময়তা এখনও রয়েছে। নিতুড়িয়া ব্লকের দিকে যাওয়ার রাস্তা ধরে কিছুটা এগোতেই চার পাশের পরিবেশ বদলে যায়। চার দিকে ধোঁয়াশা, রাস্তার দু’পাশের সবুজ গাছপালার উপর জমে রয়েছে কালো ছাইয়ের পুরু আস্তরণ। গ্রামবাসীদের মুখে শুনলাম, বর্ষাকাল চলছে বলেই নাকি ধোঁয়ার দাপট কিছুটা স্তিমিত। তাতেই যদি এই অবস্থা হয়, তা হলে অন্য সময় এর চেহারা কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা অনুমান করতেও বুক কাঁপে।
এটা এক দিনে ঘটেনি। বিপর্যয়ের শুরু কয়েক বছর ধরে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাস্তার দু’পাশে গড়ে ওঠা অজস্র কারখানা। অনিয়ন্ত্রিত স্পঞ্জ আয়রন ইউনিট, সিমেন্ট ফ্যাক্টরি এবং কোয়ার্টজ বা রামিং মাসের প্রক্রিয়াকরণ কারখানাগুলো থেকে দিনরাত নির্গত হচ্ছে প্রাণঘাতী বর্জ্য।
অঞ্চল জুড়ে কারখানার দাপট। এই শিল্প-বলয় এখন মানুষের ফুসফুসে সিলিকোসিসের বিষ ঢালছে, আর কৃষিজমিতে বিষাক্ত কারখানার ফ্লাই অ্যাশ (কালো ছাই) ফেলে ধ্বংস করছে কৃষিকে। পুকুর ও নদীর জলের উপর পড়েছে বিষাক্ত কালো আস্তরণ, মারা পড়ছে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ। সেই জল, ঘাস-পাতা খেয়ে গবাদি পশু মৃত বাচ্চা প্রসব করছে। পাখিরা এলাকা ছেড়েছে। অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়নের থাবায় শুধু মাটিই নষ্ট হচ্ছে না, খনিজ সম্পদের লোভে শেষ হয়ে যাচ্ছে গড়পঞ্চকোট ও জয়চণ্ডী পাহাড়ের মতো প্রাকৃতিক সম্পদও। সরকারি সিলমোহর পড়ে গেছে পাহাড় কাটার উদ্যোগে।
পাহাড় না কাটলে নাকি উন্নয়ন হবে না। গোড়ায় লোকে এ-কথা বিশ্বাস করেছে। কিন্তু যখন দেখল, উন্নয়ন মানে স্পঞ্জ আয়রন কারখানার কালো ধোঁয়াতে মানুষের ফুসফুস ঝাঁঝরা করে দেওয়া, গোটা গোটা গ্রামকে উচ্ছিন্ন হওয়ার মুখে ঠেলে দেওয়া এবং প্রকৃতিকে নিঃস্ব করে দেওয়া, তখন কর্মহীনতার আশঙ্কা, পুলিশের ভয়, এবং বাহুবলীদের ভয় উপেক্ষা করে সমবেত হতে লাগল। সংগঠিত হল দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন। মালিকপক্ষের লোকেরা তো নয়ই, সরকারও প্রথমে মানতে চায়নি যে লোকেদের ফুসফুসে প্রাণঘাতী ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে।
দীর্ঘ আন্দোলন ও দূষণজনিত বহু মৃত্যুর পর সরকার অবশেষে ২০২৬ সালের অগস্ট মাসে ১৬ জনের সিলিকোসিসে আক্রান্ত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। এই সংখ্যা এখন রাজ্যের সংবাদমাধ্যমেও প্রতিষ্ঠিত সত্য। জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্টেও তার সমর্থন মেলে। কিন্তু প্রশাসনিক ব্যবস্থা করার গতি ছিল শম্বুকের চলনের মতো। মেডিক্যাল বোর্ড বসার ঠিক দু’দিন আগে কানাই বাউরি মারা যান, আর বোর্ড বসার পরে মারা যান অক্ষয় দাস।
কিন্তু এই ১৬ জন হিমশৈলের চূড়া মাত্র। এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, শুধু একটি কারখানায় প্রায় ৪০ জন কাজ করতেন; তাঁদের মধ্যে ইতিমধ্যে ১৯ জন সিলিকোসিসের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন, আর বাকিরাও মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত ছাড়াও বহু কারখানা এখানে চলছে, যেগুলোর কোনও বৈধ কাগজপত্র নেই।
সিলিকোসিস কোনও দুর্ঘটনা নয়— একটি শ্রেণিচরিত্রসম্পন্ন ব্যাধি। যখন মুনাফার স্বার্থে ধুলো নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি এড়িয়ে যাওয়া হয়, শ্রমিকদের সুরক্ষা সরঞ্জাম না দিয়েই কাজে নামানো হয়, আর দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নজরদারি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে, তখনই এই রোগের জন্ম হয়।
রঘুনাথপুর অঞ্চলের বাতাসের গুণমান সূচক (একিউআই) মাঝেমধ্যেই ২০০ ছাড়িয়ে যায় বলে পরিবেশ গবেষকেরা সতর্ক করেছেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পর্যন্ত এই সিলিকোসিস সঙ্কট নিয়ে রাজ্য সরকারের কাছে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিবেদন তলব করতে বাধ্য হয়েছে। অর্থাৎ, এই সঙ্কট আর স্থানীয় অভিযোগের পর্যায়ে নেই। এটি এখন রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নথিভুক্ত প্রমাণ। এই প্রাকৃতিক-সামাজিক সঙ্কটের পাশাপাশি চলছে দ্বিতীয় এক আগ্রাসন— ভূমি বেদখল। পুরুলিয়ার গ্রামের গা-ঘেঁষে যে একের পর এক নতুন রেড ক্যাটেগরির স্পঞ্জ আয়রন, স্টিল ও রামিং মাস কারখানা জোর করে গড়ে তোলা হচ্ছে তা এক পর্যায়ে গণহত্যারই শামিল।
রাজ্য সরকারের তরফ থেকে পুরুলিয়াকে ‘শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের মডেল’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। সরকারি প্রচারে উঠে এসেছে আশ্বাস— এখানকার নানা প্রকল্প তরুণদের ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হওয়া আটকাবে।
বাস্তবের ছবিটা অবশ্য বেয়াড়া। স্থানীয় মানুষ তাঁদের নিজের জমি থেকেই উদ্বাস্তু হচ্ছেন, আর যাঁরা কারখানায় ঠিকা শ্রমিকের কাজ পাচ্ছেন, তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে সিলিকোসিসে ফুসফুস ঝাঁঝরা হওয়ার নির্মম পরিণতি। প্রকৃতির তো কথাই নেই, তার সন্নিপাত দশা।
এই আগ্রাসনের শুরু ২০০৭ সালে। তৎকালীন সরকার কর্মসংস্থানের নামে কৃষকদের কাছ থেকে জলের দামে উর্বর জমি কিনে কর্পোরেট মালিকদের হাতে তুলে দিয়েছে। তৃণমূল আমলের সিএজি অডিটেও পুরুলিয়ায় জনজাতিভুক্ত জমির মালিকদের বঞ্চিত করে কয়লা-কেলেঙ্কারিতে যুক্ত সংস্থাকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। সরকার বদলানোর পরও বিপজ্জনক ‘উন্নয়ন’চক্রের ঘূর্ণনে কোনও ছেদ নেই।