E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

বাঁধের উত্তরে বাঁধ

সিয়াংই ভারতে প্রবেশ করা ব্রহ্মপুত্রের প্রধান জলধারা। ভারতের যুক্তি, সিয়াং নদীর উপর ১১,২০০ মেগাওয়াটের প্রস্তাবিত ক্ষমতাসম্পন্ন এই প্রকল্প তৈরি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জল সংরক্ষণেও তা ব্যবহার করা হবে।

পাডি কৃষ্ণমূর্তি বালচন্দ্রন

শেষ আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৫:২৯
বিপন্ন: অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং জেলায় ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রোজেক্ট’-এর বিরোধিতায় পথে নেমেছেন প্রতিবাদীরা।

বিপন্ন: অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং জেলায় ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রোজেক্ট’-এর বিরোধিতায় পথে নেমেছেন প্রতিবাদীরা।

অরুণাচল প্রদেশে প্রস্তাবিত আপার সিয়াং বহুমুখী প্রকল্পের সঙ্গে ক্রমশই জড়িয়ে পড়ছে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূকৌশলগত স্বার্থের প্রশ্ন। চিন তিব্বতে ব্রহ্মপুত্রের প্রধান উৎস ইয়ারলুং সাংপোর উপরে বিরাট জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করতে চলেছে। সেই পরিকল্পনার পরিপ্রেক্ষিতে আপার সিয়াং প্রকল্পকে নয়াদিল্লি দেশের জল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরছে।

সিয়াংই ভারতে প্রবেশ করা ব্রহ্মপুত্রের প্রধান জলধারা। ভারতের যুক্তি, সিয়াং নদীর উপর ১১,২০০ মেগাওয়াটের প্রস্তাবিত ক্ষমতাসম্পন্ন এই প্রকল্প তৈরি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জল সংরক্ষণেও তা ব্যবহার করা হবে। শুষ্ক মরসুমে জলপ্রবাহ অস্বাভাবিক ভাবে কমে যাওয়া, বা বর্ষায় হঠাৎ বিপুল পরিমাণ জল ছেড়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতির মোকাবিলা করা সম্ভব হবে এই প্রকল্পের জলাধারের মাধ্যমে।

যদিও বেজিং বার বার আশ্বাস দিয়েছে, তাদের প্রকল্পের ফলে ইয়ারলুং সাংপোর নিম্নাংশে থাকা দেশগুলির ক্ষতি হবে না, কিন্তু সেই আশ্বাসে ভারত পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারছে না। চিন উজানে কী করছে, তার কতটা প্রকাশ করছে— তা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ঝুঁকির মোকাবিলায় বিশ্বের অন্যতম পরিবেশগত ভাবে স্পর্শকাতর এবং ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে আরও একটি বিশাল বাঁধ তৈরি করাই কি একমাত্র ও সঠিক বিকল্প? বিশেষ করে নেপালের সাম্প্রতিক জলপ্রলয় ও সিকিমে বাঁধ ভাঙার ঘটনা যখন আমাদের দেখিয়েছে, বাঁধভাঙা জলপ্লাবন ঠিক কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

আপার সিয়াং প্রকল্প এখনও সমীক্ষা ও প্রস্তুতিপর্বে রয়েছে। কিন্তু সরকার পক্ষ প্রকল্পটিকে ঘিরে ক্রমশ এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেন সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই নিয়ে ফেলা হয়েছে। পরিবেশগত সমীক্ষা, গ্রামবাসীদের সঙ্গে আলোচনা এবং সম্ভাব্যতা যাচাই যেন নেহাতই সময়ের অপেক্ষা। প্রকল্পের কৌশলগত গুরুত্বের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তাকে বড় করে তুলে ধরা হচ্ছে। কারণ, প্রশ্নটা জাতীয় নিরাপত্তার হলে, তার সামনে বাস্তুচ্যুতি, ভূমিকম্পের ঝুঁকি, পরিবেশের ক্ষতি— সব আপত্তিকেই গৌণ করে তোলা সম্ভব। কিন্তু তার পরেও, ভারতের নিজস্ব কৌশলগত যুক্তিতেই কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

প্রস্তাবিত জলাধারে প্রায় ১৪০০ কোটি ঘনমিটার জল ধরে রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে জলাধারের একটি অংশ খালি রাখা হবে, যাতে উজান থেকে আচমকা বিপুল জল নেমে এলে তা ধারণ করা যায়। কিন্তু এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে জলাধারে সেই সময় কতটা জল রয়েছে, জলপ্রবাহের সময় ও পরিমাণ কত, বাঁধের অবস্থা কেমন এবং সীমান্তের ও-পারে ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনাকে কত দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে, তার উপর। প্রকল্পের নির্মাণ শেষ করতেই প্রায় এক দশক সময় লাগতে পারে। অসম্পূর্ণ নির্মাণকাজ, অস্থায়ী কাঠামোর জেরে উপরিভাগ থেকে ধেয়ে আসা আকস্মিক বন্যা, ভূমিধসজনিত ঢেউ কিংবা হঠাৎ জল ছাড়ার ঘটনায় প্রকল্পটি নিজেই বিপন্ন হতে পারে। অর্থাৎ, যে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে কৌশলগত সমাধানসূত্র হিসেবে দাবি করা হচ্ছে, তা আদতে নির্মাণের সময় থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ!

প্রকল্পটির পরিবেশগত প্রভাবও কম উদ্বেগের নয়। সিয়াং অববাহিকার বিস্তৃতি ১৫ হাজার বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি। এর ৮২ শতাংশের বেশি এলাকা বনাঞ্চল। ঘন বন, বিরল প্রাণী ও উদ্ভিদ, বৈচিত্রময় বাস্তুতন্ত্রের জন্য এই এলাকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এত বড় জলাধার তৈরি হলে বিপুল পরিমাণে জঙ্গল সাফ হবে। এখানকার বিস্তীর্ণ বনভূমি জলের তলায় চলে যেতে পারে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে প্রাণীদের আবাসস্থল। ব্যাহত হতে পারে মাছের চলাচল, জলজ খাদ্যশৃঙ্খল এবং নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা কৃষিনির্ভর মানুষের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক ছন্দ।

ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকির বিষয়টি আরও গুরুতর। অরুণাচল ভারতের সর্বোচ্চ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলির একটি। পূর্ব হিমালয় কোনও অস্থির ও তুলনায় নবীন ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল হওয়ায় এখনও সেখানে সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন চলছে। বিস্তীর্ণ এলাকা চ্যুতিরেখায় বিভক্ত, ভূমিকম্প, ভূমিধস ও পাহাড়ের ঢাল ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ১৯৫০ সালে ৮.৬ মাত্রার ভূমিকম্পের ফলে এই অঞ্চলে ব্যাপক ভূমিধস, মাটিতে ফাটল এবং নদীর গতিপথে বাধা তৈরি হয়েছিল। এমন ভূপ্রকৃতিতে ভারতের অন্যতম বৃহৎ বাঁধ নির্মাণের আগে অনেক বেশি গভীর ও কঠোর সমীক্ষার প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তন এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। হিমবাহের দ্রুত গলন, অতিবৃষ্টি এবং হিমবাহজাত হ্রদের আকস্মিক জলমুক্তির ঘটনা পাহাড়ি নদীগুলিতে আচমকা বিপুল জল, পাথর ও কাদার ঢল নামার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

২০২৩ সালে সিকিমে হিমবাহজাত হ্রদের আকস্মিক জলমুক্তির ফলে তিস্তার উপরে তিনটি বাঁধের ধ্বংসের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, ঐতিহাসিক গড় তথ্যের উপর নির্ভর করে হিমালয়ের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নিরাপত্তা বিচার করা কতটা বিপজ্জনক। ওই বিপর্যয় প্রমাণ করেছে, চরম প্রাকৃতিক বিপর্যয় চোখের পলকে এমন পরিকাঠামোকেও ধ্বংস করে দিতে পারে, যাকে পরিবেশবান্ধব শক্তি ও আঞ্চলিক উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল।

সিয়াং উপত্যকার মানুষও জানেন এই ঝুঁকির প্রথম অভিঘাত তাঁদেরই সামলাতে হবে। তাই সেখানকার ভূমিপুত্র আদি জনজাতি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা, কৃষক, পড়ুয়া এবং পরম্পরাগত সংগঠনের নেতারা বার বার প্রকল্পের বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, ওই প্রকল্প তৈরি হলে পূর্বপুরুষের জমি, কৃষিজীবন এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বড় অংশ জলাধারের নীচে হারিয়ে যেতে পারে। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, অন্তত ১৬টি আদি গ্রাম জলাধারের জলে ডুবে যেতে পারে। সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। স্থানীয় প্রতিনিধিদের দাবি, বৃহত্তর ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা এক লক্ষ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

২৭টিরও বেশি গ্রামের বাসিন্দারা প্রকল্পের সমীক্ষার বিরোধিতা করেছেন। ছাত্রসংগঠন এবং স্থানীয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর অভিযোগ, অর্থপূর্ণ আলোচনার পরিবর্তে চাপের পরিবেশ তৈরি করে সমীক্ষা চালানোর চেষ্টা হচ্ছে। বিক্ষোভ দমনে প্রস্তাবিত সমীক্ষা এলাকায় কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছিল। আদি জনজাতিভুক্তদের কাছে সিয়াং শুধুমাত্র বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারা জলরাশি নয়, এ নদী তাঁদের কাছে ‘আনে সিয়াং’, অর্থাৎ পবিত্র নদী। এই নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে তাঁদের জমি, কৃষিকাজ, সামাজিক পরম্পরা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। আদি সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ঐতিহ্যবাহী সংগঠন আদি বানে কেবাং ইতিমধ্যেই প্রকল্পটি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং সমীক্ষার জন্য মোতায়েন বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।

অরুণাচল সরকার প্রকল্প এলাকার কিছু অংশে গ্রামবাসীদের তরফে সমীক্ষার অনুমতি মিলেছে বলে দাবি করছে। কিন্তু প্রাথমিক সমীক্ষার অনুমতি মানেই বাঁধ নির্মাণের জন্য মানুষের সম্মতি নয়। প্রকল্পের চূড়ান্ত পরিধি, বাস্তুচ্যুতির পরিমাণ এবং সামগ্রিক ঝুঁকি এখনও পুরোপুরি নির্ধারিত হয়নি। কিছু গ্রামের মানুষ সমীক্ষার জন্য রাজি হয়েছেন মানে এই নয় যে, প্রকল্পের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। ক্ষতিপূরণও এই সমস্যার সমাধান নয়। কারণ, তা দিয়ে পূর্বপুরুষের জমি, নদীনির্ভর জীবিকা কিংবা সিয়াংকে ঘিরে গড়ে ওঠা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরো অববাহিকার একটি স্বাধীন ও সমন্বিত মূল্যায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপার সিয়াং প্রকল্পের কাজ স্থগিত রাখা উচিত। সেই মূল্যায়নে বাঁধের জলাধার থেকে ভূমিকম্পের সম্ভাবনা, হিমবাহজাত হ্রদের আকস্মিক জলমুক্তি, পলি জমা, বাঁধ ভেঙে গেলে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের প্রকৃতি ও ব্যাপকতা, নিম্নপ্রবাহের উপর প্রভাব এবং একই অববাহিকায় পরিকল্পিত অন্যান্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্মিলিত প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।

যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন না করা হলে আপার সিয়াং প্রকল্প বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে ঢাল না হয়ে নিজেই আর একটি বিপর্যয়ের কারণ ও মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে। চিনের পদক্ষেপ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ যথার্থ হতে পারে, কিন্তু সেই উদ্বেগের জবাব দিতে গিয়ে অরুণাচলের মানুষ, প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নতুন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Arunachal Pradesh Risk Factors

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy