E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সময় যেখানে স্থির দাঁড়িয়ে

তবু তফাত থেকে যায়। সে পার্থক্য আন্দোলনের চরিত্রে। ইউরোপের আন্দোলন অনেকাংশে সর্বাত্মক। ছাত্র-যুবদের মতোই লড়াইয়ের ময়দানে মজুর শ্রেণি। এ দেশের লড়াইয়ে তুলনামূলক ভাবে সক্ষম ছাত্র-যুবরাই শামিল।

কুমার রাণা

শেষ আপডেট: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:১৬

বাস্তবিকই ভূত দেখছে ইউরোপ— ন্যায্যতার ভূত। একের পর এক শহরে পথের দখল নিচ্ছে ছাত্র-যুব থেকে মজুরের দল। শিক্ষার দাবি, স্বাস্থ্যের দাবি, কর্মনিয়োগের দাবি ফিকে করে দিচ্ছে তথাকথিত রাষ্ট্রবাদের রণধ্বনি। একই কালখণ্ডে, একটু আগে পরে, আমাদের ভারতবর্ষও উত্তাল হয়েছে ছাত্র-যুবদের কলকণ্ঠে। প্রতাপশালী শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে তারুণ্যের স্পর্ধা।

তবু তফাত থেকে যায়। সে পার্থক্য আন্দোলনের চরিত্রে। ইউরোপের আন্দোলন অনেকাংশে সর্বাত্মক। ছাত্র-যুবদের মতোই লড়াইয়ের ময়দানে মজুর শ্রেণি। এ দেশের লড়াইয়ে তুলনামূলক ভাবে সক্ষম ছাত্র-যুবরাই শামিল। শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে তাঁদের সংযোগের কোনও নিশানা দৃশ্যমান নয়।

হাজিরার অভাব কেবল মিছিলের নয়। যে মানুষগুলো রাস্তায় নেই, তাঁরা আমাদের উন্নয়নের হিসাবেও নেই। তাঁদের খুঁজতে খুঁজতে পৌঁছে যাই ঝাড়গ্রাম জেলার একটা গ্রামে। দেখি, পঞ্চাশ বছর ধরে স্থির দাঁড়িয়ে আছে সময়। পঞ্চাশ বছরের সাক্ষ্যের যদি কোনও মূল্য থাকে, তা হলে আমাদের মানতেই হবে, সময় যখন চার পাশে প্রচণ্ড গতিময়, তখন এই ক্ষুদ্র লোকসমষ্টির মধ্যে, এই সঙ্কীর্ণ গ্রাম-ভূখণ্ডে কিন্তু সময় স্থির হয়ে আছে।

আমাদের স্কুলে যাওয়ার পথে ছিল এই গ্রাম। লোকেরা খেটে-খাওয়া জনজাতি, থাকত কুঁড়েঘরে। আজ তাদের ছোট ছোট পাকাবাড়ি, সরকারি প্রকল্পের বদান্যতায়। দূর থেকে মনে হবে, গ্রাম বদলে গেছে। কাছে গেলে ভ্রম ভাঙে। পঞ্চাশ বছর আগে তারা যেমন দরিদ্র ছিল, যেমন দিনমজুরি করে খেত, আজও তাই। হয়তো অবস্থা খারাপই হয়েছে, যদি তুলনা করি চার পাশের জমিতে গত দুই দশকে গড়ে ওঠা অট্টালিকাগুলোর পাশে তাদের খুপরি ঘর ও ক্লিষ্ট জীবনের।

উন্নতি হয়েছে, অথচ জীবন হীনতরও হয়েছে। এ এক দৃষ্টিবিভ্রম। অ্যাডাম স্মিথ দেখিয়েছিলেন নির্বস্ত্র মানুষের লোকসমাজে বেরোতে গিয়ে মাথা হেঁট হয়ে যাওয়া মানবতার পক্ষে কতটা লজ্জার। মার্ক্সের অন্তর্দৃষ্টি: ছোট বাড়ির পাশে প্রাসাদ উঠলে ছোট বাড়িটা কুঁড়েঘর হয়ে যায়। এ কেবল মনের ব্যাপার নয়। চার পাশে জমির দাম চড়ে, দোকান-বাজার, স্কুল, চিকিৎসা গড়ে ওঠে নতুন বাসিন্দাদের পকেটের মাপে। পুরনো বাসিন্দার হাতে যা ছিল, শ্রম, তার দাম কমে। আর অট্টালিকার পাদদেশে আঁটোসাঁটো বাসস্থানগুলোর যেন অস্তিত্বই নেই, আছে শুধু বৈভবের বিপুলতা।

উচিত ছিল প্রশ্ন ওঠা: এরা কেন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে? এ তো নিছক অসাম্য নয়, এ তো বৈষম্য। অসাম্য হল অবস্থা, কার হাতে কতটা আছে। বৈষম্য হল সেই অবস্থার কারণ, কে কোন দরজা দিয়ে ঢুকতে পায়, আর কার মুখের উপর দরজা বন্ধ হয়। কারও কাছে এই বৈষম্য পৌষমাস, ধন, মান, ক্ষমতার উপর ব্যবস্থিত নিয়ন্ত্রণ। বৈষম্যের শিকার মানুষগুলির কাছে কপালকে দোষ দেওয়া ছাড়া আর কিছু নেই; না শিক্ষা, না স্বাস্থ্য, না অর্থ, না ক্ষমতা।

অসাম্য মাপা যায়, বৈষম্যকে সরাসরি মাপা কঠিন। সে আসে জাত, ধর্ম, নৃগোষ্ঠীগত পরিচিতির সূত্র ধরে, কখনও সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণে, কখনও ক্ষমতার ঘনিষ্ঠতায়। তবু ছায়াটুকু ধরা যায়। বছর কুড়ি আগে এক দল গবেষক একই যোগ্যতার সাজানো চাকরির আবেদন পাঠিয়েছিলেন, তফাত শুধু পদবিতে। উঁচু জাতের হিন্দু নামে দশ জন ডাক পেলে দলিত নামে পেয়েছিলেন মোটামুটি ছ’জন, মুসলমান নামে তিন জন। দেশজোড়া আর এক সমীক্ষায় প্রতি চারটি পরিবারের একটিরও বেশি নিজেরাই স্বীকার করেছিল, কোনও না কোনও ভাবে অস্পৃশ্যতা মেনে চলে। আর বৈষম্যের সবচেয়ে বড় চিহ্ন ওই স্থিরতা। আগে থেকেই এগিয়ে-থাকারা দশ পা এগোলে এরা এগোয় এক পা, অথচ সেই এক পা এগোনোই হয়ে ওঠে উন্নতির নিদর্শন।

ঝাড়গ্রামের এই গ্রামেরই বিস্তৃত রূপ দেখি পুরুলিয়ার মানবাজারে, কোচবিহারের মাথাভাঙায়, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার পাথরপ্রতিমায়, বর্ধমানের ভাতারে। যাদের ক্ষুদ্র মনে হয়, তারাই আসলে বৃহৎ। এই রূপ আমরা দেখতে চাই না, কেননা এ অস্বস্তিদায়ক; উন্নয়নের কল্পিত প্রাসাদটাকে ভেঙে তুলে ধরে তলায় চাপা পড়া জীর্ণ অবয়বগুলোকে। ইউরোপের শাসকেরা ভূত দেখছে, কারণ সেখানে খেটে-খাওয়া মানুষ পথে নেমেছে। আমাদের দেশে এরা নিজেরাই যেন ভূত: আছে, অথচ চোখে পড়ে না। শাসকের চোখে তো নয়ই, এঁদের কথা প্রায়শই প্রতিবাদীদের চোখেও না।

আমাদের সমকালীন রাজনীতি যখন রাষ্ট্রবাদ, দেশভক্তি, জিডিপি-র বৃদ্ধিহারের চক্রে আবর্তিত, তখন বৈষম্যের শিকড় ছড়াচ্ছে নীরবে। যা নিয়ে রাজনীতি করার কথা, তা চলে গেছে বিস্মৃতির গর্ভে। অনেক কিছুর মধ্যে প্রথম দুটো হল শিক্ষা আর স্বাস্থ্য, ইউরোপের রাস্তায় যে দাবি রাষ্ট্রবাদের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করছে মানুষকে। কথাটা নতুন নয়, বহু বার বলা। কিন্তু অবস্থা না বদলালে, অমর্ত্য সেন যেমন বলেছেন, পুরনো কথাটা বার বার তুলতে হয়। শিক্ষা আর স্বাস্থ্য সেই সিঁড়ি, যা বেয়ে এক প্রজন্ম পরের প্রজন্মকে উপরে তোলে। এই সিঁড়ি সকলের জন্য সমান না হলে বৈষম্য দূর হবে না।

শিক্ষার কথাই ধরা যাক। প্রায় সব শিশুই আজ স্কুলে যায়, কিন্তু স্কুলে যাওয়া আর শেখা এক নয়। শিক্ষা ভাগ হয়ে গেছে দুই ধারায়। সামর্থ্য থাকলে সন্তান যায় বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যমে, সঙ্গে গৃহশিক্ষক। বাকিদের জন্য সরকারি স্কুল, যার অনেকগুলোতে শিক্ষক কম, পরিকাঠামো দুর্বল। প্রজন্মান্তরের ওঠানামার হিসাব বলছে, লেখাপড়ায় নীচের অর্ধেকে থাকা বাবা-মায়ের সন্তান কতটা উপরে উঠতে পারে, সেই মাপ উদারীকরণের আগে থেকেই নিচু, আর প্রায় নড়েনি। শিক্ষামন্ত্রীকে গদি ছাড়তে বাধ্য করলেন যে তরুণেরা, তাঁরা মূলত প্রথম ধারার; ওই গ্রামের ছেলেমেয়েরা দ্বিতীয় ধারার। সৌভাগ্য, তাদের কথা মিছিলে তোলার চেষ্টা হচ্ছে, দুই ধারার মধ্যে সেতুবন্ধনের কথা বলা হচ্ছে। অনৈক্যের পরাক্রমকে হারিয়ে সংহতির সংগঠন অসম্ভব নয়, কিন্তু সহজও নয়।

স্বাস্থ্যের ছবি আরও কঠিন। চিকিৎসার খরচের বড় অংশ এখনও মানুষকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। সরকারি হাসপাতালে উপচে পড়া ভিড়, বেসরকারি নার্সিংহোমের বিল নাগালের বাইরে। খেটে-খাওয়া পরিবারে একটা বড় অসুখ মানে সম্মুখে অতল খাদ। এ দিকে মেয়েদের বিরাট অংশ রক্তাল্পতায় ভোগে; রক্তাল্প মায়ের সন্তান দুর্বল হয়ে জন্মায়, দুর্বল শরীরে পড়ায় মন বসে না। শিক্ষা আর স্বাস্থ্য তাই আলাদা নয়; একটার ঘাটতি অন্যটাকে টেনে নামায়।

শাসকপক্ষ দেখিয়ে চলে বৃদ্ধির স্বপ্ন-ভবিষ্যৎ। জিডিপি বাড়লে রোজগার বাড়বে, মানুষ নিজেই শিক্ষা-স্বাস্থ্য কিনে নেবে। অভিজ্ঞতা বলে উল্টো কথা। পূর্ব এশিয়ার যে দেশগুলো দ্রুত এগিয়েছে, তারা আগে স্কুল আর স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়েছিল, তার পর ছুটেছিল। শিক্ষা-স্বাস্থ্য বাজার থেকে কিনতে হলে যার কেনার ক্ষমতা যেমন, তার শিক্ষা-স্বাস্থ্যও তেমন; যে বৈষম্যকে দূর করাটাই আশু কর্তব্য, বাজার তাকেই পাকা করে। এই গ্রামের কথা যেমন, বৃদ্ধির জোয়ার এসেছে চার পাশের জমিতে, কিন্তু গ্রামের আদি বাসিন্দাদের গৃহকোণে নয়। তাদের কাছে ‘সবই কপালের দোষ’। নিজের দেহশ্রমে গড়া অট্টালিকায় বাস করবে অন্য কেউ, এটা আশ্চর্যের নয়, ক্রোধেরও নয়; এটাই বিধি। বিধির বিরুদ্ধে লড়াই তাদের পূর্বপ্রজন্ম দেখেছিল, তবে তা বলার লোকও আজ বিরল। আমাদের রাস্তায় শ্রমজীবী মানুষের অনুপস্থিতির শিকড় হয়তো এখানেই।

সুতরাং, আবার পুরনো কথা: দাবিটা বদলানো দরকার। বদান্যতা নয়, অধিকার। উন্নয়নের সাফল্য মাপা হোক ইট, সিমেন্ট, মার্বেল দিয়ে নয়, স্কুলে কী শেখানো হচ্ছে আর অসুখে কোথায় যেতে হচ্ছে, তা দিয়ে। আমরা যে পথ দিয়ে স্কুলে যেতাম, সেই পথের ধারের গ্রামের ছেলেমেয়েরা আজ কোন স্কুলে যায়, অসুখ হলে কোথায় যায়, বৈষম্যের আসল হিসাব সেখানেই। যে স্পর্ধা এক জন মন্ত্রীকে সরাতে পারে, সেই স্পর্ধা যদি ওই গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছায়, তবেই আমাদের আন্দোলন সর্বাত্মক হবে, তবেই শাসক সত্যিকারের ভূত দেখবে।

আসলে সময় তো সেখানে নিজে নিজে স্থির দাঁড়িয়ে নেই; তাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। এই সহজ কথাটা সহজ ভাবে বোঝা দরকার।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
indian politics West Bengal government

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy