সম্প্রতি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে চার দিকে নানা আলোচনা দেখে মনে হচ্ছে আমার মেজকাকা শ্যামাপ্রসাদকে কেবল রাজনীতির নেতা হিসাবেই আজ ভাবা হয়। অথচ বাংলার জীবনে তাঁর ভূমিকা শুধু রাজনীতিক্ষেত্রেই আবদ্ধ ছিল না। তা ছাড়াও তাঁর একটা মস্ত গুরুত্বপূর্ণ জীবন ছিল।
স্যর আশুতোষের (আমার পিতামহের) মৃত্যুর পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন শ্যামাপ্রসাদ। তাঁর লেখায় পড়ি, শেষ বার ঠাকুরদাদার সঙ্গে যখন দেখা হয়, বারান্দায় দাঁড়িয়ে ইউনিভার্সিটির পরিচালনা বিষয়েই কথা বলেছিলেন পিতাপুত্র। হঠাৎই অসুস্থ হয়ে স্যর আশুতোষের মৃত্যু হয়। সমগ্র পরিবারের কাছেই তিনি ছিলেন এক বিরাট প্রভাব, তাঁর আদর্শ আজীবন পুত্রদের কাজেকর্মে প্রতিফলিত হয়েছে। পরিবারের মধ্যে ছিল দুটো ধারা, একটা লিবারাল, অন্যটা রক্ষণশীল। শ্যামাপ্রসাদ লিবারাল ধারাটি বহন করেছেন। স্যর আশুতোষ তাঁর বিধবা মেয়ের বিবাহ দিয়েছিলেন, সে কালে কম কথা নয়। এ দিকে আমার ঠাকুমার কারণে বাড়ির অন্যদের মধ্যে একটা গোঁড়ামি ছিল। মেজকাকার মধ্যে ছিল না। তাঁর জীবনটা খোলামেলা, মুরগিও খেতেন। মনে পড়ে, মধুপুরের বাড়িতে অন্যরা সকলে ভিতরে খেতেন, বাগানে মুরগি খাওয়ার দলে থাকতেন মেজকাকা! মায়ের প্রতি ছিল তাঁর গভীর ভালবাসা ও শ্রদ্ধা।
মেজকাকার সঙ্গে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনেরও ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল। দেশবন্ধু বাড়িতে আসতেন স্যর আশুতোষের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে। যত দূর জানা যায়, ১৯১৭ সালে দেশবন্ধুর প্রতি সমর্থনের নিয়েই ঠাকুরদার বিরুদ্ধে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ ছিল, উনি জজ হয়েও রাজনীতি করছেন!
বঙ্গবাণী ছিল পারিবারিক পত্রিকা। স্যর আশুতোষের বাড়ি থেকেই তার সব কাজ হত। বাবা (রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়) এবং মেজকাকা দু’জনে মিলে পত্রিকা চালাতেন, সেজকাকা উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুলের বহু লেখা প্রকাশিত হয়েছে বঙ্গবাণী-তে, সকলের সঙ্গেই গভীর পরিচয় ছিল। মেজকাকার স্ত্রী, আমার কাকিমার কম বয়সে মৃত্যু হলে রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে কাকাকে লিখেছিলেন, “তোমার বলিষ্ঠ মনে এ ব্যথা তুমি কাটাতে পারবে আশা করি।” আশুতোষ কলেজের নতুন বাড়ি হওয়ার সময়ে রবীন্দ্রনাথ একটি দীর্ঘ কবিতা লিখে দিয়েছিলেন।
রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগে মেজকাকা এশিয়াটিক সোসাইটি-র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অব সায়েন্স-এর সঙ্গেও। সি ভি রমনের সঙ্গে মেজকাকার তীব্র বিরোধ হয় সে সময়ে। মেজকাকার মনে হয়েছিল, রমন বাঙালিদের যথেষ্ট প্রশ্রয় দিচ্ছেন না, এবং গবেষণার জন্য রমন কলকাতা ইউনিভার্সিটিকে উপেক্ষা করে বৌবাজারের ল্যাব বেছে নিচ্ছেন। কম বয়স থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার কাজে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত মেজকাকা। স্যর হাসান সোহরাওয়ার্দির পর তিনি উপাচার্য হলেন, তখন তিনি ৩৩-৩৪। ডায়রিতে দেখি, প্রধানত বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েই কাটত তাঁর সময়। বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি বিভাগ, ইসলামি ইতিহাস বিভাগ চালু করেন। হুমায়ুন কবীরকে স্কলারশিপ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ঘনিষ্ঠতা ছিল সোহরাওয়ার্দি পরিবারের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ ১৯২৬-২৭ সালে মেজকাকাকে অনুরোধ করেছিলেন হাসান সোহরাওয়ার্দিকে ‘বাগীশ্বরী প্রফেসর অব ফাইন আর্টস’ সম্মান দেওয়ার জন্য, যা নিয়ে অশান্তি হয়, প্রবাসী-তে এর বিরুদ্ধে লেখালিখি হয়। মেজকাকার সঙ্গে অধ্যাপক সোহরাওয়ার্দির হৃদ্যতা কিন্তু অমলিন ছিল, দু’জনে কত সময় ঘরে বসে কথা বলতেন। এই যে এতগুলি পাবলিক ইনস্টিটিউশনে মেজকাকার ভূমিকা, এটা আজকাল আলোচিত হতে দেখি না।
প্রাদেশিক কাউন্সিলের কংগ্রেস সদস্য মেজকাকা ১৯৩০ সালে পদত্যাগ করেন, আইনসভা বয়কটের নীতির বিরোধিতায়। সুভাষচন্দ্রের সহপাঠী আমার বাবাও বয়কট-নীতি মানতে পারেননি, উনিও কাউন্সিল ছেড়ে ওকালতিতে চলে যান। সুভাষচন্দ্রের কথা আলাদা করে বলা দরকার, কেননা এখন শ্যামাপ্রসাদ-সুভাষচন্দ্র ‘বিরোধিতা’ নিয়ে অনেক হইচই। সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে কিন্তু এই পরিবারের বরাবরের যোগাযোগ। আমার বাবা ও সুভাষচন্দ্র বসু এক সঙ্গে কলকাতা কর্পোরেশনের মেম্বার ছিলেন, ঘনিষ্ঠ সহপাঠীও ছিলেন। এক বারই মেজকাকা আর সুভাষ বসুর ‘ক্ল্যাশ’ হয়েছিল কর্পোরেশনের নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে। সেটা বাদ দিয়ে উনি সুভাষ বিষয়ে বিরূপ ধারণা পোষণ করেননি, বেশ শ্রদ্ধাই করতেন। বরং ওঁর দাদা শরৎচন্দ্র বসুর সঙ্গে মেজকাকার ভাবও বেশি, মতবিরোধও বেশি।
১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক আইনসভা নির্বাচনে মেজকাকা কোনও দলের সদস্য না হয়েই ভোটে জিতেছিলেন। মুসলিম লিগ ও কৃষক প্রজা পার্টির শরিকি সরকারে শ্যামাপ্রসাদকে নির্দল মন্ত্রী করার প্রস্তাব দেন হুমায়ুন কবীর। কিন্তু মুসলিম লিগের তরুণ ছাত্র সংগঠন আপত্তি জানায়। আপত্তির প্রেক্ষিত সম্ভবত— ত্রিশের দশকে ইউনিভার্সিটিতে ‘এমব্লেম’ নিয়ে বিতর্ক। ‘শ্রী’ এবং পদ্ম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক হবে কি না, এ নিয়ে কাউন্সিলের মুসলমান প্রতিনিধিরা আপত্তি জানালে মেজকাকার সঙ্গে সংঘাত বেধেছিল।
কৃষক প্রজা পার্টির (কেপিপি) জনপ্রিয় নেতা ফজলুল হকের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদের পারিবারিক সদ্ভাব ছিল। ফজলুল হক ছিলেন উকিল হিসেবে ঠাকুরদাদার জুনিয়র। বিরাট চেহারার মানুষ, হাঁটু-ঝুল পায়জামা, সঙ্গে পাঞ্জাবি— বরিশালের পটুয়াখালির লোক ফজলুল হকের সঙ্গে মেজকাকার রীতিমতো সুসম্পর্ক। অ্যাসেম্বলি-র মধ্যে দু’জনের বিরোধিতা থাকলেও, ঘনিষ্ঠতা কমেনি।
ত্রিশের দশকের শেষে কেপিপি ভেঙে যাওয়ায় মুসলিম লিগের সঙ্গে হাত মেলালেন ফজলুল হক। ১৯৪১ সালে শ্যামাপ্রসাদ আর ফজলুল হক দু’জনে এক সঙ্গে মন্ত্রিসভা গড়লেন। ওই সরকারে তাঁদের বোঝাপড়ার অনেক নিদর্শন ছিল। সরকার পরিচালনায় খুবই সক্রিয় ছিলেন মেজকাকা। নজরুলের চিঠি থেকে জানি, সে সময় শ্যামাপ্রসাদ তাঁর স্বাস্থ্যোদ্ধারের ব্যয়ভার গ্রহণ করেছিলেন। বাঙালি মুসলমানের অন্যতম প্রধান মুখপত্র মোহাম্মদী পত্রিকাটি চালানোর জন্য উদ্যোগী হয়েছিলেন। এই মন্ত্রিসভা বেশি দিন টিকল না। মেজকাকা ও ফজলুল হক, দুই জনের সঙ্গেই গভর্নর হারবার্টের প্রবল বিরোধ হল। তখনকার অ্যাসেম্বলিতে একটা বড় ইউরোপিয়ান ব্লক থাকত, যাঁরা এই মন্ত্রিসভা ভাঙতে লিগের অন্য কিছু নেতাকে প্রাধান্য দিচ্ছিলেন, যেমন নাজিমুদ্দিন বা এম এ এইচ ইস্পাহানি। দু’জনেই ফজলুল হকের তীব্র বিরোধী। স্পষ্টতই একটা বাঙালি-অবাঙালি মুসলমান বিরোধিতা তৈরি করা হচ্ছিল। মন্ত্রিসভা ভাঙার পর মেজকাকা বললেন, ‘প্রভিনশিয়াল অটোনমি’র নামে এ কেবল ‘মকারি’। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের নামে তাঁদের ঠকানো হয়েছে। সে এক বড় দুর্ভাগ্যের সময়। অথচ, ওটাই ছিল তখনকার একমাত্র কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা, হিন্দু বাঙালি ও মুসলমান বাঙালির এক সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করার একমাত্র সুযোগ। ব্রিটিশের হাতে বন্দি না হলে হয়তো শরৎচন্দ্র বসুও যোগ দিতে পারতেন এতে।
মেজকাকার সঙ্গে মুসলিম লিগের বাইরেও মুসলমান রাজনীতিকদের সৌহার্দ ছিল: গজনভী, রতনপুরের নবাব ফারুকী সাহেব, প্রখ্যাত অ্যাসেম্বলি সদস্য বোরহানউদ্দিন সাহেব, প্রথম মহিলা পার্লামেন্টারিয়ান সেক্রেটারি হাসিনা মুরশেদ। মেজকাকা ন্যাশনালিস্ট পত্রিকা বার করতেন, হুমায়ুন কবীর ছিলেন নিয়মিত লেখক। বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমান সমাজের মধ্যে যথেষ্ট সুসম্পর্ক সেই সময়ে। মেজকাকার প্রতি ফজলুল হকের এতটাই স্নেহ ছিল যে, শুনেছি, উনি নাকি মেজকাকার মৃত্যুর (১৯৫৩) পরে বলেছিলেন, “আই হ্যাভ লস্ট মাই ব্রাদার।”
অনেক রাজনৈতিক প্রশ্নেই শ্যামাপ্রসাদের বিশ্বাস ছিল কংগ্রেসের কাছাকাছি। পাকিস্তান আন্দোলনের প্রেক্ষিতে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রবিশিষ্ট অখণ্ড ভারত তৈরির বিষয়েও কংগ্রেস আর মেজকাকার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এক রকম। দেশভাগ-বাংলাভাগের সময় সেটা বোঝা গেল। আসলে, পশ্চিমবঙ্গ তৈরিতে শ্যামাপ্রসাদের গুরুত্বটা অন্যত্র— বিভিন্ন পার্টির, বিভিন্ন পেশার মানুষকে বাংলা ভাগের গুরুত্ব বোঝান তিনি। যদুনাথ সরকার, মেঘনাদ সাহা প্রমুখের কাছে বাংলা ভাগের মাধ্যমে হিন্দুদের ‘সেপারেট হোমল্যান্ড’-এর ভাবনাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলেন। ওঁর মধ্যে একটা ‘পারসুয়েসিভ পারসোনালিটি’ ছিল। ওই প্রভাবিত করার ক্ষমতা দিয়েই নেতৃস্থানীয় মানুষদের সঙ্গে মিশতেন। পাকিস্তান প্রোপাগ্যান্ডা তখন বাংলার শহরে-গ্রামে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। দাঙ্গাহাঙ্গামা বেশি না হলেও বাজার লুট, গোলমাল, গ্রামের দিকে লেগেই ছিল। কৃষিপ্রধান বাংলায় জমিদার-রায়ত বিরোধ ক্রমে সাম্প্রদায়িক অশান্তি ছড়াতে লাগল। আমাদের কোনও জমিদারি ছিল না, এক ফোঁটা জমিও ছিল না। মনে পড়ে, ১৯৪০-এর ডিসেম্বরে, কুষ্টিয়ায় গড়াই নদীর ধারে, শিলাইদহ থেকে কিছু দূরে কয়া গ্রামে ওঁদের মামার বাড়ি গিয়েছি সপরিবারে। সেখান থেকে ফিরে এসেই মেজকাকা গেলেন দেশবন্ধু পার্কে হিন্দু মহাসভার মিটিং-এ। আমিও সঙ্গে গেলাম। সাভারকারকে দেখলাম, এক জন বেঁটেখাটো মানুষ, মাথায় কালো টুপি।
পরে কিন্তু হিন্দু মহাসভার সঙ্গে মেজকাকার মতবিরোধ হয়, বিশেষত সাভারকরের সঙ্গে। ১৯৪০ সালে হিন্দু মহাসভায় যোগদানের পর মেজকাকা চেয়েছিলেন ভারতে একটা গণ-আন্দোলন হোক। তা হয়নি। বাংলায় পঞ্চাশের মন্বন্তরে ও সেই সময়ে মেদিনীপুরের সাইক্লোনে বিশাল ত্রাণপরিকল্পনায় তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
স্বাধীন ভারতে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সঙ্গেও ওঁর বিবাদ ঘটে। পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে শ্যামাপ্রসাদের ‘বাড়াবাড়ি’ পছন্দ ছিল না নেহরুর। তিনি মেজকাকাকে চিঠিতে লেখেন, “তুমি বাঙালিদের বড্ড বেশি প্রমিনেন্স দিচ্ছ।” জবাবে মেজকাকা বললেন যে, “তুমি কত জন কাশ্মীরিকে চাকরি দিয়েছ, দেখবে লিস্ট?” বলে একটা লিস্ট পাঠিয়ে দিলেন! সেই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ, ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি, ফার্টিলাইজ়ার কোম্পানি তৈরিতে মেজকাকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়ের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত আলোচনা-পরামর্শ চলত।
সব মিলিয়ে মেজকাকা যেন এক ‘একক’ চরিত্র। একক ভাবেই অক্লান্ত কাজ করে গিয়েছেন। হীরেন মুখোপাধ্যায় হয়তো এই জন্যেই তাঁর প্রশংসা করে বলেছিলেন, “পলিটিক্স ওয়াজ় দ্য স্মলেস্ট পার্ট অব ইট।” এই ধরনটা মেজকাকা পেয়েছিলেন পিতৃসূত্রে। ঠাকুরদাদা একা হাতে কলকাতা ইউনিভার্সিটি সামলেছিলেন। মেজকাকাও একের পর এক প্রতিষ্ঠান তৈরিতে সক্রিয় থেকেছেন— অখণ্ড বাংলায়, পশ্চিমবঙ্গেও। একার জোরেই।
প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি, কলকাতা ও বম্বে হাই কোর্ট